শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৫ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ মে, ২০২১ ২৩:১৩

করোনা সেকেন্ড ওয়েভে মানুষ দিশাহারা

খায়রুল কবীর খোকন

করোনা সেকেন্ড ওয়েভে মানুষ দিশাহারা

গণতন্ত্রহীন সমাজের কর্তৃত্ববাদী শাসনের হাজার একটা ফ্যাসাদ। এ ফ্যাসাদ জনমানুষের জন্য, শাসকগোষ্ঠীর জন্য নয়; তারা বিপুল পরিমাণ টাকার জোরে, রাষ্ট্রক্ষমতার শক্তিতে নিজেদের সর্বোচ্চ নিরাপদ রাখার সুযোগটা ভালোমতোই পেয়ে থাকে। কিন্তু সেই কর্তৃত্ববাদী শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নে গণমানুষ যে অপরিসীম অনাচার-অবিচারের, শোষণের-নির্মমতার শিকার হয় এবং তা থেকে তাদের মনে যে নেতিবাচক ভাবের সৃষ্টি হয় তার মূল উদ্গাতা শাসক বুঝতেই চান না। বিশ্ব মিডিয়ার কল্যাণে তাকে যতই চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখানো হোক না কেন।

একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অপরিসীম উন্নত কিন্তু বাণিজ্যিক স্বার্থে ‘অন্ধ-বধির’ এ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যদিও পুরো কর্তৃত্ববাদ কায়েম না থাকলেও ‘গণতন্ত্রের নামে’ ছদ্ম-কর্তৃত্ববাদে অনেক রাষ্ট্রের ক্ষমতাধররাই এখনো তাদের পুরো সমাজকে গ্রাস করে রেখেছেন, রাষ্ট্রের গণমানুষকে ‘দাস’ বানিয়ে ফেলেছেন।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ওইসব কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের নাগরিকদের দশা খুবই খারাপ। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল, ফলে সংক্রমণ বাড়ছে ব্যাপক হারে, আর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ওইসব দেশে আরও খারাপ, টিকা তো তাদের নাগালের বাইরেই রয়ে গেল। যা-ও বা মিলেছে তা-ও তো নিতান্তই অপর্যাপ্ত। (হয়তো সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র ভিয়েতনাম এক অর্থে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র, তবে তার সে পরিস্থিতি ১০ কোটি নাগরিকের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ব্যাপারে উদাসীন নয়, বরং বলা চলে বিশ্বে সম্ভবত করোনা মোকাবিলায় সবচেয়ে সফল- জনসংখ্যার আধিক্য ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়। সেটা আরেক ব্যাপার)। সাধারণভাবে ভোট ডাকাতি করার মাধ্যমে ‘গায়ের জোরে ক্ষমতা দখলকারী’ কর্তৃত্ববাদী সরকারই হচ্ছে ‘জনপ্রতিনিধিত্বহীন’ ক্ষমতাধর সরকার-পরিচালক যাদের কোনো প্রকৃত বৈধতা নেই।

বাংলাদেশে করোনা সেকেন্ড ওয়েভে এ সংক্রমণ পরিস্থিতির নিদারুণ অবনতির জন্য দায়ী সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সামগ্রিক করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের চরম অব্যবস্থাপনা। গত চার-পাঁচ মাস ধরে দেশের সব বিনোদন কেন্দ্র, কক্সবাজার ও কুয়াকাটা এবং পতেঙ্গা সি-বিচ, সব শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা, সাফারি পার্ক, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি খুলে দেওয়া এবং পর্যটক ও অতিথিদের অফুরান ভিড়; তার ওপর জনপ্রিয় ব্যক্তিদের জানাজার নামে বিশাল বিশাল সমাবেশ, বিয়ের অনুষ্ঠানে ফ্রিস্টাইল জনসমাবেশ ও আড্ডাবাজি, মার্কেটগুলোয় স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলা, পাবলিক পরিবহনগুলো যেমন মোটর-লঞ্চ ও নৌ-জাহাজ, বাস ও ট্রেনে গাদাগাদি যাত্রী বহন এসবই সংক্রমণ বৃদ্ধির উপযুক্ত রসদ হয়েছে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির বাড়াবাড়ি; এসব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আরেক বছর পিছিয়ে দিলে এমন কোনো ক্ষতি হতো না। রাষ্ট্রীয় এসব উৎসব অনুষ্ঠান দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়ে- বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শেষ। সাধারণ মানুষ ফ্রিস্টাইল চলাফেরা, আড্ডাবাজি, উৎসব-আয়োজন চালাতে থাকে অবিরাম। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি বেমালুম ভুলে যেতে থাকে।

