কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ও বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সীমান্তে অবস্থিত এক বিচ্ছিন্ন জনপদ জলঙারকুঠির চর। চারদিকে বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ, মাঝখানে ছোট্ট একটি চর। এখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার বাস করে। চরের প্রতিটি মানুষের জীবনই ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে জর্জরিত। অনেকে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সব হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এখানে। তবে এখানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না; এখনও নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা বা যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এ অবস্থায় এসব মানুষের পাশে এগিয়ে আসে দেশের শীর্ষস্থানীয় বসুন্ধরা গ্রুপের সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ’। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে বাঁশ ও টিন দিয়ে নির্মাণ করা হয় বসুন্ধরা স্কুল। সেই ঘরটি হয়ে ওঠে শিশুদের স্বপ্ন দেখার জায়গা। প্রতিদিন সকালে বই-খাতা হাতে শিশুদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে স্কুল প্রাঙ্গণ।
বর্তমানে স্কুলটিতে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। জলঙারকুঠির চর ছাড়াও আশেপাশের চরের শিশুরাও পর্যায়ক্রমে এ স্কুলে পড়তে আসে। কিন্তু সেই শিশুদের স্বপ্নের প্রদীপ এখন নিভে যাওয়ার পথে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে।
ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমে ওই চরসহ বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে চরটির আয়তন। ইতোমধ্যে চরের বেশ কয়েকটি বসতঘরের পাশ ঘেঁষে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ব্রহ্মপুত্র ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে স্কুলটির কাছাকাছি। যেকোনো সময় ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে স্কুলসহ চরের বাড়িঘর ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের শিক্ষার্থী বীথি খাতুন, রোকাইয়া খাতুন, মঞ্জু মিয়া ও সবুজ মিয়া জানায়, ‘নদী ভাঙার কারণে আমাদের স্কুলটা ভেঙে যাবে। সরকার যেন আমাদের স্কুলটা রক্ষা করে দেয়। নইলে আমাদের পড়া বন্ধ হয়ে যাবে।’
স্কুলের শিক্ষক আবু সাঈদ ও এনামুল হক জানান, এই স্কুলটি চরের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কারণে স্কুলটি এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো সময় এটি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
জলঙারকুঠি চরের গৃহিনী রজিবা বেগম বলেন, ‘এই চরে আমাদের জীবন সংগ্রামের। আগে বাচ্চাদের পড়াশোনার কোনো সুযোগ ছিল না। এখন বসুন্ধরা স্কুলে তারা পড়তে পারে। কিন্তু নদীভাঙন বন্ধ না হলে বাড়ি-ভিটাসহ স্কুলটাও নদীতে চলে যাবে। আমাদের সন্তানদের পড়া আর হবে না।’
চরের বাসিন্দা হায়দার আলী ও আবু বক্কর জানান, ‘বাপ-দাদার জমিজমা নদীতে হারিয়ে চরে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এভাবে নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে এখান থেকেও আবার উচ্ছেদ হতে হবে আমাদের। এখন আতঙ্কে দিন কাটছে আমাদের। নদীভাঙন রোধ করতে পারলে বসুন্ধরা স্কুলটাও টিকে যাবে, আমাদের বাচ্চারাও পড়া চালিয়ে যেতে পারবে।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ‘এ চরে কিংবা যেকোনো চরে নদীভাঙন রোধে কাজ করার কোনো নিয়ম নেই। তবে একটা আবেদন পেলে সেখানে কিছু জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা যেতে পারে।’
বিডি-প্রতিদিন/এমই