Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৩ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৩
জীবনের বালুকাবেলায়
জীবনের বালুকাবেলায়

ব্রিটিশ উপনিবেশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এ ভূখণ্ডের এই তিন ইতিহাস পর্বে ছড়িয়ে আছে ফারুক চৌধুরীর জীবন। ১৯৫০-এর দশকের মধ্যপর্যায়ে নবীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে তার কূটনৈতিক জীবনের সূচনা। রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র্র সচিব, সার্কের প্রথম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন বেসরকারি সাহায্য সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা। বর্তমানে অবসর জীবন-যাপন করছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন—শেখ মেহেদী হাসান

 

আপনার জন্ম আসামের করিমগঞ্জে। ছেলেবেলা কেটেছে সিলেট, মেঘালয় এবং আসামে। ওই সময়ের স্মৃতি জানতে চাই।

আমার জন্ম আসামের করিমগঞ্জে। ১৯৩৪ সালের ৪ জানুয়ারি। আমার পিতা গিয়াসুদ্দিন ও মা রফিকুন্নেসা চৌধুরী। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান সরকারের ইচ্ছায় ছিল তার কর্ম। অতএব ঘন ঘন স্থান বদল, অর্থাৎ স্কুল বদল সম্বন্ধে তার বা আমার বলার কিছু ছিল না। আমার ছোটবেলার শিলং ছিল আসামের রাজধানী। এখন তা মেঘালয়ের। আমরা ছিলাম বাংলা ভাষী অসমীয়া। আমরা চার ভাই আর দুই বোন। আমি বড়। আমার ছোট ইনাম আহমেদ চৌধুরী (সাবেক সচিব), প্রয়াত মাসুম আহমেদ চৌধুরী (রাষ্ট্রদূত), ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী (রাষ্ট্রদূত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও অধ্যাপক), বোন নাসিম হাই (স্বামী শহীদ কর্নেল সৈয়দ আবদুল হাই), ছোট বোন নীনা আহমেদ (স্বামী ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা)।

১৯৪১ সালে যখন আমি সুনামগঞ্জ জুবিলি স্কুলে ভর্তি হলাম তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তুঙ্গে। অতঃপর ১৯৪১ থেকে ১৯৪৯ সাল এই আট বছরে আমি পাঁচটি স্কুলে পড়েছি; যার মধ্যে একটিতে পড়েছি দুবার। স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক ফরিদ স্যার, অঙ্ক শিক্ষক তৈয়ব আলী স্যার, হাতের লেখা শেখাতেন মোহাম্মদ আলী স্যার—তাদের কথা এখনো মনে আছে। মোহাম্মদ আলী স্যার আমাকে টেনিস খেলা শিখিয়েছিলেন। তাছাড়া আমি খুব মার্বেল খেলতাম। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দিনটার কথা মনে পড়ে। সুনামগঞ্জের হাছন নগরের পুলটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি। হঠাৎ আমাদের পাড়ার যাদুদা উধাও হয়ে গেলেন। ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় গিয়েছিলেন, যাদুদা?’ যাদুদা বলল, ‘রবীন্দ্রনাথের জন্য মন খারাপ লাগছিল। বাড়ি গিয়ে কেঁদে এলাম।’ রবীন্দ্রনাথের জন্য অশ্রু বিসর্জন করার অনুভূতি আমরা তখনো অর্জন করিনি। তারপর নেত্রকোনা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করি। আমার ছেলেবেলা ছিল খুবই আনন্দময়।

ঢাকা কলেজে ভর্তি হলেন কবে?

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর ঢাকা হলো আমাদের জীবনবৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু। আমার ইচ্ছা ছিল আলীগড়ে পড়ব। মেজো মামা তখন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। ১৯৪৯ সালে বাবা বদলি হলেন ঢাকায়, ওই বছর ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হই। বাসায় থেকে ক্লাস করতাম। কিছুদিন পর বাবা পুনরায় বদলি হলেন ময়মনসিংহে। তখন ঠাঁই হলো ঢাকা কলেজ হোস্টেলে, ২৩ আগামসি লেনের অবাধ স্বাধীনতায়। ঢাকা কলেজের হোস্টেলগুলো তখন ছিল ভাড়াটে বাড়িতে। নূরপুর ভিলা, বান্ধব কুটির, হাসিনাবাগ—পুরান ঢাকার গলিপথে হেঁটে যাওয়া অতি পরিচিত ছাত্রাবাসগুলোতে ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নতুন সব বন্ধুর ভিড়। হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন ঢাকা কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মকসুদ আলী। স্বল্পভাষী, গম্ভীর এই মানুষটির মন ছিল কোমল। তাইতো তিনি হোস্টেলে আমার নানা রকমের উপদ্রব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন। আগামসি লেনের হোস্টেলে আমি থেকেছি দুই বছর।

 

ভাষা আন্দোলনে আপনার সম্পৃক্ততা ছিল।

ঢাকা কলেজে পড়ার সময় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়াও আমি রাজনীতি সচেতন ছিলাম। ভাষা আন্দোলন যখন দানা বাঁধে তখন কলেজ থেকে আমরা বন্ধুরা মিলে নানা ক্যাম্পেইন করতাম। ছাত্রদের সংগঠিত করতাম। ঢাকা কলেজে অবস্থানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে ছাত্রদের ওপর পুলিশের অকস্মাৎ গুলিবর্ষণ। সেদিন সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় আর ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ নিয়ে স্কুল-কলেজের ছাত্রদের ভিড় রমনার পিচঢালা পথে, বর্তমান মেডিকেল কলেজ থেকে আজকের শহীদ মিনার পর্যন্ত। আর বর্তমানের বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়াঙ্গন তখন ছিল উন্মুক্ত খেলার মাঠ। কাছাকাছি একটি জলাশয়ের কথাও মনে পড়ে, কারণ কাঁদানে গ্যাসের ভুক্তভোগী হিসেবে ভিজা রুমালে চোখ মুছতে হয়েছিল। ১৪৪ ধারা জারি ছিল। ছাত্ররা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বর্তমান মেডিকেলের পূর্বকোণ থেকে বেরিয়ে স্বেচ্ছায় গ্রেফতার বরণ করলেন বিপুল আগ্রহ উদ্দীপনায়। ইটপাটকেল, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের ভিতর আমিও ছিলাম। বর্তমান জগন্নাথ হল তখন ছিল প্রাদেশিক পরিষদ ভবন। সেখানে অধিবেশন চলছিল। যতদূর মনে পড়ে, অপরাহ্ন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার ছাত্র, পুলিশের মুখোমুখি, পরিষদমুখী। আমরাও সেই দলে। বেলা ৩টার দিকে গুলি ছোড়ার মুহূর্তটিতে আমার কিন্তু মনে পড়ে, উত্তেজনা যেন ছিল কিছুটা চাপা, কিছুটা যেন প্রশমিত। রমনার বাতাসে একটিই স্লোগান ভাসছিল—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ওই দিন শহীদ হলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখ। সে স্মৃতি ভোলা যাবে না। ১৯৫৩/৫৪ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের জন্য অনুষ্ঠান করব। টাকা দরকার। এজন্য কয়েকজন বন্ধু মিলে বর্ধমান হাউসে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের বাড়িতে গেলাম। মিসেস নুরুল আমিন আমাদের অনুষ্ঠানের চাঁদা বাবদ দুইটা দশ টাকার নোট দিলেন। ভাষা আন্দোলনে একজন সাধারণ পদাতিক সৈনিক হিসেবে সবচেয়ে বড় সাফল্য! 

 

তখন আপনার বন্ধু-বান্ধব কারা ছিলেন?

ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ফজলে আলী, জাকারিয়া চৌধুরী, ব্যারিস্টার ভিকারুল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের পরে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হলো স্যার ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে। 

 

 

আপনি নাকি কবিতা লিখতেন?

