আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি বসুন্ধরা শুভসংঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে কেন্দ্রীয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিশেষ ‘মুক্ত আলোচনা’ সভা। “ভিনদেশি ভাষার ভিড়ে বাংলাই হোক আমাদের গর্বের হাতিয়ার”-এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সভায় অংশ নেন তরুণ শিক্ষার্থীরা।
মুক্ত আলোচনায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মহান ভাষা শহীদদের বীরত্ব ও অবদান, শুদ্ধ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলার অবস্থান, ভাষাকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার উপায় এবং বাংলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কৌশল নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শাখার সভাপতি আব্দুল মমিন, সাধারণ সম্পাদক রিয়াদুস সালেহীন, সহ-সভাপতি প্রিয়া আক্তার, শারমিন আক্তার ও শিরিন আক্তার, যুগ্ম-সম্পাদক মো. হানিফ আলী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া তাসনিম ও রওশন ইসলাম। হল প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাকিল মিয়া, ফরহাদ আহমেদ, কেন্টন চাকমা ও রিপন মিয়া। এছাড়াও রাজিব সরকার, ফারিহা, মেহেদি, মারিয়া খাতুন, সানজিদা আক্তার, মুসলেমিনা সুলতানা ও শাহিদা আক্তারসহ অনেকে অংশগ্রহণ করেন।
সভাপতি আব্দুল মমিন তার বক্তব্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরে ভাষা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তিনি বিশেষভাবে ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত-এর অবদান উল্লেখ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচির অধিবেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন এবং সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করায় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যার চূড়ান্ত ফসল ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি।
সাধারণ সম্পাদক রিয়াদুস সালেহীন মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, উন্নয়নের জন্য মাতৃভাষা কোনো বাধা নয়; বরং শক্তি। তিনি জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানির উদাহরণ দিয়ে বলেন, এসব দেশে শিক্ষা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় নিজস্ব ভাষার প্রাধান্য রয়েছে। বাংলাদেশেও শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলার ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রভাষার তাৎপর্য নিয়ে সহ-সভাপতি প্রিয়া আক্তার বলেন, রাষ্ট্রভাষা হলো সেই ভাষা-যাতে নাগরিক তার অধিকার দাবি করতে পারে এবং স্বপ্ন দেখতে পারে। তিনি ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে বলেন, “ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে পরিচয় কেড়ে নেওয়া।” তিনি আহ্বান জানান, ফেব্রুয়ারিতেই নয়, সারা বছর বাংলাকে ভালোবাসতে হবে।
যুগ্ম-সম্পাদক মো. হানিফ আলী ভাষা বিকৃতি রোধে করণীয় তুলে ধরে বলেন, ভিনদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ নয়-নিজস্ব সংস্কৃতি লালনই হতে পারে ভাষা রক্ষার উপায়। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জসিমউদ্দীন, সুকুমার রায়, আহসান হাবীব ও সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর সাহিত্যকর্মের উদাহরণ টেনে বাংলার শক্তি ও সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেন।
বাংলাকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর করণীয় বিষয়ে সহ-সভাপতি শারমিন আক্তার বলেন, ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ধারক। তিনি স্মরণ করেন ভাষা শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা শহীদদের। ১৯৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা চর্চা বাড়াতে হবে, অনুবাদ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট তৈরি করতে হবে।
সহ-সভাপতি শিরিন আক্তার বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তন তুলে ধরে বলেন, চর্যাপদ থেকে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রায় বাংলা সমৃদ্ধ হয়েছে। শুদ্ধ ভাষাচর্চার মাধ্যমে এ ঐতিহ্য রক্ষা করার আহ্বান জানান তিনি।
শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখার সদস্য রাজু আহমেদ বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায় এবং আজ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
সমাপনী বক্তব্যে সভাপতি আব্দুল মমিন প্রমিত বাংলা উচ্চারণ ও নিয়মিত সাহিত্যচর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ভাষা বিকৃতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে সংগঠনের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে তিনি ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
বিডি-প্রতিদিন/তানিয়া