বগুড়ায় চলতি মৌসুমে প্রায় চারশো কোটি টাকার শুকনা মরিচ উৎপাদন হয়েছে। এসব মরিচের বেশিরভাগই উৎপাদন হয়েছে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের চরাঞ্চলে। ফলে যমুনা চরাঞ্চলের কৃষকদের মরিচ চাষে ভাগ্য বদলেছে। চরাঞ্চলে মরিচ এখন কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। বগুড়ার লাল মরিচ দেশজুড়ে বিখ্যাত। যে কারণে প্রতিবছর বাড়ছে মরিচের আবাদ।
যমুনাঘেঁষা চরগুলোর চারদিকে যেন লাল রঙের এক সমুদ্র। বাড়ির উঠান, বাঁধ, বালুচর সবখানেই শুকাতে দেওয়া হয়েছে লালমরিচ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কৃষকের ঘরে যেন আগুনের আভা পড়েছে। চরগুরোতে এখন চলছে মরিচ শুকানো, উল্টানো, বাছাই ও বস্তাবন্দি করার কাজ।
জানা যায়, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার যমুনা নদীর চরাঞ্চলে প্রতিবছরই ব্যাপক মরিচ চাষ হয়ে থাকে। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি লাল মরিচ উৎপন্ন হয় সারিয়াকান্দিতে। উৎপাদিত এই মরিচের বেশি অংশ শুকানোর পর চলে যায় দেশের বিভিন্ন মসলা প্রস্তুকারী কোম্পানিতে। বগুড়ার মরিচের রং এবং ঝাল বেশি হওয়ায় এর চাহিদাও বেশি। যার কারণে কোম্পানিগুলো মরিচ কেনার জন্য প্রতিনিধির মাধ্যমে মৌসুমের শুরু থেকেই তৎপরতা চালাতে থাকে। যমুনা চরাঞ্চলের পাকা শুকনা মরিচ মানে সোনার ফসল। চর এলাকায় এখন শুকনা মরিচ বাছাই উৎসবে মেতে উঠেছে শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক। যমুনা চরের কৃষকদের উঠান, বাড়ির চালা মরিচে লাল হয়ে গেছে। মরিচ নিয়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। এদিকে মরিচ সংগ্রহর জন্য চরগুলোতে প্রতিনিয়ত যাচ্ছে ফুড প্রোসেসিং কোম্পানির প্রতিনিধিরা। এবার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার চরাঞ্চলে ১৯ হাজার ৮৭৬ টনের বেশি মরিচ উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে সারিয়াকান্দির যমুনা চর থেকে। এককভাবে এই উপজেলাতেই প্রায় ১৭০ কোটি টাকার লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাব বলছে, প্রতি বিঘা জমিতে মরিচ চাষে গড়ে খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। অনুক‚ল আবহাওয়ায় বিঘাপ্রতি ফলন হয় ৮ থেকে ৯ মণ। বাজারে প্রতি মণ ৯-১২ হাজার টাকায় বিক্রি হলে বিঘাপ্রতি সম্ভাব্য লাভ দাঁড়ায় ৩০-৪০ হাজার টাকা।
তবে কৃষকদের ভাষ্য, বাস্তবে এই হিসাব সবসময় মেলে না। কারণ উৎপাদন খরচের বড় অংশ চলে যায় হাইব্রিড বীজে, যার দাম কেজিপ্রতি ৬০-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয় সার, কীটনাশক, শ্রম ও সেচ খরচ। ফলে প্রকৃত ব্যয় অনেক সময় সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
বগুড়া কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ মৌসুমে বগুড়ায় ৫ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। যার ৮০ ভাগ চাষ করা হয়েছে যমুনা নদীর চরাঞ্চলে। এরমধ্যে হইব্রিড জাতের মরিচ চাষ হয়েছে ৩ হাজার ৮২০ হেক্টর এবং উফশী ১ হাজার ৭২০ হেক্টর। প্রতি হেক্টরে ১৫ দশমিক ৬ মেট্রিকটন মরিচের উৎপাদন ধরে উৎপাদিত মরিচের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৩ হাজার ৪৮০ মেট্রিকটন। এরমধ্যে শুকনা মরিচরে পরিমাণ ২০ হাজার ৮৭০ মেট্রিকটন। প্রতি মণ মরিচের দাম সর্বনিম্ন ৯ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা ধরলে উৎপাদিত শুকনা মরিচের মূল্য দাঁড়ায় ৪৩০ কোটি টাকা। বগুড়ার লাল মরিচের আকর্ষণীয় রং, গুণগত মান ও ঝালের কারণে এর চাহিদা রয়েছে দেশ-বিদেশ জুড়ে।
সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের পারতিত পরল গ্রামের মরিচ চাষী ফজলু মিয়া জানান, বগুড়ার উৎপাদিত মরিচের মান উন্নত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি প্রতিযোগিতা করে ভালো দামে তা কিনে থাকে। এতে লাল মরিচের চাহিদা বাড়ায় এ কাজে বাড়ির নারীরাও সমানভাবে শ্রম দিয়ে থাকেন। মরিচের বীজ বপণ থেকে শুরু করে, উঠানো, শুকানো, বাছাই ও বস্তায় ভরা পর্যন্ত লাল মরিচের উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে সহযোগিতা করেন তারা। এতে তাদের লাল মরিচ উৎপাদন যেমন সহজ হয় তেমনি বাড়তি আয় হয় নারীদের।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, বগুড়ার লাল মরিচ দেশজুড়ে বিথ্যাত। স্থানীয়ভাবে এ মরিচ ২০ শতাংশ ব্যবহার হয়। অবশিষ্ট মরিচ দেশজুড়ে ও দেশের বাইরে ব্যবহার হয়ে থাকে। বগুড়ার মরিচের গুণগতমান ভালো হওয়ায় দেশের নামকরা কোম্পানিগুলো এই জেলার মরিচ কিনে থাকে। চাহিদা থাকায় ভালো দামও পান চাষিরা।
তিনি বলেন, এ মৌসুমে বগুড়ায় ৫ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। যার ৮০ ভাগ চাষ করা হয়েছে যমুনা নদীর চরাঞ্চলে। কৃষি অফিস থেকে মরিচ চাষের জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
এদিকে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বগুড়ার চরাঞ্চলের মরিচ মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। কৃষক, আড়তদার, পাইকার বা কোম্পানি, তারপর প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়ে খুচরা বাজার। এর প্রতিটি স্তরেই দাম বাড়তে থাকে, কিন্তু সবচেয়ে কম দাম পান কৃষক।
বিডি প্রতিদিন/এএম