Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ২ জুন, ২০১৬ ২৩:৫৯
৩৭ দেশে যাচ্ছে বাংলার খেলনা
জিন্নাতুন নূর
৩৭ দেশে যাচ্ছে বাংলার খেলনা

বাংলাদেশের নারীদের তৈরি খেলনা এখন জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে পশ্চিমা শিশু ও অভিভাবকদের মন জয় করছে। ‘পেবেল’ নামে নারীদের হাতে বোনা এই পরিবেশবান্ধব খেলনাগুলো গুণগত ভালো হওয়ায় এরই মধ্যে ওয়ার্ল্ড ফেয়ার ট্রেড অর্গানাইজেশন সনদ (ডব্লিউএফটিও) পেয়েছে। পেবেল এখন পর্যন্ত বিশ্বে ডব্লিউএফটিও-সনদপ্রাপ্ত একমাত্র হাতে তৈরি খেলনার কোনো ব্র্যান্ড। দেশের বিভিন্ন এলাকার আট হাজারের বেশি নারী এগুলো তৈরির সঙ্গে জড়িত থেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বর্তমানে বিশ্বের মোট ৩৭টি দেশে পেবেল ব্র্যান্ডের খেলনা বিক্রি হচ্ছে। পেবেল-এর যাত্রা শুরু হয় বিদেশি নাগরিক সামান্তা মোর্শেদের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি সন্তান গোলাম মোর্শেদকে ভালোবেসে সংসার শুরু করেন তিনি। তবে নিজ মাতৃভূমি ও পরিবার ছেড়ে বাংলাদেশে এলেও এখানে তৈরি হয় সামান্তার বিশাল আরেক পরিবার। স্বামী-সন্তান ছাড়াও সেই পরিবারে যুক্ত হন গ্রাম বাংলার হাজারো নারী। যারা সামান্তার কাছ থেকে শিশুদের জন্য উলের বুননে তৈরি সুন্দর ও মনকাড়া সব খেলনা বানাতে শেখেন। আর এই খেলনা তৈরির মাধ্যমে এখন বাংলাদেশের হাজারো নারী হয়েছেন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। গ্রামের যেসব নারী ঘরের বাইরে গিয়ে নিজে অর্থ উপার্জনের কথা কখনো ভাবতে পারেননি, তারাই আজ নিজেদের পরিবারের দারিদ্র্য দূর করছেন পুতুল তৈরি করে। আর সেই পুতুল ও খেলনা দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে চলে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের হাতে। গ্রাম-বাংলার নারীদের হাতে তৈরি রঙিন ও ব্যতিক্রমী পুতুলগুলো হাসি আনছে পশ্চিমা শিশুদের মুখে। বাংলাদেশে আসার পর সামান্তা ‘হাতে বুনানো’ নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুরু করেন। যাত্রার শুরুতে স্থানীয় একটি এনজিও মাধ্যমে তিনি প্রথমে বেশ কয়েকজন নারীকে ঢাকায় তার বাসায় আসতে বলেন। সেখানেই তিনি সেই নারীদের উল ও কাপড় দিয়ে পুতুল তৈরি করার কৌশল শেখান। তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে দলটি তাদের প্রথম বাণিজ্যিক অর্ডারের কাজ পায়। ধীরে ধীরে কর্মী সংখ্যা এবং পুতুলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢাকার বাইরে নরসিংদীতে সামান্তা আরেকটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেন। এই কেন্দ্রে সপ্তাহে তিন দিন করে মোট দুই মাস গিয়ে সামান্তা নরসিংদীর নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এরপর স্বামীর সহযোগিতায় ঢাকার বাসায় প্রথম যে নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন ইব্রাহিমপুরে তাদের নিয়েই সামান্তা তার পুতুল তৈরি করার প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় গড়ে তোলেন। ততদিনে সামান্তার কাছে বিষয়টি সম্পষ্ট হলো যে তাদের তৈরি পণ্যের চাহিদা আছে। আর সে কারণে ২০১০ সাল থেকে এই পুতুলগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে বাজারজাত করার প্রক্রিয়ায় যান সামান্তা মোর্শেদ। সে বছর ‘পেবেল’-ব্র্যান্ড নামে আরও বৃহত্তর আঙ্গিকে ইউনাইটেড কিংডম ও অস্ট্রেলিয়ায় বাংলার নারীদের তৈরি পুতুল বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয়। জনপ্রিয়তা থাকায় এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য এরই মধ্যে ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ পেবেল ব্র্যান্ডের উদ্যোক্তাদের এমবিই (মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) সম্মান প্রদান করেন। ২০০৯ সালের আগস্টে নিউইয়র্কে ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ-এ হাতে বুনানো প্রকল্পটির প্রশংসা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ২০১২ সালে পেবেলচাইল্ড ইউকে এবং পেবেলচাইল্ড মালয়েশিয়ার সহযোগিতায় ইউরোপ ও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পেবেল-এর তৈরি পুতুল বিক্রি শুরু হয়। সারাবিশ্বে এখন পেবেল ব্র্যান্ডের পুতুলগুলো ১৭টি বিপণনকারীর মাধ্যমে বিশ্বের ৩৭টি দেশে বিক্রি করা হচ্ছে। সামান্তা মোর্শেদ বলেন, পেবেল বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র ডব্লিউএফটিও সনদপ্রাপ্ত হাতে তৈরি খেলনার ব্র্যান্ড। বাংলাদেশের কারুশিল্পের প্রসারের জন্য এটি বড় অর্জন। ক্রেতারা নিশ্চিন্ত হয়েই এখন তাদের সন্তানদের একটি আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত ব্র্যান্ডের খেলনা কিনে দিতে পারবেন। বর্তমানে পুরো এশিয়ায় মাত্র ২০টি এমন প্রতিষ্ঠান আছে যারা ডব্লিউএফটিও-নামক বিশেষ সম্মানে ভূষিত। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী চকোলেট ও হাতে তৈরি খেলনা কিনতে হলে তার ডব্লিউএফটিও-এর গ্যারান্টি থাকতে হবে।




up-arrow