সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসরত হাজং সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা সংরক্ষণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক এক উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটায় উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের কাইতকোনা গ্রামে বসুন্ধরা শুভসংঘ বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা শাখার উদ্যোগে এই উঠান বৈঠক আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন শুভসংঘের উপজেলা শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম।
বৈঠকে বক্তব্য রাখেন সহসভাপতি মো. আশিকুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিজিলা হাজং, প্রচার সম্পাদক বশির আলম, কর্ম ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক সংজ্ঞিতা হাজং, খায়রুল ইসলাম সরকার, শুষপা হাজং (ডিগ্রি ১ম বর্ষের ছাত্রী), মুনটিলা হাজং ও অমরিত কুমার হাজং প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে হাজং সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০টি পরিবারের সদস্যসহ বসুন্ধরা শুভসংঘ উপজেলা শাখার সহ সভাপতি সুস্মিতা হাজং, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন, রিজিলা হাজং,শাপলা হাজং,সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল আহমেদ সাজু, দপ্তর সম্পাদক সুমন মিয়া, ক্রিড়া সম্পাদক মো. মোবারক হোসেন, কর্ম ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক সংজ্ঞিতা দেবী, ইভেন্ট সম্পাদক সবিতা দেবী, সদস্য রস্মিতা হাজং ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কৃতি ও ভাষা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, হাজং সম্প্রদায় একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলেও তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও জীবনধারা। আধুনিকতার চাপে এসব ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার প্রতি সচেতন ও গর্বিত করে তুলতে সামাজিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি।
অমরিত কুমার হাজং বলেন, “আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই। শুভসংঘের মাধ্যমে এলাকায় ভালো কাজ, সচেতনতা সৃষ্টি ও অনিয়ম প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।”
পিছিয়ে না থাকার প্রত্যয় জানিয়ে উঠান বৈঠকে শিক্ষার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, শিক্ষাই পারে একটি জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য ও সামাজিক পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্তি দিতে।
ডিগ্রি ১ম বর্ষের ছাত্রী শুষপা হাজং বলেন, “আজকের এই উঠান বৈঠকের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আমরা আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। কিন্তু আমাদের সম্প্রদায়ের অনেকেই অর্থের অভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে না। বসুন্ধরা গ্রুপ যদি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের সহায়তা করে, তাহলে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারব।”
স্বাস্থ্য সচেতনতা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বৈঠকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা এবং মাতৃস্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, অনেক সময় সচেতনতার অভাবে সাধারণ রোগও জটিল আকার ধারণ করে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ পানি ব্যবহার ও স্যানিটেশন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বলা হয়, অল্প বয়সে বিয়ে মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে। এ বিষয়ে পরিবার ও সমাজকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাবলম্বিতা বিষয়ে মুনটিলা হাজং (৬০) বলেন, “আমাদের পাড়ার অনেক নারী কোনো ধরনের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পায় না। যদি টেইলারিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে নারীরা আয় করতে পারত এবং পরিবারের আর্থিক সংকটে ভূমিকা রাখতে পারত।”
বক্তারা জানান, নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা ও স্বনির্ভর কার্যক্রম চালু করা গেলে পুরো সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নত হবে।
হাজং সম্প্রদায়ের উপস্থিত সদস্যরা বসুন্ধরা শুভসংঘের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ভবিষ্যতেও যেন সংগঠনটি তাদের পাশে থাকে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, “শুভ কাজ সবার পাশে শুভসংঘ”-এই স্লোগানকে সামনে রেখে সংগঠনটি মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।হাজং সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে শুভসংঘের সঙ্গে থেকে এলাকার উন্নয়নমূলক ও সচেতনতামূলক কাজে অংশীদার হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া বলেন, সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোই বসুন্ধরা শুভসংঘের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতেও হাজং সম্প্রদায়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করার আশ্বাস দেন তিনি।
উঠান বৈঠকটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন।
বিডি-প্রতিদিন/তানিয়া