শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ জুন, ২০২১ ২২:৫৮

সিনেমা হলের দুর্দশা কাটবে কীভাবে

সিনেমা হলের দুর্দশা কাটবে কীভাবে
Google News

নব্বই দশকের শেষ ভাগ থেকেই মূলত সিনেমা হলবিমুখ হয়ে পড়েছে দর্শক। প্রথমে অশ্লীলতা, নকল আর পাইরেসির দাপটে সিনেমা হল থেকে ছিটকে পড়ে দর্শক। একসময় এসব সমস্যার সমাধান হলেও দর্শক আর সিনেমা হলে ফিরছে না। এ কারণে দেশের প্রায় ১৪০০ সিনেমা হল থেকে এখন এই সংখ্যা ৬০-এর ঘরে এসেছে। এ অবস্থার উত্তরণ কীভাবে সম্ভব?  এ বিষয়ে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মূল্যবান মন্তব্য তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ

 

অনুপম হায়াৎ

অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে

অনুপম হায়াৎ (চলচ্চিত্র গবেষক, সাংবাদিক)

প্রযুক্তিগত, নির্মাণগত, প্রতিভাগত ও ঐক্যের সংকট শিল্পটির অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখন ১০ টাকায় সিডি ডিভিডি কিনে বা স্বল্প খরচে নেটে দেশি-বিদেশি ছবি দেখা যায়। সবার হাতে হাতে রয়েছে মোবাইল। তাই সহজেই সিনেমা দেখার ব্যবস্থা এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এতে প্রকারান্তরে সিনেমা হলে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে। তাছাড়া মানসম্মত ছবি নির্মাণ ও সিনেমা হলের সুন্দর পরিবেশ দুঃখজনক হারে কমেছে। তাতে দর্শক সিনেমা হলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়েছে। চলচ্চিত্র একটি যৌগিক শিল্প। এর পরিবেশও যৌগিক হতে হবে। অব্যবস্থাপনা ও অনৈক্য এই শিল্পের অধঃপতন ডেকে আনছে। চলচ্চিত্রের সব পক্ষ মিলে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

 

জুনায়েদ হালিম

সিনেমা হলের পরিবেশ ফেরাতে হবে

অধ্যাপক জুনায়েদ হালিম (প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)

সিনেমা হলের ব্যবসা এখন অলাভজনক হয়ে পড়েছে। দেখার উপযোগী ছবি তেমন একটা হচ্ছে না। আগে বক্তব্যধর্মী ছবি নির্মাণ হতো। দর্শকদের ওপর সিনেমা হলে না যাওয়ার দায় চাপানো যাবে না। যানজট ঠেলে সময় আর অর্থ নষ্ট করে কেন সিনেমা হলে ছবি দেখতে যাবে। আগে ছবি দেখার জন্য সিনেমা হল ছিল একমাত্র স্থান। এখন মোবাইল ফোন, নেট, স্যাটেলাইট চ্যানেলসহ নানা মাধ্যমে নানা ছবি দেখা যায়। এতে বড় পর্দায় ছবি দেখার মজা না পেলেও মিনি ফরম্যাটে দেখে পরিতৃপ্ত হচ্ছেন। মানে প্রযুক্তিগত কারণে, যন্ত্রপাতি, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ও অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষ এখন এসব মাধ্যমের কারণে একটি ঘোরের মধ্যে আছে। এই ঘোর কাটাতে সিনেমা হলের সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। মাল্টিপ্লেক্সে ৪-৫টি স্ক্রিন থাকছে তাতে ৪-৫টি ভিন্ন মুভি চলছে। এতে দর্শক তার রুচিমতো ছবি বেছে নিতে পারছেন। তাই মাল্টিপ্লেক্স বাড়ানো দরকার। সিনেপ্লেক্স নির্মাণের জন্য সরকার যদি ঋণ দেয় বা প্রাইভেট খাতেও সিনেপ্লেক্স নির্মাণ বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে বিনোদনের জন্য এটি হবে একটি রেভ্যুলেশন।

 

রোবায়েত ফেরদৌস

সিনেমা হলে বিদেশি ছবিও চালাতে হবে

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস (শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