আমি কবিতা লিখতাম। হয়তো কবিও হয়ে যেতাম। আমরা তখন ময়মনসিংহে। আমি কবিতা লিখলাম। সেন্টু (কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ) বলল, না ভালো হয়নি। কিন্তু ওর কবিতা পত্রিকায় ছাপা হতো। ও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। মনে জিদ আসল। আমি আবারও কবিতা লিখলাম—‘শরতের সমারোহ হীরের খঁচা সবুজের দেশ/মাঠে মাঠে ধান বুনা শেষ।’ সেন্টু বলল, কবিতাটা ভালো হয়েছে, পত্রিকায় ছাপতে দাও। পরে আমি আর কবিতা লিখিনি।

আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে কাদের পেয়েছিলেন?

আমার এক বছর ইয়ার লজ ছিল সেজন্য ১৯৫২ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। মনে পড়ে, ভর্তি হওয়ার ইন্টারভিউয়ে ইংরেজি বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক ইতরাত হোসেন জুবেরি (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন) আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি শেক্সপিয়ার পড়েছি কি না। আমার উত্তর ছিল, আমি শেক্সপিয়ার পড়তে এসেছি, তবে গল্পকারে শেক্সপিয়ারের প্রধান ড্রামাগুলো আমার জানা আছে। তিনি বললেন, তোমার ইংরেজিতে নম্বর কত? মার্কশিট নিয়ে আস। আমি রেজিস্টার বিল্ডিংয়ে গিয়ে দুই টাকা ঘুষ দিয়ে মার্কশিট তুললাম। স্যার দেখলেন আমি ইংরেজিতে একশর মধ্যে সত্তর পেয়েছি। ভর্তি হলাম। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ঢাকা কলেজের ২৩ আগামসি লেনের হোস্টেলকে কজনইবা চিনত! সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নামডাক ছিল দেশজোড়া। পাকিস্তানের ব্যাংক নোট আর ডাকটিকিটে এ হলের ছবি শোভা পেত। তখন আমাদের হলেরও প্রভোস্ট ছিলেন ড. ওসমান গনি। ১৯৫২-১৯৫৬ এই চার বছর আমি সলিমুল্লাহ হলের ১৪৭ ও ৯৫ নম্বর কক্ষে থাকতাম। পড়াশোনা না করলেও মধুর ক্যান্টিনে চা-সিগারেটের ফাঁকে ফাঁকে ক্লাসে যেতে যে আমার খারাপ লাগত তা নয়। মনে পড়ে, অধ্যাপক জে এস টার্নারের মিলটন পড়ানো, বিশুদ্ধ ইংরেজি এবং বাংলা উচ্চারণে অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের পাঠদান, স্যুট-টাই পরা কেতাদুরস্ত অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের সাহেবিয়ানা, শহীদ অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার আয়েশি কায়দায় শেক্সপিয়ারের ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ সম্পর্কে আলোচন, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর বার্নাড শ পড়ানোর সময়ে নিবিষ্ট ক্লাসে পিনপতন নীরবতা—আমার জীবন বদলে দিয়েছে।

 

আপনি তো স্নাতকোত্তর অধ্যয়নকালে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৫৫ সাল ছিল আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। একুশ পেরিয়ে বাইশে পা দিয়েছি। স্নাতক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা সেরে বছরের শেষ দিকে সুপিরিয়র সার্ভিসের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেব ঠিক করেছি। এ সময় দু-তিনজন বন্ধুর প্রস্তাব : চলো, এ বছর আমরা বার্মা ঘুরে আসি। এক বিকালে আমার বন্ধু সালাহউদ্দিনের সঙ্গে রমনার সবুজে হাঁটছি। বার্মা যাওয়ার পরিকল্পনা তাকে জানাতেই তিনি বললেন, পাগলামি কর না। তুমি যদি ফরেন সার্ভিস পাও তাহলে বার্মা তোমার পায়ের তলায় থাকবে। সুপিরিয়র সার্ভিসে লিখিত পরীক্ষায় পাস করার পর ২৯ মার্চ ১৯৫৫ সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট আমার মৌখিক পরীক্ষা হলো। ২২ আগস্ট ১৯৫৬ সালে বেইলি রোডের কাহেকশানে টেলিগ্রাম এল। আমি মধুর ক্যান্টিনে আড্ডা দিয়ে দুপুরে খাওয়ার জন্য বাসায় এসে দেখি কিছু আত্মীয়স্বজন পরিবৃত অবস্থায় আম্মা কাঁদছেন। টেলিগ্রামে বলা হয়েছে যে করাচি পথে ঢাকা ছাড়তে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তারপর করাচি থেকে যুক্তরাজ্যের বোস্টনের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসিতে।

