শিরোনাম
বুধবার, ১৫ মে, ২০২৪ ০০:০০ টা

পুরনো রূপে ঝুঁকিপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ভবন

বেইলি রোডে ভয়াবহ আগুনের পর শুরু হওয়া অভিযান থমকে গেছে - বেশির ভাগেই নেওয়া হয়নি নিরাপত্তাব্যবস্থা

হাসান ইমন

পুরনো রূপে ঝুঁকিপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ভবন

রাজধানীর বেইলি রোডে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকান্ডের পর সাঁড়াশি অভিযানে নামে রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিসসহ কয়েকটি সংস্থা। সে অভিযানে শতাধিক রেস্টুরেন্ট বন্ধ হলেও কিছু দিন পর তা থমকে যায়।  বেইলি রোডের অগ্নিকান্ডের দুই মাস যেতে না যেতেই সেই পুরনো রূপে ফিরেছে ঝুঁকিপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ভবনগুলো। অধিকাংশের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া না হলেও প্রায় প্রতিটি রেস্টুরেন্টে চিরচেনা ভিড় রয়েছে। আলো ঝলমলে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, খিলগাঁও ও বেইলি রোড ফিরেছে সেই চিরচেনা রূপে।

গত ৫ মার্চ রাজধানীর বেইলি রোডে অভিযান চালায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অভিযানে সুলতান ডাইনসহ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট সিলগালা করে রাজউকের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ঠিক দুই মাস যেতেই পুরনো রূপে বেইলি রোডের রেস্টুরেন্টগুলো। আগুন লাগা ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ ভবনের পাশে রয়েছে পিৎজা হাট, থার্টি থ্রি, কেএফসির শো-রুম, ছোট ছোট কয়েকটি রেস্টুরেন্ট এবং একটি বেবিশপ খোলা দেখা গেছে। একই অবস্থায় দেখা গেছে বার্গার এক্সপ্রেসও। গ্রিন কটেজে আগুনের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল খাবারের দোকান সিলক্স। সেটিও খুলেছে। সুলতান ডাইনের নিচতলায় প্যারাডাইস ফ্রুটস জুসবার খুলেছে। এ দোকানটিতে জুসের পাশাপাশি পিঁয়াজু, শিঙাড়া, সমুচাসহ মুখরোচক খাবার তৈরি করে। ব্যবহার করে সিলিন্ডারও। কথা বলতে গেলে কোনো কর্মচারী কথা বলেননি। আবার ফুটপাতের দোকান তুলে দেওয়া হলেও সেগুলো নিয়মিতই বসছে পুলিশের সামনে।

একই দিনে খিলগাঁওয়ে ‘নাইটিঙ্গেল স্কাইভিউ’ নামে বহুতল ভবনে অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ওই ভবনের একটি তলা বাদে সবকটিতে রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছে। এমনকি ভবনের বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা এবং ছাদও বাদ যায়নি। ভবনটিতে কোনো ‘ফায়ার এক্সিট’ না থাকায় কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে না বলেই ভবনটি সিলগালা করে দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ঠিক দুই মাস যেতেই ‘নাইটিঙ্গেল স্কাইভিউ’ ভবনটির সবকটি রেস্টুরেন্ট চলছে রমরমা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভবনটির পার্কিং থেকে শুরু করে রুফটপ পর্যন্ত প্রতিটি তলায় চলছে ভিন্ন নামে রেস্টুরেন্ট। এমনকি নিচ তলায় পার্কিংয়ের জায়গায় শর্মা হাউস নামে একটি রেস্টুরেন্ট নতুন চালু হয়েছে।

একই অবস্থা সূত্রাপুরেও। ২৯ তনুগঞ্জ লেন কাঠেরপুল, সূত্রাপুরে সড়কের পাশে সাত তলা একটি ভবন। ভবনটির চার তলায় রয়েছে কসমোপলিটন ল্যাব স্কুল অ্যান্ড কলেজ। তিন ও দুই তলায় রয়েছে ইউনিক চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টার। আর নিচ তলায় রয়েছে মিষ্টি কোম্পানির শো-রুম। অভিযোগ রয়েছে ভবনটির সিঁড়ি সরু। চার তলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ওঠানামা করতে কষ্ট হয়। প্রায়ই রেস্টুরেন্টের জন্য আনা গ্যাস সিলিন্ডার সিঁড়িতে রাখা হয়। খুব ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা ওঠানামা করে।

ধানমন্ডির ১০/এ ১২ তলা ভবনটির প্রায় সব তলায় রেস্টুরেন্ট রয়েছে। বাদ যায়নি রুফটপও। সেখানে ফরেস্ট লাউঞ্জ বাফেট এক্সপ্রেস চালু রয়েছে। ভবনটিতে রয়েছে ক্যাফে রিও রেস্টুরেন্ট, এম্রসিয়া ইনফিনিটি লাউঞ্জ, গ্রেট কাবাব ফ্যাক্টরি, গার্লিক চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, দ্য বাফেট স্টরিজ, গ্রেন্ড লাউঞ্জ। এসব ভবনে পর্যাপ্ত সিঁড়ি ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে ভোজনবিলাসী নাগরিকরা। এসব চিত্র শুধু ধানমন্ডি, খিলগাঁও, বেইলি রোড, সূত্রাপুরই নয় রাজধানীজুড়ে দেখা যায়।

নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো একটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে নগরসেবা সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসে। সবাই অভিযান পরিচালনা করে। কিছুদিন গ্রেফতার, সিলগালা, ভবন বন্ধসহ মাঠে সোচ্চার থাকে। কিন্তু কিছুদিন পর আবার ব্যবসায়ীদের চাপে চুপচাপ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সংস্থাগুলোর অভিযান। যে কারণে দুর্ঘটনার কিছুদিন পর সেই চিত্র পুরনো রূপে ফিরে আসে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, কোনো অগ্নিকান্ড বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি হয়। কমিটি প্রতিবেদনও দেয়। কিন্তু আশ্চার্যজনক হলো, প্রতিবেদনে নিজ সংস্থাগুলোর কোনো গাফিলতি তারা খুঁজে পায় না। একে অপরের দোষ দেয়। কিন্তু দুর্ঘটনার পেছনের কারণ ও কর্মকর্তা-কর্মচারী গাফিলতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না কর্তৃপক্ষ। যদি সংস্থাগুলোর ভিতর সুশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে খোলস পাল্টানো সম্ভব নয়। কারণ অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে কাজ করান।

এ বিষয়ে রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক-১) মোহাম্মদ সামছুল হক বলেন, অবৈধ রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান আপাতত বন্ধ রয়েছে। কারণ পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে রেস্টুরেন্টের তালিকা করা হচ্ছে। তালিকার কাজ শেষ হলে রাজউককে দেওয়া হবে। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ খবর