শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল, ২০২১ ১৮:১১
প্রিন্ট করুন printer

নাটোরে ধানে পোকার আক্রমণ, দুশ্চিন্তায় কৃষক

নাটোর প্রতিনিধি:

নাটোরে ধানে পোকার আক্রমণ, দুশ্চিন্তায় কৃষক
Google News

নাটোরের লালপুরে বোরো ধানের মাঠে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। ধান পাকার শেষ মুহূর্তে পোকার আক্রমণে ধানগাছ মরে যাচ্ছে। এ কারণে পুরোপুরি পাকার আগেই অনেক কৃষক ধান কেটে নিচ্ছেন।

কৃষকেরা জানান, ধান পাকার আগ মুহূর্তে শীষের গোড়ার কান্ডে পোকার আক্রমণে ছিদ্র দেখা দিচ্ছে। এতে প্রথমে ডগার পাতা পুড়ে যাওয়ার রং ধারণ করছে। সেই সাথে ধানের শীষ নুইয়ে পড়ে গাছ মরে যাচ্ছে। 

এ কারণে অনেকে আধা পাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন। অনেকে স্থানীয় বাজারের দোকানদারদের পরামর্শে ধানে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হচ্ছে না।

উপজেলার সাঁইপাড়া ও চকবাদেকুলপাড়া এলাকার ধানের ক্ষেত ঘুরে দেখা যায়, মাঠে মাঠে মৃদু হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ভরা ধানক্ষেত। শিষের ভারে নত ধানগাছ। এসব খেতের কিছু কিছু অংশের ধানগাছ মরে গেছে। কৃষকরা পরিপূর্ণ পাকার আগেই ধান কাটছিলেন। পাকা ধান কাটার আনন্দ নেই। চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে বিষন্নতার ছাপ।

কৃষক ফজলুর রহমান ফজল বলেন, ‘আড়াই বিঘা জমিত ধান ৮১ জাতের লাগাইছি। ধান পুরো পাকতে আরও সপ্তাখানেক লাগবি। কিন্তু খেতে পোকা দেখা দিছে। শীষের নিচে পাতার গোড়ায় পোকা ফুটা করছে। এতে পাতা শুকায় যাচ্ছে আর ধানের শীষ ভাঙ্গি পড়ছে। তাই পাকার আগেই ধান কাটতে হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাত হাজার ট্যাকা বিঘা জমি কটে (ইজারা) লিচি। বীজ, সার, কীটনাশক, পানি আর পরিচর্যা খরচ বিঘা প্রতি ১৬ হাজার ট্যাকা হইচে। অপুক্ত ধান চিটি হয়া গিছে। খরচ তো দুরের কতা, ইজারার ট্যাকা হবি না।’

কৃষক ইদবার হোসেন বলেন, ‘তিন বিঘা জমিত ৮১ জাতের ধান আবাদ করিচি। জমিতে পোকা ধরিছে। কীটনাশক কারিশমা, ইমিস্টারটপ দিচি। কুনো লাভ হচ্চে না। কৃষি অপিসের কেউ খোঁজ নেয় না। 

দোকানদাররা বুলচে কারেন্ট পুকা, গুড়া পচা রোগ, মাজরা পুকা আবার কেউ বুলচে হপার পুকা হতে পারে।’ তিনি বলেন, আড়াই বিঘা ৭৪ জাতের ধান লাগিয়েছেন। সেগুলোয় কোন পোকা লাগেনি।

কৃষক সোনা বলেন, তিনি ১৩ কাঠা জমিতে ২৮ জাতের ধান লাগিয়েছেন। সব পোকায় শেষ করে দিয়েছে। কৃষক মরু বলেন, দেড় বিঘা জমিতে জিরা ধান আবাদ করেছেন। ধানে পোকা লাগায় হতাশ হয়ে পড়েছেন।

ওই মাঠে কৃষক মিলন ১০ কাঠা, মনিরুল এক বিঘা, মাজেদুল ১০ কাঠা, জইর দেড় বিঘা, মহির তিন বিঘা, মুনির দুই বিঘা, খালেক সোয়া এক বিঘা, ছাকাত এক বিঘা জমিতে ৮১ জাতের ধান চাষ করেছেন। সব ক্ষেত পোকার আক্রমণে জরাজীর্ণ। 

তারা জানান, মাঠের প্রায় ৭০০ বিঘা জমিতে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এতে প্রায় ১৫ শ কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতি আরও বাড়বে।

লালপুর ইউনিয়ন ব্লক সুপারভাইজার আব্দুল মালেক বলেন, ধানে মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। আমরা কৃষকদেরকে চারা রোপনের ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ধানের জমিতে কাঠি, লাঠি বা বাঁশের কঞ্চি পুতে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু কৃষকরা তা না মানায় পোকার বিস্তার লাভ করেছে। 

তিনি আরো বলেন, ডিম পাড়ার দেড় মাস পর পোকাগুলো পরিপূর্ণ হয়। এ সময় বিষ প্রয়োগেও কোন লাভ হয় না। তিনি ‘ভিরচাকো’ নামে বিষ প্রয়োগের পরামর্শ দেন।

লালপুর উপজেরা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি ধানের গাছে থোড় থেকে শীষ বের হওয়ার পরপরই শিষের রং সাদা হয়ে চিটে পড়ছে। এটা ধানের ‘হিট শক’ রোগ। এ মুহুর্তে জমিতে অন্তত ২-৩ ইঞ্চি পানি রাখতে হবে। যাতে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে যদি তাপমাত্রা রাখা যায়। 

তিনি আরও বলেন, যেখানে ঝড় হয়েছে, সেখানে পাতাপোড়া রোগ হতে পারে। ওইসব এলাকায় ৬০ গ্রাম এমওপি সার ও ৬০ গ্রাম থিওভিট ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে বিকাল বেলায় প্রতি ৫ শতক জমিতে ¯েপ্র করতে হবে। এতে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কৃষিতত্ত্ব) ও বাংলাদেশ কৃষিতত্ত্ব সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. ওমর আলী বলেন, কৃষকদের ভাষ্য থেকে বোঝা যায় যে, মাজরা পোকা আক্রমণ ঘটেছে। সময়মতো উপযোগী ওষুধ না দেওয়ায় বিপর্যয় ঘটেছে। এছাড়া অতিরিক্ত তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ও ধুলিঝড়েরর কারণে ধানে চিটা হতে পারে। 

তিনি কৃষকদের আরো পরামর্শ দেন যে, ক্ষেতে ফসল ফলানোর সময় থেকেই চিন্তা করতে হবে, যেসকল সমস্যা হতে পারে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বিডি প্রতিদিন/ মজুমদার 

এই বিভাগের আরও খবর