Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৩৬

ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করা না হলে শেষমেশ যা ঘটে

তপন কুমার ঘোষ

ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করা না হলে শেষমেশ যা ঘটে

কোনো গ্রাহক তার ব্যাংক হিসাবে টানা ১০ বছর কোনো লেনদেন বা যোগাযোগ না করলে তা অদাবিকৃত (দাবিদারবিহীন) আমানত হিসেবে গণ্য হবে। ফি-বছর অদাবিকৃত আমানত সুদসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এটা আইনের বিধান। ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৩৫ নম্বর ধারায় অদাবিকৃত আমানত এবং মূল্যবান সামগ্রী সম্পর্কিত বিধান জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে দাবিদারবিহীন আমানত জমা হওয়ার পরও দাবি করার সুযোগ থাকবে। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে কেউ দাবি না করলে বা কোনো পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত না করলে তা সরকারের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং সরকারের কাছে তা ন্যস্ত হবে। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইনের এই ধারা সরকার, অপ্রাপ্তবয়স্ক বা আদালতের অর্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ব্যাংকের নিরাপদ জিম্মায় রক্ষিত কোনো মূল্যবান সামগ্রীর ক্ষেত্রেও ব্যাংক কোম্পানি আইনের এই বিধান প্রযোজ্য হবে।

অদাবিকৃত আমানত : এ সম্পর্কে ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা হয়েছে যে, মেয়াদি আমানতের (স্থায়ী আমানত) ক্ষেত্রে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করা না হলে তা অদাবিকৃত আমানত হিসেবে গণ্য হবে। অন্য কোনো আমানত যেমন, চলতি, সঞ্চয়ী, স্বল্পমেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে সর্বশেষ লেনদেন বা হিসাব বিবরণীর সর্বশেষ প্রাপ্তিস্বীকারের তারিখ থেকে এই ১০ বছর সময় গণনা শুরু হবে।

অদাবিকৃত মূল্যবান সামগ্রী : ব্যাংকের নিরাপদ জিম্মায় রক্ষিত মূল্যবান সামগ্রী আমানতকারী যদি ১০ বছর ধরে পরিদর্শন না করেন তবে তা অদাবিকৃত সামগ্রী হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট দলিল বা ব্যবস্থার শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

লেনদেন না হওয়ার কারণ : গ্রাহক মৃত্যুবরণ করলে ব্যাংক হিসাবে লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে গ্রাহকের উত্তরাধিকারীরা ব্যাংকে যোগাযোগ না করলে হিসাবটি এক পর্যায়ে দাবিদারবিহীন আমানত হিসেবে চিহ্নিত হয়। আবার কোনো গ্রাহক দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করায় বা অন্য কোনো কারণে ব্যাংক হিসাবে দীর্ঘ ১০ বছর লেনদেন না করায় তা অদাবিকৃত আমানত হিসাবের তালিকায় স্থান পায়। হিসাবে কম টাকা আছে এই বিবেচনায় অনেক গ্রাহক ব্যাংকে যোগাযোগ করেন না।

নোটিস প্রদান : গ্রাহকের অজান্তে নয়, গ্রাহককে জানিয়েই অদাবিকৃত আমানত বা অদাবিকৃত মূল্যবান সামগ্রী বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানোর আগে আমানতকারীর কাছে তিন মাসের লিখিত নোটিস দিতে হবে। আমানতকারীর দেওয়া সর্বশেষ ঠিকানায় প্রাপ্তিস্বীকার রসিদসহ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে এই নোটিস পাঠাতে হবে। নোটিস প্রেরণের তিন মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বা কোনো উত্তর না আসে তখনই কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

নমিনি : ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১০৩ নম্বর ধারা মোতাবেক আমানতকারী এমন একজন ব্যক্তিকে মনোনীত করতে পারেন যাকে গ্রাহকের মৃত্যুর পর আমানতের টাকা প্রদান করা যেতে পারে। ওই ব্যক্তি ‘নমিনি’ হিসেবে বেশি পরিচিত। অপ্রাপ্তবয়স্ককেও নমিনি করা যায়। নমিনি নাবালক থাকা অবস্থায় আমানতকারী মৃত্যুবরণ করলে সেক্ষেত্রে আমানতের টাকা কে গ্রহণ করবেন সে ব্যাপারে আমানতকারী আগেই নির্দিষ্ট করে দিতে পারেন। আমানতকারী যে কোনো সময় নমিনি পরিবর্তন করতে পারেন। কাউকে নমিনি করা না হলে উত্তরাধিকার সনদ অনুযায়ী আইনত উত্তরাধিকারীরা আমানতের টাকা প্রাপ্য হন। প্রসঙ্গত, আমানত হিসাবের ন্যায় আমানতকারীর মৃত্যুর পর ব্যাংকের নিরাপদ জিম্মায় রক্ষিত কোনো মূল্যবান সামগ্রী আমানতকারী কর্তৃক পূর্ব-মনোনীত কোনো ব্যক্তিকে প্রদান করার বিধান ব্যাংক কোম্পানি আইনে আছে।

সুপ্ত ও নিষ্ক্রিয় হিসাব : একটানা ছয় মাস আমানত হিসাবে কোনো লেনদেন (জমা বা উত্তোলন) করা না হলে হিসাবটি ডরম্যান্ট বা ‘সুপ্ত’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। সুপ্ত হিসাব থেকে চেকের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের প্রাক্কালে ব্যাংক সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। গ্রাহকের স্বার্থেই এটা করা হয়। উদ্দেশ্য, জাল-জালিয়াতি প্রতিরোধ। আবার টানা এক বছর কোনো আমানত হিসাবে গ্রাহক কর্তৃক কোনো লেনদেন করা না হলে হিসাবটি ইনঅপারেটিভ বা ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে যায়। ব্যাংকভেদে এই সময়সীমার তারতম্য হতে পারে। নিষ্ক্রিয় হিসাবটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অপারেটিভ বা ‘সক্রিয়’ করা না হলে গ্রাহক হিসাবটিতে কোনো প্রকার লেনদেন করতে পারেন না। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন লেনদেন না করার যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে হিসাবটি সক্রিয় করার জন্য ব্যাংকে চিঠি দিতে হবে। ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে হিসাবটিতে নগদ অর্থ জমা দেওয়ার পর এটি সক্রিয় হবে। উদ্দেশ্য, গ্রাহকের আমানতের সুরক্ষা।

নীতিমালা : ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৩৫ ধারার আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর অদাবিকৃত আমানত ও মূল্যবান সামগ্রী সম্পর্কিত একটি নীতিমালা জারি করেছে। নীতিমালা অনুসারে দাবিহীন আমানত ও মূল্যবান সামগ্রীর বিবরণী ব্যাংক কর্তৃক প্রত্যেক পঞ্জিকা বর্ষ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করতে হবে। এ ছাড়া প্রতি পঞ্জিকা বছরের এপ্রিল মাসে দাবিহীন আমানত ও মূল্যবান সামগ্রী বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর এ সংক্রান্ত তালিকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হবে। এ ছাড়া কমপক্ষে দুটি পত্রিকায় প্রতি তিন মাসে একবার করে এক বছর ধরে এই তালিকা প্রকাশ করার জন্য নীতিমালায় বলা হয়েছে। এই তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও এক বছর ধরে দেখা যাবে।

লেখক : সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক লিমিটেড।


আপনার মন্তব্য