পরিণাম যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। করোনা সংক্রমণের প্রথম ধাক্কার চেয়ে অনেক বেশি তান্ডব শুরু করে সেকেন্ড ওয়েভে। এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের বরাদ্দকৃত অর্থের ৭০-৭৫ শতাংশই অব্যবহৃত থেকে গেছে। এ খাতে ১ হাজার কোটি টাকার গবেষণা কার্যক্রম বাজেটের ১০ কোটি টাকাও ব্যয় করার মতো প্রকল্প পাওয়া যায়নি। অথচ করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি ও টিকা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিয়েই বিশালকায় গবেষণা কাজ চালানো উচিত ছিল এ সময়টাতে যা অতীব জরুরি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও তার অধীন পরিদফতরগুলোর কর্মকান্ডে সীমাহীন গাফিলতি প্রকাশ হয়ে পড়ে আবার। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও তা স্বীকার করেন। কিন্তু তৎক্ষণাৎ অ্যাকশন নিয়ে ১০-২০ জন দায়ী কর্মকর্তাকেও শাস্তি দেওয়ার মতো সাহস ও যোগ্যতা প্রদর্শন করতে পারলেন না। সেটা ছিল খুব জরুরি।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশ্বে সম্ভবত ১০ কোটি জনসংখ্যার একটা দেশ ভিয়েতনাম সবচেয়ে সফল। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কিউবা, লাওস, নেপাল, ভুটান এসব দেশও অনেকখানি সাফল্য অর্জন করে দেখিয়েছে। তাদের জনসংখ্যার মধ্যে করোনা সংক্রমণ ও প্রাণহানি বেশ নিয়ন্ত্রিত। আমাদের বাংলাদেশের উচিত ছিল এ রাষ্ট্রগুলোর করোনা সংক্রমণ মোকাবিলার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা, ওদের মতো কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, দেশের ভিতরে মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বিদেশ থেকে আসা লোকজনকে কঠোরভাবে কমপক্ষে ২৮ দিন (১৪ দিন প্লাস ১৪ দিন) প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা। এমনকি সবচেয়ে সংক্রমিত দেশগুলো থেকে লোকজন কমপক্ষে ছয়-সাত মাস আনা-নেওয়া বন্ধ রাখা। বাংলাদেশ সেসবের ধারেকাছেও ছিল না।

গত বছর মার্চ থেকে অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন ভিয়েতনাম, হংকং, জার্মানি, কিউবা, কানাডা, থাইল্যান্ড এসব দেশ থেকে মোটা অঙ্কের বেতন-ভাতা দিয়ে ৫০০ ডাক্তার ও ২ হাজার নার্স, টেস্টিং ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি আনার জন্য। প্রচুর আধুনিক টেস্টিং কিটস ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য। কিন্তু ‘অ্যালুমিনিয়াম-ব্যবসায়ী’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মাথায় এসব বুদ্ধি ঢোকেনি। তিনি তার রুটিনকাজ চালিয়ে গেছেন আমলাদের ওপর নির্ভর করে, ‘গোলে হরিবোল মার্কা’ স্টাইলে। আর স্বাস্থ্য বিভাগের আমলারা (দু-চার জন ব্যতিক্রম) সমানে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছেন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়। মিডিয়া চিৎকার-চেঁচামেচি করেছে একটানা, তার ফলে কিছু বাইরের দুষ্কৃতকারী আটক হয়েছে, কিন্তু আমলাদের একজনও শাস্তি পাননি, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। 

গত বছর এপ্রিল থেকেই করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকলে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকান্ডের দশা নিদারুণ ‘লেজে-গোবরে’ হয়ে যায়। দেশজুড়ে সংক্রমিত মানুষের আহাজারি আর আর্তচিৎকারে তাদের স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে পড়ে। কিন্তু সরকারের ভিতরে তাতে ভালো একটা ‘ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া’ লক্ষ্য করা যায়নি। তারা ধরে নিয়েছে দেশের মানুষ তো নানা রোগে, সড়ক দুর্ঘটনায় এমনকি আত্মহত্যায় প্রতি বছর মারা যাচ্ছে হাজার হাজার, তাহলে করোনায় না হয় প্রাণহানি ঘটল কিছু। সব দেশেই তো করোনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এসব কথা ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে নানাভাবে বলাও হচ্ছে। ‘অক্ষমের নির্বোধ সান্ত¡না’ লাভের ব্যর্থ চেষ্টা আর কি!

