Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
প্রকাশ : ১৫ মে, ২০১৯ ১৮:৫৪

বাগানে দাম কম, বাজারে চড়া

মধুমাসের শুরুতেই নামলো রাজশাহীর আম

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

মধুমাসের শুরুতেই নামলো রাজশাহীর আম

হরেক রকমের দেশি ফলের বার্তা নিয়ে বুধবার এসেছে মধুমাস জৈষ্ঠ্য। আর এদিনই রাজশাহীর গাছ থেকে নামতে শুরু করেছে আম। বাগান থেকে ঝুড়ি ভর্তি হয়ে আম চলে গেছে বাজারেও। প্রথম দিন সেখানে আমের দামও বেশ চড়া। তবে এদিন বাগানে আমের দাম ছিল কম। এতে চাষিরা অখুশি।

           
রাজশাহীর আমের খ্যাতি দেশজুড়ে। দেশের বাইরেও পাঠানো হয় এই আম। কিন্তু অসাধু কিছু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার আশায় অপরিপক্ব আম পেড়ে আগেভাগে বাজারজাত করার চেষ্টা করেন। ফলে সেসব আমে রাজশাহীর আমের সুনাম নষ্ট হয়। এমনটি যেন না হয় তার জন্য অপরিপক্ব আমের বাজারজাত ঠেকাতে গেল কয়েক বছরের মতো এবারও রাজশাহীর আম নামানোর সময় বেঁধে দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। গত ১২ মে চাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে সভা করে এই সিদ্ধান্ত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৫ মে গুটি জাতের আম পাড়া শুরু হওয়ার কথা।
           
সে অনুযায়ী বুধবার সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থানের চাষিরা বাগান থেকে গুটি জাতের আম নামানোর কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। দুপুরের মধ্যেই আম পৌঁছে যায় বাজারে বাজারে। জমে ওঠে বেচাকেনা। 

রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল, সাহেববাজার, শালবাগান ও লক্ষ্মীপুর এলাকায় আম বিক্রি হতে দেখা যায়। এছাড়া জেলার সবচেয়ে বড় আমের হাট পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরেও আম উঠতে শুরু করেছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। আর সব বাজারেই আমের দাম বেশি।
          
সকালে রাজশাহী মহানগরীর কাটাখালী দেওয়ানপাড়া এলাকার একটি বাগান থেকে আম নামাচ্ছিলেন চাষি মহব্বত আলী। তিনি বলেন, তাপদাহের কারণে আম যে এবার আগেই পাকবে সেটা তারা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই জেলা প্রশাসনের ওই সভায় তারা আম পাড়ার সময় নির্ধারণের বিরোধীতা করেছিলেন। তারপরেও সময় নির্ধারণ করা হয়। ওই সভা থেকে এসেই দেখেন, গাছ থেকে একটা-দুটো করে পাকা আম পড়ছে। কিন্তু গাছের আম নামাতে অপেক্ষা করতে হয়। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় কাটার পর আর আম নামাতে এক মুহুর্ত দেরি করছেন না।
          
বাঘা উপজেলার নূরনগর গ্রামের বাগান থেকে শ্রমিকদের দিয়ে আম নামাচ্ছিলেন রাজশাহী মহানগরীর ব্যবসায়ী শাকিল হোসেন। তিনি বলেন, গাছে মুকুল আসার সময় তিনি চার বিঘার এই বাগানটা ৬০ হাজার টাকায় কিনেছিলেন। বাগানে প্রচুর আমও এসেছিল। কিন্তু প্রথম দিকে শিলাবৃষ্টিতে অনেক আম ঝরে। সর্বশেষ গত সোমবার সন্ধ্যায় আকস্মিক ঝড়ে আরও কিছু আম ঝরে পড়ে। এখন আম নামানো শুরু হলেও প্রথম দিন অনেক কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। এতে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।
         
রাজশাহী মহানগরীর জিন্নানগর এলাকার ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের পবা উপজেলার মিয়াপুর, খিরসানটিকর ও দারুশা এলাকায় কয়েকটি বাগান কেনা আছে। 

তিনি জানান, বুধবার তিনি চার মণ আম ভেঙেছেন। পাইকারী বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে হয়েছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা মণ। প্রতিকেজি আমের দাম গড়ে মাত্র ২৩ টাকা। এই দামে আম বিক্রিতে তিনিও লোকসানের আশঙ্কা করছেন। তবে উন্নতজাতের আম নামানো শুরু হলে ভাল দাম পাওয়া যাবে বলে তার আশা।
         
দুপুরে রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল ঢাকা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বেশকিছু ব্যবসায়ীকে আম বিক্রি করতে দেখা যায়। এদের মধ্যে ফারুক হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী জানান, মেহেরচারা নামের (গুটি জাত) আম তিনি বিক্রি করছেন ১৫০ টাকা কেজি। বুধবারই তিনি পাকা পাকা এসব আম পবার দামকুড়া এলাকা থেকে কিনে এনেছেন। তবে বাগানে কত দামে কিনেছেন তা জানাতে চাননি এই ব্যবসায়ী। 

তিনি বলেন, গুটি আম বলে বাগানে দাম কিছুটা কম। তবে উন্নতজাতের আমগুলো ভাঙা শুরু হলে দাম বাড়বে।
          
রাজশাহীতে এবার সাত ধাপে বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু পরিপক্ব আম গাছ থেকে পাড়া হবে। এর মধ্যে উন্নতজাতের গোপালভোগ পাড়া শুরু হবে ২০ মে। এছাড়া রাণীপছন্দ ২৫ মে, খিরসাপাত বা হিমসাগর ২৮ মে এবং লক্ষণভোগ বা লখনা নামানো যাবে ২৬ মে থেকে। এছাড়া ল্যাংড়া আম ৬ জুন, আম্রপালি ও ফজলি ১৬ জুন থেকে নামানো যাবে। আর সবার শেষে ১৭ জুলাই থেকে নামানো যাবে আশ্বিনা জাতের আম। এর আগে আম নামালে আইনগত ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।
           
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন বলেন, গুটি আম প্রতিবছরই একটু আগে পাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশেষ করে উষ্ণ আবহাওয়া গুটি আম একটু আগেই পাকিয়ে দিয়েছে। তাই বেঁধে দেওয়া দিন আসার সঙ্গে সঙ্গেই চাষিরা এই আম নামাতে শুরু করেন। অন্যান্য আমগুলো যে সময় পাকে সে সময়কেই নামানোর জন্য ঠিক করা আছে।
           
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক বলেন, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা আছে। তাপদাহ কেটে গেলে এবং নতুন কোনো প্রকৃতিক দুর্যোগ না এলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোনো সমস্যা হবে না। 

তিনি বলেন, প্রথম প্রথম গুটি জাতের আম বলে চাষিরা দাম একটু কম পাচ্ছেন। কিন্তু বাজারে অন্য বছরগুলোতে গুটি আমের যে দাম থাকে এবার তার চেয়েও বেশি। অন্য আম যখন বাজারে আসবে তখন সেগুলোরও দাম ভাল থাকবে। তখন চাষি এবং ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন বলেই মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

বিডি প্রতিদিন/এনায়েত করিম


আপনার মন্তব্য