বৃহস্পতিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল

ডাক্তার নার্স নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড, ক্ষুব্ধ এমপি পীর মিসবাহ

মাসুম হেলাল, সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক থাকার কথা ৬২ জন। আছেন মাত্র ১২ জন। এ ছাড়া রয়েছে বিপুলসংখ্যক নার্স-টেকনিশিয়ানসহ কর্মী সংকট। তবু থেমে নেই বদলির আদেশ। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা থেকে ওপর মহল চাপ দেন। ডাক্তার ও নার্স সংকটের এ করুণ দশায় চরম দুর্ভোগের মুখে নিয়ত জেলার অসহায় মানুষ। এমনতিইে চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। তার মধ্যে এসব তুঘলকি কান্ডে চরম ক্ষুব্ধ সদর আসনের সংসদ সদস্য বিরোধী দলের হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ অধিদফতরের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে সংসদে কথা বলে সদর হাসপাতালের উন্নয়ন থেকে চিকিৎসক-নার্স একদিকে যত আনেন, অন্যদিকে ওপর মহলের তদবিরে তারা আরেকদিকে চলে যান। মঙ্গলবার দুপুরে এক সিনিয়র স্টাফনার্স ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের কাছে ময়মনসিংহে বদলির আবেদন নিয়ে আসেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা ফোন করে বলেন, বদলির ব্যাপারে তাকে সহযোগিতা করুন! সিভিল সার্জন জনবল সংকটের মুখে এমন কথা শুনে হতবাক! বদলি ইচ্ছুক নার্সকে প্রতিভূ (রিপ্লেসমেন্ট)-সাপেক্ষে বদলির ছাড়পত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দেন তিনি। এদিকে, বিদায়ী বছরের ৩০ ডিসেম্বর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) খালেদা বেগম সুনামগঞ্জের ১৫ জন সিনিয়র স্টাফনার্স, স্টাফনার্স ও সহকারী স্টাফনার্সকে একযোগে বিভিন্ন স্থানে বদলির অফিস আদেশে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে ১৩ জনই জেলার উন্নত চিকিৎসাসেবাপ্রাপ্তির প্রধান আশ্রয়স্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে কর্মরত। অর্ধেকেরও কম জনবল নিয়ে খুঁড়িয়ে চলা হাওর জনপদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের এ প্রতিষ্ঠানে জনবল না বাড়িয়ে এখান থেকে আরও জনবল অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হলে এর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। হাসপাতালসূত্র জানান, সদর হাপাতালে মঞ্জুরিকৃত ২২৮টি নার্সিং কর্মকর্তার পদের মধ্যে ৫৮টি শূন্য রয়েছে। এ ১৩ জন নার্স একযোগে চলে গেলে প্রায় ডাক্তারশূন্য হাসপাতালটিতে জনগণকে চিকিৎসাসেবা প্রদান অব্যাহত রাখা কষ্টকর হয়ে পড়বে। সদর হাসপাতালে সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০ পদের মধ্যে সাতটিই শূন্য অবস্থায় রয়েছে। ১১ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র চারজন। আবাসিক মেডিকেল অফিসারের তিন পদের মধ্যে শূন্য দুটি। ৩৪ জন মেডিকেল অফিসারের মঞ্জুরিকৃত পদ থাকলেও ২৭ পদে ডাক্তার নেই। সব মিলিয়ে জেলা সদরের বড় এ হাসপাতালটিতে ৫৯ জন ডাক্তারের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৬ জন, অর্থাৎ ৪৩টি ডাক্তারের পদ শূন্য অবস্থায় রয়েছে। জানা যায়, গত ডিসেম্বরে সুনামগঞ্জ জেলায় ৭৯ জন ডাক্তার নিয়োগ দেয় সরকার। তার মধ্যে দুজন কর্মস্থলে যোগ না দিয়েই মন্ত্রণালয় থেকে ‘সংশোধিত আদেশ’ এনে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। এদিকে, একযোগে ১৫ জন নার্সকে অন্যত্র বদলি করে নেওয়ার অফিস আদেশের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন সদর আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। তিনি সমসংখ্যক জনবল প্রদান করে ও শূন্যপদগুলো পূরণসাপেক্ষে সদর হাসপাতালে কর্মরত জনবল অন্যত্র বদলি করে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্‌বান জানিয়েছেন। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজিত আনন্দ শোভাযাত্রা শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশে পরিকল্পনামন্ত্রীর উপস্থিতিতে পীর মিসবাহ বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি খাতে জনবল সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে চরম জনবল সংকট। একযোগে অনেক নার্সকে বদলি করে নেওয়া হয়েছে। কার্ডিওলজিস্টসহ টেকনিক্যাল পদগুলো বছরের পর বছর ধরে শূন্য। আমরা স্বাস্থ্য খাতে জনবল দেওয়ার জন্য সংসদে কথা বলি, মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিই। কিন্তু এভাবে একযোগে এতগুলো লোক নিয়ে যাওয়া হলে স্বাস্থসেবা ভেঙে পড়বে। হাসপাতালগুলোয় বড় বড় ভবন নির্মাণ আর মেশিন সরবরাহ করে দিয়ে ডাক্তার-নার্স না দিলে থাকলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে না, লাভবান হবেন ঠিকাদার আর সরবরাহকারীরা। সমসংখ্যক জনবল না দিলে ছাড়পত্র না দেওয়ার আহ্‌বান জানান তিনি। জানা যায়, মন্ত্রীর উপস্থিতিতে পীর মিসবাহর দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নার্সদের বদলির ছাড়পত্র না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালসূত্র আরও জানান, বিগত প্রায় ১০ বছরে ধরে কার্ডিওলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান, এক্স-রে টেকনিশিয়ান, ফার্সাসিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকায় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। হাসপাতালে এক্স-রে, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। রেডিওলজিস্ট না থাকায় নির্যাতিতার বয়স পরীক্ষা অন্যত্র গিয়ে করাতে হচ্ছে। কার্ডিওলজিস্ট না থাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন সেবা থেকে। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালসহ সারা জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে জনবল সংকট রয়েছে। যে কারণে জনগণকে কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যাহত হয়। এর মধ্যে অনেকেই এখান থেকে বদলি হয়ে যেতে চান। ওপর থেকে বদলি আদেশ আসে। আমরা সমসংখ্যক জনবল দিয়ে বদলি করে নেওয়ার পক্ষে।