গত বছরের শেষ প্রান্ত অবধি সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলে সরকার আরও ঢিলেঢালা মনোভাবে চলে যায়, সাধারণ মানুষ সুবিধাবাদী, অসচেতন, তারা ‘ফ্রিস্টাইল’ স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে চলাচল, আড্ডাবাজি, সমাবেশে জড়ো হওয়ার কালচারের মধ্যে ডুবে যেতে থাকে। ফলে আবার এইবছরের মার্চে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়ে দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। যদি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোর যথেচ্ছ আয়োজন না হতো, আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সামরিক বাহিনী ও বিজিবিকে মাঠে রেখে কঠোর ব্যবস্থাপনা কায়েম রাখা যেত তাহলে মানুষজনকে নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারত। স্বাস্থ্যবিধি মানুষ মানতে বাধ্য হতো। সংক্রমণ ও প্রাণহানি কমে গিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হতো।

আর টেস্ট নিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয়। টেস্ট করতে হবে প্রতিদিন কমপক্ষে ১ লাখ লোকের নমুনা। আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা টেস্টিং নিয়ে গত বছর শুরু থেকেই ‘লুকোছাপার’ মতো কিছু তৎপরতা চালিয়ে আসছে। এক দিন ২৫ হাজার টেস্টিং তো পরদিন ১৫ হাজার। কেন এটা হলো? টেস্টিং তো প্রতিদিনই বাড়ানোর কথা ছিল। প্রচুর প্রমাণ পাওয়া গেল এখানে করোনা টেস্ট করিয়ে ‘নিগেটিভ’ রিপোর্ট নিয়ে বিমান ভ্রমণ শেষে বিদেশি বিমানবন্দরে নেমেই ধরা পড়ছে ‘রিপোর্ট ভুল’। করোনা টেস্টিং করা দরকার মোবাইল ভ্যান নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে; এবং এমনকি ‘করোনা লক্ষণ নেই’ এমন লোকজনের মধ্যেও টেস্টিং তৎপরতা চালানো দরকার ছিল বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়ায়, পুলিশি ব্যবস্থাপনায়। তাতে বিভিন্ন্ এলাকায় লুকোনো করোনা আক্রান্ত আছে কি না খুঁজে বের করা সম্ভব হতো। করোনাভাইরাস দুনিয়াব্যাপী নানা রূপে ছড়াচ্ছে বলেই সেটা খুব জরুরি কাজ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। এসব লুকিয়ে রেখে সমস্যার সমাধান হবে না। করোনাভাইরাসের নানা বৈচিত্র্যময় রূপ ও চরিত্র রয়েছে যা বিজ্ঞানীরা এখনো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেননি, তবে তারা গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। আমাদের বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ অত্যধিক জনসংখ্যা আক্রান্ত দেশের মানুষের করোনা সংক্রমণ ও প্রাণহানির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সেটা বিশেষভাবে মাথায় রাখতে হবে। আমাদের অবশ্যই ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কিউবা- করোনাযুদ্ধে এসব সফল রাষ্ট্রের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, তাদের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে হবে। এসব দেশ থেকে করোনা-অভিজ্ঞ ডাক্তার ও টেস্টিং বিশেষজ্ঞ এবং নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের এনে বাংলাদেশের ডাক্তার ও অন্যসব স্বাস্থ্যকর্মীকে যথার্থ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং একসঙ্গে রেখে করোনা টেস্টিং, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার পরিবেশ সৃষ্টি করা সবচেয়ে জরুরি। কারণ করোনা সংক্রমণ তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ঢেউও আসতে পারে নিশ্চিতভাবে। আর সবচেয়ে কার্যকর টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও গবেষণা দরকার বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগে।

লেখক : বিএনপির যুগ্মমহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসু সাধারণ সম্পাদক।