শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:০৮

বুদ্ধিজীবী হারিয়ে ধর্মজীবী পেয়েছি

তসলিমা নাসরিন

বুদ্ধিজীবী হারিয়ে ধর্মজীবী পেয়েছি

বিজয় দিবস নিয়ে আমার বিভিন্ন সময়ের ভাবনাগুলো স্মরণ করছি।

২০১২ সালে লিখেছিলাম :

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ন’মাস যুদ্ধ করে জিতেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ভারত সাহায্য করেছিল যুদ্ধে জিততে। ওই সাহায্যটা না করলে বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব হতো বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশের জন্ম আমাদের বুঝিয়েছিল, ভারত ভাগ যাঁরা করেছিলেন, দূরদৃষ্টির তাঁদের খুব অভাব ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন ‘মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই, হোক না তারা বাস করছে হাজার মাইল দূরে, হোক না তাদের ভাষা আর সংস্কৃতি আলাদা, যেহেতু ধর্মটা এক, বিরোধটা হবে না।’ ভুল ভাবনা। ভারত ভাগ হওয়ার পর পরই বিরোধ শুরু হয়ে গেল। পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলমান শাসকগোষ্ঠী শোষণ করতে শুরু করলো পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে, যেখানে মুসলমানই সংখ্যাগরিষ্ঠ। নিজেদের ভাষাও চাপিয়ে দিতে চাইলো। আরবের ধনী মুসলমানরা যেমন এশিয়া বা আফ্রিকার গরিব মুসলমানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা ঠিক তেমন করতো, বাঙালিদের মানুষ বলে মনে করতো না। পূর্ব পাকিস্তান ফসল ফলাতো, খেতো পশ্চিম পাকিস্তান। পুবের ব্যবসাটা বাণিজ্যটা ফলটা সুফলটা পশ্চিমের পেটে। এ ক’দিন আর সয়! শোষক আর শোষিতের মধ্যে যুদ্ধ হলো। শেষে, শোষিত জিতলো, শোষিত বাঙালি একটা দেশ পেলো। ভীষণ আবেগে দেশটাকে একেবারে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ইত্যাদি চমৎকার শব্দে ভূষিত করলো। ক’জন মানুষ ওই শব্দগুলোর মানে বুঝতো তখন? এখনই বা কতজন বোঝে? সমান তালে মৌলবাদের চাষ হচ্ছে দু’দেশের মাটিতে। মনে হচ্ছে বাংলাদেশ মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রমাণ করতে যে, ‘মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যাপারটা ভুল ছিল না, ঠিকই ছিল।’

দেশের সংবিধান বদলে গেছে। পাকিস্তানি সেনাদের আদেশে উপদেশে যে বাঙালিরা বাঙালিকে হত্যা করতো একাত্তরে, পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চায়নি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুব বেশি বছর যায়নি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে তারা অধিষ্ঠিত, তারা মন্ত্রী হয়েছে, দেশ চালিয়েছে।

বিজয় উৎসব করার বাংলাদেশের কোনও প্রয়োজন আছে কি? আমার কিন্তু মনে হয় না। আসলে ঠিক কার বিরুদ্ধে বিজয়? পাকিস্তান আর বাংলাদেশের নীতি আর আদর্শ তো এক! সত্যিকার বিরোধ বলে কি কিছু আছে আর?

২০১৪ সালে লিখেছিলাম :

পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে ঢুকেছিল একাত্তরের এক মধ্যরাতে। বাবাকে বেঁধেছিল নারকেল গাছের সঙ্গে, আধমরা করেছিল মেরে। লুট করেছিল আমাদের বাড়িঘর, টাকা পয়সা সোনা রুপো যা ছিল নিয়ে গিয়েছিল। আমরা শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। দীর্ঘ ন’মাস ছিলাম গৃহহীন। গ্রামগঞ্জে অচেনা মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। গরুর গাড়িতে চড়ে রাতের অন্ধকারে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়েছি। কত কত দিন খেতে পাইনি, ঘুমোবার জন্য বিছানা পাইনি। অপেক্ষা করতাম কবে যুদ্ধ শেষ হবে।

