কুমিল্লা নগরীর ফৌজদারি এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই দেখা মেলে এক ব্যতিক্রমী মানুষের। হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান রেস্টুরেন্ট থেকে রেস্টুরেন্টে। অনেকেই প্রথমে তাকে ভিক্ষুক মনে করেন। কিন্তু না, তিনি ভিক্ষুক নন- তিনি একজন পশুপ্রেমী। বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালের জন্য পরিত্যক্ত খাবার সংগ্রহ করাই তার নিত্যদিনের কাজ।
এই মানুষটির নাম মো. আনোয়ার। স্বল্প আয়ের এই মানুষটি টানা ৩২ বছর ধরে কুকুর-বিড়ালের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। রেস্টুরেন্টের ঝুটা খাবার সংগ্রহ করে তিনি নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বেওয়ারিশ প্রাণিদের খাওয়ান। জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর সামনে, এসপি অফিসের পাশে, ফৌজদারি এলাকা ও মগবাড়ি চৌমুহনীসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত খাবার দেন তিনি।
বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কর্মস্থল পরিবর্তন হয়ে নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় গেলেও কাজের ফাঁকে প্রাণিদের সেবা করতে ভুলেন না। আগের এলাকায় সপ্তাহে অন্তত একদিন আসেন। তাকে দেখলেই কুকুর-বিড়াল ছুটে আসে, ঘিরে ধরে। যেন বহুদিন পর ফিরে পাওয়া কোনো আপনজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীর মগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী আনোয়ার শুধু খাবারই দেন না, অসুস্থ কুকুরের চিকিৎসাও করেন। গোসল করানো, গলায় হাড় বা কাঁটা আটকে গেলে তা খুলে দেওয়া, প্রয়োজন হলে ওষুধ খাওয়ানো- সবই করেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী। ড্রেন বা কালভার্টে কোনো প্রাুণ আটকে গেলে উদ্ধারেও এগিয়ে যান তিনি।
সরেজমিনে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর সামনে গিয়ে দেখা যায়, আনোয়ার পৌঁছাতেই কয়েকটি কুকুর তাকে ঘিরে ধরে। তিনি মাটির পাতিলে খাবার পরিবেশন করলে শান্তভাবে খেতে শুরু করে তারা। কুকুরগুলোর কয়েকটির নামও রেখেছেন তিনি- অভি, কালু, জিমি ও বুলবুলি। নাম ধরে ডাকলেই গা ঘেঁষে এসে দাঁড়ায় তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল ইসলাম, ইকবাল হোসেন খসরু ও মো. সুজন বলেন, সবাইকে দেখলে কুকুর এগিয়ে আসে না। আনোয়ার ভাই ওদের ভালোবাসেন বলেই প্রাণিগুলোও তাকে আপন করে নিয়েছে। নিজের টাকায় ও রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার সংগ্রহ করে দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে যাচ্ছেন।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আবুল বাশার বলেন, তাকে বহুদিন ধরে চিনি। কুকুরদের সন্তানের মতো যত্ন করেন। কেউ হাসাহাসি করলেও আমরা তার কাজকে মহৎ বলেই মনে করি।
পশুপ্রেমী মো. আনোয়ার জানান, ১৯৯৪ সালে মগবাড়ি এলাকায় একটি কুকুর ড্রেন কালভার্টের নিচে আটকা পড়েছিল। তার চিৎকার শুনে মায়া জন্মায়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় কুকুরটিকে উদ্ধার করেন তিনি। এরপর থেকেই প্রাণীদের প্রতি তার ভালোবাসা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে অনেক চলেছি, মানুষ বেইমানি করে। কিন্তু কুকুর-বিড়াল কখনও বেইমানি করে না। প্রাণীর প্রতি দয়া করলে আল্লাহ খুশি হন- এটাই বিশ্বাস করি। কেউ আমাকে পাগল বলে, তবে এসব কথায় আমি গুরুত্ব দিই না।
আনোয়ার আরও বলেন, খাবারের ঝুটা কুড়িয়ে আনি, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করি। পরিচিত অনেকে সহযোগিতা করেন। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে শহরের বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালগুলো আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারবে।
বিডি-প্রতিদিন/টিএ