Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৫৭

অসুস্থদের দেখতে যেতেন নবী (সা.)

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

অসুস্থদের দেখতে যেতেন নবী (সা.)

পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষ কে? যার অনেক টাকা আছে? যার অনেক ক্ষমতা আছে? যার অনেক আওলাদ-পরিজন আছে সে? না, এর একটিও সুখী থাকার জন্য আবশ্যক নয়। সেই মানুষই প্রকৃত সুখী, আল্লাহ যাকে সুস্থতার নিয়ামত দিয়েছেন। যার কিছু নেই, শুধু সুস্থতা আছে সে ওইসব মানুষের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সুখী, যাদের সুরম্য প্রাসাদ ও বিলাসিতার সব উপকরণ আছে কিন্তু সুস্থতা নেই। বিচিত্র এ পৃথিবীর শত বৈচিত্র্যের মধ্যে একটি সুস্থতা-অসুস্থতা। দেখুন অসুস্থতারও আবার কত রং! একেকজন একেক রকম রোগে আক্রান্ত। কারও হাতে, কারও পায়ে, কারও মাথায়, কারও বা হার্টে, কারও আবার পাকস্থলীতে, কারও অন্য কোথাও ছড়িয়ে আছে অসুস্থতা। কারও বেশি, কারও কম। এভাবেই চলছে মানুষের জীবন। সমাজবদ্ধ মানুষের এই জীবনে একের কাছে অন্যের একটি নৈতিক দাবি যখন কেউ কোনো অসুস্থতায় আক্রান্ত হয় তখন অন্যরা তার খোঁজখবর নেবে, তার পাশে দাঁড়াবে, তাকে সান্ত্বনার বাণী শোনাবে, তার সেবায় এগিয়ে যাবে।

সাহাবিরা যখন কেউ অসুস্থ হতেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তাকে দেখতে যেতেন। রোগীর সেবা করতেন। এমনকি মুনাফিক, কাফেরদেরও তিনি দেখতে গিয়েছেন। সেবা করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সাবেত (রা.) একেবারে মুমূর্ষু অবস্থায়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। তিনি ডাক দিলেন, প্রিয় আবদুল্লাহ আমার! তুমি এখন কেমন আছো? রোগীর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। তিনি আবার ডাক দিলেন। এবারও কোনো সাড়া নেই। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন আবদুল্লাহর মৃত্যু আসন্ন। দুই চোখ তার অশ্রুতে ভরে গেল। আবদুল্লাহর দিকে তাকিয়ে বললেন, হায় আবদুল্লাহ! আমরা তো তোমাকে হারিয়েই ফেললাম। আবদুল্লাহর মেয়ে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমার বাবার অনেক সাধ ছিল তিনি যেন শহীদ হবেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাকে শহীদ হিসেবেই কবুল করবেন।’ সুনানে নাসায়ি।

হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন, ‘আমার চোখে সমস্যা দেখা দেয়। খুব গুরুতর কিছু নয়। তবু রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এলেন। তাঁকে দেখে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি।’ সুনানে আবু দাউদ। এক ইহুদি কিশোরকে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে গেলেন। ছেলেটি মৃত্যুশয্যায় ছিল। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেটির মাথার কাছে বসলেন। কপালে হাত রাখলেন। অবস্থা পর্যবেক্ষণের পর বললেন, হে বালক! তুমি ইসলামকে মেনে নাও। ছেলেটি তার বাবার দিকে তাকাল। তার বাবা বললেন, পুত্র আমার! তুমি মুহাম্মদের দীন গ্রহণ কর। এরপর সে ইসলাম কবুল করল। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছেলেটির কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন তখন বলছিলেন, সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমার অসিলায় ওকে দোজখ থেকে রক্ষা করলেন। সুনানে আবু দাউদ।

মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করে জগতের পরিচালনার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী রব্বুল আলামিন। যে কোনো বিপদে তাই সে শরণাপন্ন হয় প্রভুর। নিজে যেমন তাঁর কাছে দয়া চায়, তেমনি অন্যদেরও অনুরোধ করে তারাও যেন দয়াময় আল্লাহর দরবারে তার সুস্থতার জন্য দোয়া করে। এভাবে দোয়া করে ও দয়া চেয়ে মানুষ আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর কোনো অসুস্থ সাহাবিকে দেখতে যেতেন তখন তাঁর জন্য দোয়া করতেন। দোয়ার পাশাপাশি তিনি অসুস্থ-অসহায়দের সান্ত্বনাও দিতেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে, অসুস্থ-বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষকে সান্ত্বনা দিলে তাদের মানসিক শক্তি বেড়ে যায়। আর মানসিক শক্তি-সুস্থতা বেড়ে গেলে দেহের সুস্থতা খুব দ্রুত ফিরে আসে।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন ছিলেন একজন নবী, আবার রাষ্ট্রপ্রধানও। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো কখনো অজপাড়াগাঁয়ে গিয়ে রোগীদের খোঁজখবর নিয়েছেন। সমাজের চোখে কে উঁচু আর কে নীচু এ ফারাক তাঁর কাছে ছিল না। কোরাইশের নেতা তাঁর দুঃসময়ের আশ্রয় চাচা আবু তালিব যখন মৃত্যুশয্যায়, তখনো যেমন তিনি তার পাশে, আবার রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে এক অমুসলিম ইহুদি কিশোরের মৃত্যুশয্যায়ও তার মাথার কাছে বসেছেন তিনি। একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক দাবিটি যদি আমরা পূরণ করতে চাই, তাহলে এ ফারাক না রাখার শিক্ষাটি আমাদের গ্রহণ করতেই হবে। তাই আমরা যখনই শুনব আমাদের পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, চেনাজানা কেউ অসুস্থ হয়েছে, আমরা অবশ্যই সময় করে তাদের খোঁজখরব নেব। অন্তত টেলিফোন করে হলেও অসুস্থদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করব। তাদের সান্ত্বনা দেব। বলব, আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে দেবেন। ধৈর্য ধরুন। আপনার মতো অনেক রোগীকেই আল্লাহ সুস্থতা দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন। রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাস্সিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাস্সির সোসাইটি

www.selimazadi.com


আপনার মন্তব্য