দীর্ঘদিন ধরে সিনেমা হলের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। একই সঙ্গে ভালো ছবি, গল্প আর নির্মাতার অভাব তো রয়েছেই। এখন ছবি দেখার নানা মাধ্যম রয়েছে। তাতে বিশ্বের সব ছবি দেখতে পারছেন মানুষ। অপশন যখন বেশি তখন প্রতিযোগিতা বাড়ানো দরকার। পুরনোদের নিয়ে এখনো আমরা আটকে আছি। নতুনদের স্বাগত জানাতে হবে। চলচ্চিত্র অঙ্গনে দলাদলি, রাজনীতি সৃজনশীল এই শিল্পের ক্ষতি বয়ে আনে। চলচ্চিত্র হচ্ছে একটি টিম ওয়ার্ক। সিনেমা হলে দেশির পাশাপাশি বিদেশি ছবিও চালানো উচিত। উপমহাদেশীয় ছবিকে গত ৫০ বছর ধরে প্রোটেকশন দিয়ে কি আমাদের শিল্পের কোনো উন্নতি হয়েছে? সেন্সর বোর্ডের পরিবর্তে নির্বাচনী বোর্ড গঠন করে দেশ-বিদেশের ছবি বাছাই করে প্রদর্শন করতে হবে। দর্শক ফেরাতে গল্প, চিত্রনাট্য, শিল্পী, নির্মাতা এবং ক্যামেরায় চোখ রাখার অভাব দূর করতে হবে।

 

হাবিবা রহমান

সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে হবে

হাবিবা রহমান (চেয়ারপারসন, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

বেশির ভাগ সিনেমা হলের পরিবেশ দর্শক উপযোগী নয়। দর্শক তাই মোবাইলেই বিশ্বের সব ছবি দেখছেন। দেখার মাধ্যমের পরিবর্তনের কারণে সিনেমা হল দর্শকশূন্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশের অনেক ছবি, গল্প ও নির্মাণ মানসম্মত নয়। নেটে ছবি দেখে বাইরের ছবির সঙ্গে এদেশের ছবির তুলনা করার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শক। তাই তাদের যেমন তেমন নির্মাণ আর গল্পের ছবি দিয়ে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। সিনেমা হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর ও সৃজনশীল মাধ্যম। সিনেমা বড় পর্দায় দেখার বিষয় বলে বড় পর্দায় দেখার সুষ্ঠু অবস্থা ফেরাতে হবে। সিনেমা হল ভেঙে কেন শপিং মল নির্মাণ হবে। সিনেমা হলের পাশাপাশি সিনেপ্লেক্সও বাড়াতে হবে এবং ভালো ছবি নির্মাণ করতে হবে।

 

ইফতেখার নওশাদ

মানসম্মত ও পর্যাপ্ত ছবি চাই

ইফতেখার নওশাদ (কর্ণধার : মধুমিতা সিনেমা হল)

সিনেমা হল টিকিয়ে রাখতে কনটেন্ট দরকার। যা পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। যেসব ছবি নির্মাণ হচ্ছে তাতে মানের অভাব রয়েছে। মাঝে মধ্যে দু-একটি ভালো ছবি দিয়ে সিনেমা হলের সারা বছরের খরচ তুলে আনা অসম্ভব। বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণে কলকাতার বাংলা ছবি এখানে দুই দেশে একসঙ্গে মুক্তি দিতে হবে। এতে সিনেমা হলে দর্শক ফিরবে এবং তাহলেই সিনেমা হলের পরিবেশ ফেরাতে এবং সংস্কারে অর্থ ব্যয়ে সক্ষম হবে সিনেমা হল মালিকরা।

 

খোরশেদ আলম খসরু

ইটিকিটিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে

খোরশেদ আলম খসরু (সাবেক কর্মকর্তা প্রযোজক সমিতি)

আগে সিনেমা হলের পরিবেশ আর আধুনিকায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার অনেক আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। এখন তা যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় ততই এই শিল্পের জন্য মঙ্গল। সিনেমা হলের টিকিট বিক্রিতে ফাঁকি রোধে ইটিকিটিং ব্যবস্থা অবশ্যই চালু করতে হবে। সরকারি প্রজেক্টর স্থাপনও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। চলচ্চিত্র নিয়ে আর কেউ যাতে মনোপুলি ব্যবসা করতে না পারে সে দিকে সবাইকে নজর দিতে হবে। সিনেমা হলের পরিবর্তে সিনেপ্লেক্সের সংখ্যা বাড়াতে হবে।