যুদ্ধ শেষ হয়েছিল একদিন। আমরা ফিরেছিলাম আমাদের বাড়িতে, আমাদের শহরে, একটি নতুন দেশে। সে কী উত্তেজনা আমাদের তখন! সেই দেশটি কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের দোসর দ্বারা নষ্ট হতে খুব বেশিদিন সময় নেয়নি। ওরাই তো মিলেমিশে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল আর দুই লাখ মেয়েকে ধর্ষণ করেছিল।

দেশটি এমনই নষ্ট হয়েছে যে, পাকিস্তানপন্থিরাই এখন ছড়ি ঘোরাচ্ছে। তাবড় তাবড় সরকারও ওদের খুশি করে চলে। দেশটিকে এমনই নষ্ট করেছে পাকিস্তানপন্থিরা যে পাকিস্তানের বর্বর সেনারাও আজ চমকে উঠবে দেশটিকে দেখে। তারাও বোধহয় এই দেশটিকে এতটা নষ্ট করার দুঃস্বপ্ন দেখেনি।

২০১৫ সালে লিখেছিলাম :

দেশটা এখন আক্ষরিক অর্থে ভাগ না হলেও আদর্শের কারণে ভাগ হয়ে গেছে, একদিকে আছে মৌলবাদী-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, আরেকদিকে আছে ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থি মানুষ। দুই দলে লড়াই হচ্ছে। একে বাংলাদেশ আর বাংলাস্তানের লড়াই-ও বলা চলে। বাংলাস্তানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র। তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো অস্ত্র হাতে ঘন ঘন ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর, তাদের নির্বিচারে হত্যা করে, যে হত্যার কোনও বিচার হয় না।

একাত্তরে সাততাড়াতাড়ি বাংলাদেশ নামের একটি দেশ জন্ম নিয়েছে বটে, জন্ম নিয়েই স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করতে শিখেছে বটে, তবে এগুলোর অর্থ এখনও মানুষ জানে না। যেদিন জানবে, যেদিন বিশ্বাস করবে, চর্চা করবে এগুলোর, সেদিন স্মৃতিসৌধে পতাকা ওড়ালে সার্থক হবে। পাকিস্তান আর বাংলাদেশের মধ্যে আমি কোনও পার্থক্য দেখতে পাই না। পাকিস্তানেও মুক্তচিন্তকদের ওপর নির্যাতন চলে, বাংলাদেশেও তাই। কেউ মানুক আর না মানুক, আমি মনে করি, বিজয় দিবস পালন করার যোগ্যতা বাংলাদেশ সেদিনই সত্যিকার অর্জন করবে যেদিন মুক্তচিন্তকদের খুনের বিচার করবে, যেদিন আর কোনও মুক্তচিন্তককে খুন হতে দেবে না, এবং নির্বাসিত সব মুক্তচিন্তককে দেশে ফিরিয়ে নিতে পারবে।

এখনও দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের এক এক করে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। দেশ মানে আমি নিরাপত্তা বুঝি। যে মাটিতে মানুষের নিরাপত্তা নেই, যে মাটিতে লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের কথা বলার স্বাধীনতা নেই, সেই মাটিকে আমি আমার দেশ বলতে চাই না। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়া সহজ, দেশ হওয়া সহজ নয়। ঠিক যেমন ‘মানুষের মতো’ দেখতে হওয়া সহজ, মানুষ হওয়া সহজ নয়।

২০১৮ সালে লিখেছিলাম :

বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষকে আগে শোষণ করত পাকিস্তানি ধনীরা, এখন শোষণ করে বাংলাদেশি ধনীরা। আগে মানুষের মানবাধিকার এবং বাক স্বাধীনতা লঙ্ঘন করত পাকিস্তানি শাসক, এখন করে বাংলাদেশি শাসক। পাকিস্তান আর বাংলাদেশের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই! দু’দেশেরই বিশ্বাস ইসলাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং সে কারণেই দু’দেশই লাখ লাখ ইসলামী মৌলবাদী গড়ে তুলতে যা করতে হয়, তা নিরলসভাবেই করছে।

