মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছেন প্রবাসী, বিত্তবান ও কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন—এমন ব্যক্তিরাও। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বঞ্চিত প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম তালিকায় না থাকলেও এমন অনেক ব্যক্তি সহায়তা পেয়েছেন, যাদের কৃষিজমি নেই কিংবা বন্যায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তালিকায় প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য এবং বিএনপির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কয়েকজন নেতার যোগসাজশে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই না করেই তালিকা চূড়ান্ত করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তালিকা তৈরির শুরু থেকেই মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু দলীয় নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনেক প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৩ জুন বরমচাল ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে কৃষকদের মধ্যে চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া ও ইউপি সদস্য ছয়ফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বঞ্চিত কৃষকরা।
তাদের অভিযোগ, তালিকায় দাউদপুর গ্রামের মো. মতিন মিয়ার নাম রয়েছে। তাঁর দুই ছেলে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন এবং অপর এক ছেলে সরকারি চাকরিতে কর্মরত। একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকাপ্রবাসী জলিল মিয়া ও তাঁর ভাই খালিক মিয়া, সাতরা গ্রামের নাদির মিয়া—যাঁর এক ছেলে কানাডায় এবং অন্য ছেলে বিদেশে থাকেন—তাঁরাও সহায়তা পেয়েছেন। এছাড়া ইউসুফ তৈয়বুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ আহমদ এবং জামাল মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি বোরো মৌসুমে কোনো আবাদ না করলেও সহায়তা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে বরমচাল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে খালেদ নামে এক ব্যক্তি বোরো জমি না থাকা সত্ত্বেও সহায়তা পেয়েছেন। একই ওয়ার্ডের ইমাম তরিকুল ইসলাম আকুল, সাবেক ইউপি সদস্য মহরম আলী এবং ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহিন আহমদ নাছির ও তাঁর ভাই সেলিম আহমদও সহায়তা পেয়েছেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছয়ফুল আলম বলেন, আমাদের ইউনিয়নের কৃষকদের তালিকা তৈরিতে অনেক অনিয়ম হয়েছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অনেক প্রবাসী ও বিত্তবান পরিবারের সদস্যদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের কারণে অনেক প্রকৃত দরিদ্র কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এমপিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।
অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া বলেন, চেয়ারম্যান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ যাচাই-বাছাই কমিটি ৫১৮ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু বরাদ্দ এসেছে মাত্র ১৯০ জনের জন্য। তাড়াহুড়ো করে তালিকা প্রস্তুত করতে গিয়ে কিছু ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। বঞ্চিতরা অভিযোগ করতেই পারেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কুলাউড়ায় প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য পরিবারপ্রতি ১৫ কেজি চাল ও ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদে উৎসাহিত করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১ হাজার ৫৩৭ জন কৃষকের জন্য ৪৬ দশমিক ১ মেট্রিক টন চাল এবং ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বরমচাল ইউনিয়নে ১৪৫, ভূকশিমইলে ৪৩৭, ভাটেরা ১৫০, জয়চণ্ডী ৯০, ব্রাহ্মণবাজার ১৯০, কাদিপুর ১৯৫, কুলাউড়া সদর ৪০, রাউৎগাঁও ৬০, টিলাগাঁও ৩৫, হাজীপুর ৬৫, পৃথিমপাশা ৩০ এবং কুলাউড়া পৌরসভায় ১০০টি পরিবারের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, চলতি বছরের বন্যায় অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে বরাদ্দ কম পাওয়ায় কিছু প্রকৃত কৃষকের নাম বাদ পড়েছে, এটি সত্য। অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম পাওয়া গেছে। যাচাই-বাছাই কমিটির স্বাক্ষরিত তালিকার ভিত্তিতেই ইউনিয়ন পর্যায়ে সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ দেখেছি। বিষয়টি কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা বিতরণে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই গণতান্ত্রিক সরকার সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থাকবে।’
বিডি-প্রতিদিন/এমএল