 

ফ্ল্যাচার স্কুলের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

ফ্ল্যাচার স্কুলে আমাদের আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি আর ডিপ্লোম্যাটিক থিওরি আর প্র্যাকটিস বিষয়গুলো ক্রেডিট পাওয়া ছিল আবশ্যক। তবু দিনে সময় পেলে টেনিস খেলতাম। খাবার ছিল বিদেশি। ভাত খাওয়ার ইচ্ছা, প্রবাসের সেই প্রারম্ভে কাটিয়ে উঠতে পারিনি তখনো। রাঁধুনে মিসেস ব্রাউন মাঝেমধ্যে আমার জন্য তাই ভাত পাঠিয়ে দিতেন খাওয়ার টেবিলে। গ্রিলড মাছ, রোস্ট মুরগি অথবা স্টেক, খাবার যা-ই থাকুক না কেন, ভাতে মাখন দিয়ে তার সঙ্গে খেয়ে নিতাম। পানীয় হিসেবে দুধের ছিল প্রচলন। ভাতের সঙ্গে দুধ মিশিয়ে তাতে চিনি ঢেলে খেয়ে নিতাম কখনো কখনো। ১৯৫৬ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষারত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। সঙ্গে লিলি ভাবী আর তাদের সন্তান ভাষণ। সপ্তাহশেষ চলে যেতাম উইলসন হাউস থেকে মাইল তিনেক দূরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে, মুনীর ভাইয়ের বাসায়। তিনি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তিনি আশ্চর্য-সুন্দর কথা বলতেন। নাটক, সাহিত্য, দর্শন, ক্রীড়া, শব্দতত্ত্ব, ইতিহাস—সবকিছুতেই তার ছিল গভীর আগ্রহ আর অসীম জ্ঞান। তার সান্নিধ্য ও লিলি ভাবীর আতিথেয়তা প্রবাসী জীবনের প্রথম সেই দিনগুলো আনন্দময় করে তুলেছিল। এই অসাধারণ মানুষটি ১৯৭১-এ শহীদ হলেন। এ বেদনার কথা ভাবতে পারি না। 

 

কূটনৈতিক জীবনে বিভিন্ন দেশে আপনি দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে।

পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষে আমার পোস্টিং হলো রোমে। আমি যখন রোমে গেলাম, তখন ইউরোপের একত্রীকরণের প্রথম পদক্ষেপ, অর্থাৎ ১৯৫৭ সালের রোম চুক্তি সই হয়ে গেছে। ইউরোপকে একটি সাধারণ বাজার হিসেবে গড়ে তোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তাতে শামিল ছিল ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস আর লুক্সেমবার্গ। ১৯৫৯-১৯৬২ সাল পর্যন্ত আমার রোম জীবন ছিল প্রীতিদায়ক অভিজ্ঞতা। এমনকি ১৯৬০ সালে রোমে যে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয় তার স্মৃতি অবিস্মরণীয়। ১৯৬২-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত চীনের পিকিংয়ের পাকিস্তান দূতাবাসে আমার কর্মজীবন ছিল ঘটনাবহুল। হল্যান্ডের দ্য হেগে ১৯৬৫-১৯৬৬, আলজেরিয়ায় ১৯৬৬-১৯৬৯, ইসলামাবাদে ১৯৬৯-১৯৭১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করি। ইসলামাবাদ থেকে আমি সপরিবারে ঢাকায় আসি ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল। এরপর আমি আর পাকিস্তানে ফেরত যাইনি।

 

১৯৭১-এ তো আপনার বাবা দেহত্যাগ করেন।

বাবার তিরোধান ছিল আকস্মিক। ১৯৭১ সালের ২৪ জানুয়ারি, সাভার থেকে মোটরযোগে ঢাকা ফেরার পথে বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হন। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি প্রাণ ত্যাগ করেন ২৭ জানুয়ারি। না, বাংলাদেশের অভ্যুদয় তিনি দেখে যেতে পারেননি।

 

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার পরিচয় হলো কীভাবে?

পয়লা জানুয়ারি ১৯৭২। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখনো বসার উপযোগী হয়নি। কিন্তু প্রয়োজন রয়েছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে, জরুরি ভিত্তিতে, আমাদের আলাপ-আলোচনার। ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডে আমাদের পারিবারিক বাসভবন সুরমায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের সভাপতিত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি বৈঠক। উপস্থিত ছিলাম আমি, নিউইয়র্কের জাতিসংঘে আমাদের একসময়ের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর এবং সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এম আর ওসমানী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে বললেন, চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই তার ভারত সফরের প্রস্তুতি নিতে। ৬ জানুয়ারি ১৯৭২ আমরা দিল্লি অশোক হোটেলে পৌঁছলাম। ৯ জানুয়ারি গভীর রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে জানালেন, বঙ্গবন্ধু দিল্লি আসছেন। তিনি সাংবাদিক, সংবর্ধনাকারী তথা বহির্জগতের কাছে ইংরেজি বক্তব্য রাখবেন, একটি খসড়া তৈরি করতে হবে। সারা রাত জেগে খসড়া তৈরি করলাম। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এর সেই অবিশ্বাস্য সকাল এল। পালাম বিমানবন্দর। আটটা বেজে দশ মিনিট। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রুপালি কমেট বিমান থেকে দীর্ঘকায় সুদর্শন বঙ্গবন্ধু নেমে এলেন। তিনি আমার লেখা বক্তব্য পাঠ করলেন। পরে আমরা একই বিমানে ঢাকা এলাম। সেই শুরু। ১৯৭২-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রচুর স্মৃতি রয়েছে। আমি লন্ডনে ডেপুটি হাইকমিশনার। ১৯৭২ সালের আগস্ট আর সেপ্টেম্বরে, অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি যখন লন্ডন এলেন, সেখানে এবং পরে তার সহগামী হিসেবে জেনেভায় তাকে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছি। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি অটোয়ায় কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে, সেই সম্মেলনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। ১৯৭৪ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের যোগদানক্ষণে এবং অতঃপর তার ওয়াশিংটন সফরে ছিলাম তার সফরসঙ্গী। ১৯৭৫-এ তার সর্বশেষ বিদেশ সফরে, কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে তার সঙ্গে গিয়েছিলাম জ্যামাইকার কিংস্টনে। সেই সান্নিধ্যের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো চিরদিন স্মৃতিতে অম্লান থাকবে। একজন সাধারণ কূটনীতিবিদের পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনে তা ছিল বিরল সৌভাগ্য।

 

আপনি রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।  সে অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেই সান্নিধ্যের খেসারত যে আমাকে দিতে হয়নি, তা নয়। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তারই আদেশে আমার লন্ডন থেকে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়েছিল। ঢাকায় আমার কার্যভার গ্রহণের দিন নির্ধারিত ছিল ১৯৭৫ সালের ২৬ বা ২৭ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই আমার ঢাকার বদলি বাতিল হলো। লন্ডনে আমাকে এক বছর অনিশ্চিত কাটাতে হলো। সরকারি আদেশে আমার পদমর্যাদা হ্রাস করা হলো। অবশেষে ১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মতো একটি দূতাবাসের দায়িত্ব দিয়ে আবুধাবিতে পাঠানো হয়। তারপর আবুধাবি ১৯৭৬-১৯৭৮, ব্রাসেলসে ১৯৭৯-১৯৮২ সাল পর্যন্ত হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ১৯৮২-তে আমি অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পেলাম; পূর্ণ পররাষ্ট্র সচিব হলাম ১৯৮৪-তে। ১৯৮৬-১৯৯১ সালে দিল্লিতে রাষ্ট্রদূত ছিলাম। আর অবসরে গেলাম ১৯৯২ সালে। আমার কর্মজীবন ছিল ঘটনাবহুল।