২০১৯ সালে লিখেছিলাম :

বিজয় দিবস নিয়ে প্রতিবছরের মতো আদিখ্যেতা শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশে। ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ তারা পেয়েছে। মরি মরি! যে দেশে মেয়েদের সমানাধিকার পাওয়ার স্বাধীনতা নেই, যে দেশে দরিদ্রের দারিদ্র্য মোচনের স্বাধীনতা নেই, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা পাওয়ার স্বাধীনতা নেই, যে দেশে বাক স্বাধীনতা নেই, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, ধর্মের সমালোচনা করার স্বাধীনতা নেই, সরকারের ভুলকে ভুল বলার স্বাধীনতা নেই, সে দেশ আবার কেমন স্বাধীন?

পতাকা উড়িয়ে আর বাঁধা কিছু বুলি কপচিয়ে ব্যর্থতাগুলো ঢেকে রাখা হচ্ছে বছরের পর বছর। পাকিস্তান আর বাংলাদেশে সত্যিই কি কোনও পার্থক্য আছে? ও দেশের মুক্তচিন্তকরা নির্বাসনে, এ দেশেরও। ওদেশে ইসলামতন্ত্র গণতন্ত্রের চেয়েও জনপ্রিয়। এ দেশেও। অজ্ঞতায়, অন্ধতায় ছেয়ে গেছে দেশ। পাকিস্তানের সংগে হয়তো এইটুকুই পার্থক্য, ওখানকার লোকগুলো লম্বা লম্বা আর ফর্সা ফর্সা। এখানকারগুলো কালো আর বেঁটে।

আজও দেশটিতে কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল, কে বিপক্ষে ছিল তা হিসাব করা হয়। ৪৮ বছর ধরে তাই হচ্ছে। কারও কারও মতে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো, সুতরাং সব ভালো। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো বলে কি দরিদ্রের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো? পাটকল শ্রমিকেরা তো মরছে।

একশ্রেণির হাতে চিরকালই টাকা, একশ্রেণি চিরকালই আনন্দে আহ্লাদে জীবনযাপন করে, একশ্রেণি যে সরকারই আসুক, সে সরকারেরই ঘরের লোক বনে যায়। স্বাধীনতা শব্দটির অর্থ অনেক বড়। অর্থ না বুঝে শুধু স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে চেঁচালেই মানুষ স্বাধীন হয় না। দেশ ভর্তি ধর্মের, বৈষম্যের, পুঁজিবাদের, স্বৈরতন্ত্রের শেকলে বন্দী পরাধীন মানুষ আজ সারা দিন স্বাধীনতার গান গাইছে। গানগুলো বড় বেসুরো।

২০২০ সালে লিখেছি :

৪৯ বছর আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিতেছিল ভারতের সেনাবাহিনী এবং বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাগণ। এই বিজয় নিয়ে এখন আর উচ্ছ্বাস প্রকাশের আমি কোনও সঙ্গত কারণ দেখি না। পশ্চিম পাকিস্তানের কবল থেকে যে আদর্শের কারণে পূর্ব পাকিস্তান নামের অঞ্চলটি বাংলাদেশ নাম নিয়ে পৃথক হয়েছিল বা স্বাধীন হয়েছিল, সেই আদর্শের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সংবিধানেও ধর্মনিরপেক্ষতা নেই, সমাজেও নেই।

একাত্তরের জিহাদিরা ইসলামী প্রজাতন্ত্র চেয়েছিল, স্বাধীনতা চায়নি। একালের জিহাদিরা বাংলাদেশকে জিহাদি রাষ্ট্র বানানোর জন্য বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ বিজয় দিবসের উৎসব করছে করুক, তবে সবচেয়ে জরুরি কাজ জিহাদিদের বিরুদ্ধে আরও একটি মুক্তিযুদ্ধ করা।    

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।


আপনার মন্তব্য