Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ২২:৩৭

জবানবন্দিতে লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন সেই অন্তঃসত্ত্বা মা-মেয়ের খুনি

মো. নাসির উদ্দিন, টাঙ্গাইল:

জবানবন্দিতে লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন সেই অন্তঃসত্ত্বা মা-মেয়ের খুনি

টাঙ্গাইল পৌর শহরের ভাল্লুককান্দী এলাকায় অন্তঃসত্ত্বা মা তার চার বছরের মেয়েকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ঘাতক রাইজুদ্দিন (৩৬) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। 

সোমবার সন্ধ্যা পৌঁনে ৭টার দিকে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলী আদালতে তিনি দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পরে আদালতের বিচারক আবদুল্লাহ আল-মাসুম জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালতের বিচারক। রাইজুদ্দিন টাঙ্গাইল শহরের চরপাতুলি এলাকার মৃত সুকুম উদ্দিনের ছেলে।
 
এর আগে সোমবার ভোর রাতে টাঙ্গাইল পৌর শহরের ভাল্লুককান্দী এলাকায় থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 

টাঙ্গাইলের কোর্ট ইন্সপেক্টর তানবীর আহাম্মেদ বলেন, সোমবার সন্ধ্যার দিকে রাইজুদ্দিন আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। 

পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃত রাইজুদ্দিন নিহত লাকি বেগমের স্বামীর বন্ধু। মাত্র ৮ লাখ টাকার জন্যই ঘরে ঢুকে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে রাইজুদ্দিন। প্রথমে অভিযুক্ত রাইজুদ্দিন অন্তঃসত্ত্বা লাকি বেগমকে হত্যা করে, পরে ওই গৃহবধূর ৪ বছরের মেয়ে হুমায়রা আক্তার আলিফাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ঘাতক ৮ লাখ টাকা নিয়ে চলে যায়। মূলত টাকার জন্যই এ নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে পুলিশ জানায়। গ্রেফতার হওয়ার পর তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ লুট হওয়া সাত লাখ ৯৮ হাজার টাকা ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, রক্তমাখা পোষাক এবং দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে। হত্যার পরেই রাইজুদ্দিন আল আমিনকে শান্তনা দেয়ার জন্যই সব সময়ই সাথে ছিল। 

হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য এবং মূল আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। 

সোমবার দুপুর দেড় টার দিকে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, আসামি রাইজুদ্দিন একজন ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। রাইজুদ্দিন নিহতের স্বামী ফ্লেক্সি লোড ও বিকাশের ব্যবসায়ী আল আমিনের বন্ধু। 

আসামি পূর্ব থেকেই জানতো আল আমিনের বাড়িতে ৮ লাখ টাকা আছে। সেই টাকা লুটের জন্যই ঘটনার দিন শনিবার রাতে বাসায় যায়। এ সময় আল আমিনের স্ত্রী লাকী বেগম (২২) বাসার গেট খুলে দেয়। স্বামী আল আমিনের বন্ধু আসামি রাইজুদ্দিন এই বাসায় এর আগে বহু বার এসেছে। স্বামীর বন্ধু হওয়ায় রাতে বাসার গেট খুলে দেয় লাকী বেগম। গেট খুলে দেয়ার পরপরই লাকীকে পেছন থেকে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এতে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা লাকী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এ সময় আসামি রাইজুদ্দিন মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য লাকীর গলা কাটে এবং পেটে ছুরি চালিয়ে অনাগত বাচ্চাকেও হত্যা করে। এ সময় লাকীর শিশু কন্যা হুমায়রা আক্তার আলিফা (৪) ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে দেখে তার মা মাটিতে পড়ে আছে। এ সময় শিশু আলিফা চিৎকার করে আসামি রাইজুদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বলে ‘কাকু কি হয়েছে, আমার মা’কে মারছ কেন?” এই কথা শুনে আসামি রাইজুদ্দিন শিশু আলিফাকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর তাদের ঘর থেকে নগদ ৮ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।

তিনি বলেন, রাইজুউদ্দিন আল আমিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। সে সুবাধে রাইজ উদ্দিন আল আমিনের বাড়িতে যাতায়াত করতো। রাইজুদ্দিনকে দিয়ে আলআমিন মাঝে মাঝে তার বাড়ি থেকে টাকা আনতে পাঠাতো।  মামলার পর টাঙ্গাইল শহরের ভাল্লুককান্দি এলাকা রাইজুদ্দিনকে গ্রেফতারের পরে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বিস্তারিত জানিয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার। 

পরে রাইজ উদ্দিনের দেয়া তথ্য অনুযায়ি তার বসতবাড়ির মুরগীর খোয়ার থেকে ৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ও ঘরের ভিতর থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া আসামির দেখানো জায়গা ধান খেতের আইল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়। যে লুঙ্গি ও শার্ট পড়ে হত্যা করা হয়েছে আলামত হিসেবে সেই লুঙ্গি ও শার্টও উদ্ধার করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সময় হত্যাকারী আল আমিনকে শাস্তানা দেয়ার জন্য সব সময়ই তার কাছেই ছিল। পরে সে পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে দোষ স্বীকার করে। 

তিনি আরো বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের পর ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে ১টি ও  থানা পুলিশের পক্ষ থেকে আরেকটি চৌকস টিম গঠন করা হয়। পরে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। সে একাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে পুলিশকে জানায়। তবে এর সাথে যদি আর কেউ জড়িত থাকে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

উল্লেখ্য, শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে লাকি বেগম (২২) ও তার মেয়ে আলিফাকে (৪) কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পরে নিহতের স্বামী আল আমিন আসাদ মার্কেটে মোবাইল ফোন ফ্যাক্স ও বিকাশের দোকানের কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে লাশ দেখতে পান।  রাতেই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে রবিবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় রবিবার বিকেলে নিহত লাকি বেগমের বাবা হাসমত আলী বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে টাঙ্গাইল সদর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে রাতেই জানাজা শেষে তাদের লাশ দাফন করা হয়। 


বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য