 

১৯৮৫ সালে সার্কের জন্মলগ্নে প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। সে অভিজ্ঞতা জানাবেন।

সার্কের ভাবনার আদর্শগত ভিত্তি প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, যখন কলকাতার রাজভবনে একটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা যদি এই দুষ্কর (চ্যালেঞ্জিং) দায়িত্বে ব্যর্থ হই, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।’ তার এই ধারণা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছিল ছয়টি দক্ষিণ এশীয় দেশের প্রধানদের কাছে (ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপ) প্রেসিডেন্ট জিয়ার ১৯৮০ সালের ২ মে’র বার্তায়। তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে, যাতে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়...দক্ষিণ এশিয়াই পৃথিবীর একমাত্র অঞ্চল, যেখানে কোনো আশাবাদ নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা চলছে না।’ ১৯৮৫ সালের ৭ ডিসেম্বর  অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। ওই দিন ঢাকার রাজপথে উড্ডীয়মান সাতটি দেশের পতাকার সারি অনেক ঢাকাবাসীকেই একটি নবীন দেশের রাজধানীর নবলব্ধ আঞ্চলিক ভূমিকার সম্ভাবনা সম্বন্ধে করেছিল সজ্ঞান। ২০০৭ সালে সার্কে আফগানিস্তানের যোগদানের ফলে সার্কের সদস্যসংখ্যা এখন ৮। আমি অত্যন্ত দুঃখিত পাকিস্তানের আচরণের কারণে এবার ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বাতিল হয়ে গেল।

 

আপনি তো ব্র্যাকের উপদেষ্টা ছিলেন।

১৯৯২ সালে আমি যখন দেশে ফিরি তখন বেসরকারি সাহায্য সংস্থা ব্র্যাক হবে আমার নতুন কর্মক্ষেত্র, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। দু-একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে লোভনীয় প্রস্তাব আসেনি তা নয়। স্যার ফজলে হাসান আবেদের আহ্বানে ব্র্যাকে যোগ দিয়ে সেখানে নানাবিধ কাজ করেছি।

 

আপনি একজন শিল্পসংগ্রাহক, চলচ্চিত্র ও ক্রীড়াভক্ত মানুষ। এত সময় কোথায় পান?

আসলে চিত্রকর্মের সংগ্রাহক আমার স্ত্রী ছবির মূল্য তিনি দেন। আমি শুধু বাহবা দিয়ে থাকি। তার সংগ্রহে রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন্নবী, শাহাবুদ্দিন, রোকেয়া সুলতানা, কনকচাঁপা চাকমা প্রমুখ শিল্পীর একাধিক শিল্পকর্ম। আর ছেলেবেলা থেকে আমি সিনেমার পোকা। উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা এখনো দেখি। টেলিভিশনে নিয়মিত খেলা দেখি। বই পড়ি। এভাবে অবসর কেটে যায়।

 

আপনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। লেখার প্রেরণা কোথা থেকে পান।

অবসর নেওয়ার পর ডেইলি স্টারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এস এম আলী এবং শফিক রেহমান কলাম লিখতে বললেন। তারপর লিখতে শুরু করলাম। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বই লিখেছি। আমার সর্বশেষ বই ‘জীবনের বালুকাবেলায়’। বইটির নামকরণের জন্য সদ্য প্রয়াত বন্ধু সৈয়দ শামসুল হকের কাছে কৃতজ্ঞতা। তিনি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যেমন করেছেন শফিক রেহমান। 

 

আপনার পরিবারের কথা জানতে চাই।

আমার স্ত্রী জিনাত চৌধুরী। পুত্র আদনান চৌধুরী ব্যবসা করে। মেয়ে ফারজানা আহমেদ, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow