Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০
সবার চোখ সমুদ্র অর্থনীতিতে
রুহুল আমিন রাসেল
সবার চোখ সমুদ্র অর্থনীতিতে

সবার চোখ এখন বাংলাদেশে। বিশ্বের সম্পদশালী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের ‘ব্লু ইকোনমি’ বা ‘সমুদ্র অর্থনীতি’তে নজর দিয়েছে। সেসব দেশের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা একে একে বাংলাদেশে এসে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে পৌঁছে দিচ্ছেন সুকৌশলী বিনিয়োগ বার্তা। ঢাকা-ফেরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা এই মাসে চীনা রাষ্ট্রপতির সফরেও এই সমুদ্র অর্থনীতিতে বিনিয়োগের বার্তা আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতে, ভূকেন্দ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাংলাদেশের সামনে খুলে দিতে পারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবনযাত্রা মাছ চাষ ও বাণিজ্যিক পরিবহনের মতো সমুদ্র অর্থনীতির কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ব্যাপক সুযোগ থাকলেও এ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, পরিবহন ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকারি অর্থের বরাদ্দ বাড়ানো, সমুদ্র ও নদীবন্দরগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সক্ষমতা বাড়ানো, অ্যাকুয়া ট্যুরিজম প্রসারে সমন্বিত উদ্যোগ, ক্রুজশিপ সার্ভিস চালুর সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা তথ্য তুলে ধরে দেশের প্রাচীন বাণিজ্য সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে সমুদ্র-সম্পর্কিত বাণিজ্যের দ্রুত প্রসার ঘটছে। ২০০৭ সালে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আর ২০২০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়াবে। বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের ৮০ শতাংশই সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। আর বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় এই সমুদ্রপথে।

এ প্রসঙ্গে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সাবেক সভাপতি আফতাব উল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সমুদ্র অর্থনীতিতে এ সরকার সফল। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে মার্কিন প্রশাসন আগ্রহ দেখিয়েছে। সমুদ্রে ও অপশোর যে জ্বালানি আছে, তা বাংলাদেশ তুলতে পারছে না। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঢাকা সফরে আমার মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজর ও বিনিয়োগে আগ্রহ আছে।’

ডিসিসিআই সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ আসে সমুদ্রে মত্স্য আহরণ, সামুদ্রিক খাদ্য ও বাণিজ্যিক সমুদ্র পরিবহন থেকে। প্রায় তিন কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমুদ্র অর্থনীতিতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে সরকারের উদ্যোগ দাবি করেন তিনি। প্রসঙ্গত, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রবিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র (টেরিটরিয়াল সি), ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এরপর সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ১৮টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশের উন্নয়নে সমুদ্র অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে বলেছিলেন, সমুদ্রসম্পদকে উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার সম্ভব। তার মতে, ভূকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সামনে খুলে দিতে পারে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তায় সমুদ্রের খনিজ সম্পদের ব্যবহার, সামুদ্রিক মত্স্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশ উন্নয়নের নিয়ামক ভূমিকা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বঙ্গোপসাগরে বিদ্যমান নানা প্রজাতির মত্স্য ও অন্যান্য জৈবসম্পদ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সামুদ্রিক মত্স্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। সৈকতের সৌন্দর্যকে পুঁজি করে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিনস ও কুয়াকাটায় পর্যটনশিল্পকে আরও বিকশিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের গভীর সমুদ্রসীমায় জরিপ চালানোর লক্ষ্যে জার্মানি থেকে একটি নতুন প্রযুক্তিসক্ষম জাহাজ কেনা হয়েছে, যা শিগগিরই বাংলাদেশ পৌঁছবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের তথ্যমতে, বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের ফলে গভীর সমুদ্র এলাকার বিশাল অংশ বাংলাদেশের জলসীমায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নতুন এ জলসীমার পরিমাণ বাংলাদেশের মোট স্থল অঞ্চলের প্রায় ৮১ শতাংশ। নদীপথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহন বাড়াতে উচ্চ পণ্য পরিবহন ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ পরিচালনা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীবন্দরগুলোর আধুনিকায়নের ওপর সরকার গুরুত্ব্ব আরোপ করেছে। জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজভাঙা শিল্পে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন সমুদ্রসীমা আবিষ্কারের ফলে বাংলাদেশে ক্রুজশিপ পরিচালানার মতো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ খাতে দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ বাংলাদেশে প্রায় ৭৫টির মতো ছোট-বড় দ্বীপ রয়েছে, যেখানে পর্যটন সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ প্রয়োজন। বেসরকারি সংস্থা ‘সেভ আওয়ার সি’র এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বাংলাদেশি জাহাজ যুক্ত হওয়ায় দেশে গড়ে উঠেছে শিপিং এজেন্সি, ফ্রেইট-ফরোয়ার্ডিং, ব্যাংক-বীমা খাত। এ খাতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও বাড়ছে। বর্তমানে ২৫০ জাতের মিঠাপানির মাছের বিপরীতে সাগরে রয়েছে অন্তত ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন টন মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন মাছ বাংলাদেশের মত্স্যজীবীরা আহরণ করেন, যার সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। ওই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সারা দেশে মোট মাছের উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩৩ লাখ মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত কিছু জরিপ থেকে জানা যায়, নানা প্রজাতির  মূল্যবান মাছ ছাড়াও সমুদ্রসীমায় নানা ধরনের প্রবাল, গুল্মজাতীয় প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির চিংড়ি, তিন প্রজাতির লবস্টার, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া ও ৩০০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow