শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ মার্চ, ২০২০ ২২:১৪

খুশবন্ত সিংয়ের কাছে জেনারেল টিক্কা খানের স্বীকারোক্তি

আমরা আমাদের ৮ হাজার সৈন্য হারিয়েছি

আমরা আমাদের ৮ হাজার সৈন্য হারিয়েছি

জেনারেল টিক্কা খান আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অধীর ছিলেন না। করাচি পৌঁছেই আমি তার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। বিব্রতকর হাসির সঙ্গে আমার অনুরোধ গ্রহণ করা হয়। ‘আপনার অনুরোধ আমরা সিইনসি’র কাছে পাঠাব,’ ইনফরমেশন সার্ভিসের প্রধান উত্তর দেন। তিনি তাকে অনুরোধ জানিয়ে লিখবেন, ‘কিন্তু মনে হয় তিনি ট্যুরে আছেন।’

ইসলামাবাদে পৌঁছে দ্বিতীয়বার অনুরোধ করার আগে আমি নিশ্চিত হলাম যে, জেনারেল শহরেই আছেন। পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা আর্মি হেড কোয়ার্টার্সের অফিসার ফোন করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু আমার বন্ধু মনজুর কাদির, যিনি এক সময় উভয় ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগের অবস্থানে ছিলেন, তার চাপে অফিসার ফোন করলেন। মনজুর কাদির (আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন) বললেন, ‘তাকে বলুন, আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ ফোনে অফিসারের তোঁতলানোর মতো করে অসংখ্য ‘ইয়েস’ এবং ‘ওহ, আই সি!’ উচ্চারণ থেকে আমি বুঝতে পারি যে, জেনারেল কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান না। কোনো ভারতীয়ের সঙ্গে তো নয়ই। মনজুর কাদিরের নামে কাজ হলো।

দীর্ঘক্ষণ থেমে থাকার পর অফিসার নির্দেশ গ্রহণ করলেন। ‘অ্যাট দ্য আর্মি হেড কোয়ার্টার্স, অ্যাট ফোরটিন থার্টি আওয়ার্স।’ মনজুর কাদির ফোনটি নিলেন, ‘আপনার উচিত তাকে আপনার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো। উনি পাকিস্তানের একজন বন্ধু।’ আমাকে চা পানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। ডেপুটি সেক্রেটারি ব্যাখ্যা করলেন, ‘গত সপ্তাহেই তিনি আল-আহরামের হেইকলকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। কিন্তু হেইকল তাদের কথোপকথনকে যেভাবে প্রকাশ করেছেন তাতে তিনি খুব সন্তুষ্ট হতে পারেননি।’

কী ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি এবং আমাকে তিনি কীভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন, সে সম্পর্কে অনিশ্চিত অবস্থায় আমি জেনারেল টিক্কা খানের বাসভবনে পৌঁছলাম।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিইনসি’র বাসভবন খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়। গেটে ইউনিফরম পরিহিত একজন সেন্ট্রি এবং সাদা পোশাক পরিহিত কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী। তারা হাত তুলে আমাকে বাংলোর দিকে দেখাল। বেসামরিক পোশাক পরা এক তরুণ আমাকে স্বাগত জানিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষে নিয়ে এলো। স্বভাবতই আমি নির্ধারিত সময়ের বেশ আগে এসেছি।

তরুণকে আমি জেনারেলের সেক্রেটারি হিসেবেই ধরে নিয়েছি। আমি জানতে চাইলাম, জেনারেলের বায়োডাটার একটি কপি পেতে পারি কিনা। ‘অমন কোনো কিছু আমাদের নেই,’ তরুণ উত্তর দিল, ‘কিন্তু আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, সম্ভবত আমি আপনার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব।’

আমি তাকে বললাম, জেনারেলের ব্যাপারে আমি আসলে কিছুই জানি না। ‘এমনকি আমি এটুকুও জানি না যে, তিনি কোথায় এবং কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন, তার মা-বাবা কে, তিনি কোথায় শিক্ষাগ্রহণ করেছেন, তার পারিবারিক জীবন, কিছুই জানা নেই আমার।’

‘ওহ, ওই ধরনের বিষয়গুলো!’ তরুণ মন্তব্য করল। এসবের কিছু কিছু আমি আপনাকে বলতে পারি। রাওয়ালপিন্ডি থেকে ২৮ মাইল দূরে কাহুটা তহশিলের জোচা মামদুত গ্রামে তার জন্ম। রাজা ইকবালের তিন পুত্রের মধ্যে তিনি সবার বড়। আমরা জমিদার।’

‘আমরা!’

‘ওহ। জি হ্যাঁ।’ একটু বিব্রত হয়ে তরুণ বলল। ‘আমি জেনারেলের বড় ছেলে। আমার উচিত ছিল আপনার কাছে আমার নিজের পরিচয় দেওয়া। আমি ক্যাপ্টেন খালিদ মাসুদ। আমি আমার বাবার এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।’ দ্বিতীয় বার হাত মেলালাম আমরা।

তাহলে এটি কুখ্যাত টিক্কার ছেলে! তার সন্তানের মধ্যে সামরিক বৈশিষ্ট্যের কিছু নেই। ফ্যাকাসে গাত্রবর্ণের ধীর-মেজাজের ছেলেটির ঠোঁটের ওপর সরু গোঁফ এবং পরনে ঢিলেঢালা পোশাক! ‘পরিবারে আপনারা ক’জন,’ আমি জানতে চাই।

‘পাঁচজন। আমার ছোট ভাইদের একজন সেনাবাহিনীতে এবং আরেকজন কলেজে পড়াশোনা করছে। এ ছাড়া আমার দুই বোন আছে। একজন সেনাবাহিনীতে ডাক্তার এবং অপর জন স্কুলে পড়ছে।’

‘আপনার বাবার জন্ম তারিখ কত?’

একটু দ্বিধায় পড়ল সে। ‘আমার মনে হয় ১৯১৫ সালের ১ জুলাই। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই। আপনি বরং উনার কাছে জেনে নেবেন। আমি জানি ১৯১৫ সাল এবং জুলাই মাসের প্রথম দিকে। সুনির্দিষ্ট বলতে পারছি না যে জুলাই মাসের প্রথম দিন কিনা।’

‘হি ইজ এ ক্যান্সার! (তিনি কর্কট রাশির)।

‘ক্ষমা করবেন, আমি বুঝতে পারিনি।’ ছেলেটির চোখে মুখে সন্দেহের ছায়া পড়েছে।

‘একটি ক্যান্সার, আপনি জানেন! কর্কট রাশিতে তার জন্ম। অতএব তিনি দয়ালু, অনুভূতিপ্রবণ, সহানুভূতিশীল এবং প্রচন্ড কল্পনাশক্তির অধিকারী। তা ছাড়া অতি আবেগ-প্রবণ, স্পর্শকাতর এবং হতাশাগ্রস্ত।’

তরুণ লোকটিকে এবার কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হলো। ঠিক তখনই সাদা ইউনিফরম এবং পালক-শোভিত পাগড়ি পরা পাঠান বেয়ারার জেনারেলকে প্রবেশ করতে দেওয়ার জন্য দরজা খুলে দিল। আমি তার যে ছবিগুলো দেখেছি তা থেকে আমার পক্ষে তাকে চেনা সম্ভব হতো না। ছবিতে তিনি খাকি ইউনিফরম পরিহিত, লাল রেখাযুক্ত কলার, কাঁধের ওপর চকচকে তারকা এবং ছড়ি হাতে সদর্প ভঙ্গি তাকে সামরিক বৈশিষ্ট্যম-িত করেছে। এসব ছাড়া তিনি কুখ্যাত সৈনিকের চেয়ে বরং ধীরস্থির মেজাজের একজন বেসামরিক আমলা বলে মনে হয়। তার উচ্চতা বড়জোর ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং সাধারণ গড়নের। চার্লি চ্যাপলিন ধাঁচের গোঁফ রেখেছেন এবং পুরু লেন্সের চশমা পরেছেন, যা লোকজন চোখে পরে তাদের ছানি অপারেশনের পর। তার পরনে ধূসর রঙের স্যুট, অবশ্যই রাওয়ালপিন্ডি বাজারের কোনো দর্জির তৈরি করা। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আমি তার আস্থা অর্জনের চেষ্টা করলাম।

‘ওয়ালাইকুম আসসালাম, বরং সত শ্রী আকাল বলতে পারি। দীর্ঘদিন আমি এটি বলিনি,’ বলে তিনি আমার সঙ্গে হাত মেলালেন। ‘বসুন, বেয়ারা, চা নিয়ে এসো।’

আমি তার পাশে বসলাম। তিনি স্বচ্ছন্দ হতে পারছিলেন না। এক হাতে সারাক্ষণ সোফার হাতল ঘষছেন; আরেক হাত কখনো তার হাঁটু, কখনো আমার হাঁটুতে রাখছেন।

আমার অনুরোধ রক্ষা করায় আমি তাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানালাম এবং আশ্বস্ত করলাম যে, তার ইন্টারভিউ যতটা বস্তুনিষ্ঠ ও সততার সঙ্গে সম্ভব আমি প্রকাশ করব। আমার হাঁটু চাপড়ে তিনি ইঙ্গিত দিলেন যে, আমার আশ্বাস গ্রহণ করলেন এবং আমার কথার উদ্ধৃতি দিয়ে আমাকে চমকে দিলেন : ‘আপনি লিখেছেন যে আমরা আল্লাহকে হত্যা করেছি।’ (নিউইয়র্ক টাইমসের জন্য আমার লেখা একটি নিবন্ধের শিরোনামের উল্লেখ করেন তিনি)।

আমি একটু সংকুচিত বোধ করলাম। ‘ওহ, বাংলাদেশের এক লেখকের গল্প থেকে কথাটি নেওয়া হয়েছে ...। বেশ কার্যকর সূচনা হলো আমাদের আলোচনার।’

তিনি হাসলেন এবং আমাকে ক্ষমা করতে আমার হাঁটু চাপড়ে দিলেন। ‘আপনারা আমাকে ‘বাংলাদেশের কশাই’ বলে ডাকেন এবং আপনারা যে সংখ্যা উল্লেখ করেন!’

আমি বিকল্প উপায় অবলম্বন করে জেনারেলের মৌখিক হামলা থামিয়ে দিলাম : এটিই স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত রণকৌশল। ‘জেনারেল সাহেব, আপনার মা-বাবা এবং গ্রাম সম্পর্কে আপনার ছেলে আমাকে কিছু তথ্য দিয়েছে। স্কুলে আপনি কোথায় পড়াশোনা করেছেন?’

‘কালার সালিয়েদান গ্রামে। এরপর আমি সেনাবাহিনীতে নির্বাচিত হয়ে নাওগং এ কিচনার কলেজে যাই। আপনি নাওগং এর কথা জানেন? ঝাঁসির কাছে।’

“আপনি কী ‘ওয়াই’ ক্যাডেট ছিলেন?”

“জি, হ্যাঁ, আমি ভাইসরয়’স কমিশন লাভ করি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়; আমি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম।’

এটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, টিক্কা খান তার শিক্ষা জীবন সম্পর্কে বলতে চান না। কারণ এ সম্পর্কে তার বলার তেমন কিছু নেইÑ প্রিন্স বা ওয়েলস কলেজ এবং এরপর স্যান্ডহার্স্ট অথবা দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতেও যাননি তিনি। কোনো ব্রিটিশ রেজিমেন্টে তার সংশ্লিষ্ট থাকার উল্লেখ নেই, এমনকি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের মতো দর্শনীয় গোঁফও নেই তার।

জেনারেল টিক্কা খান একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে এসেছেন, যার সর্বোচ্চ চূড়ান্ত সামরিক অভিলাষ হতে পারত সর্বোচ্চ একজন সুবেদার মেজর। তিনি ইংরেজি বলেন থেমে থেমে; উচ্চারণে পাঞ্জাবি টান সুস্পষ্ট এবং ইংরেজির মধ্যে প্রায়ই পাঞ্জাবি শব্দ যুক্ত হয়।

জেনারেল টিক্কা খানের ড্রয়িং রুমে প্রদর্শিত হয়েছে, তার যে জীবনধারা হতে পারত, সাফল্য কীভাবে তা অতিক্রম করে তাকে বর্তমান অবস্থানে উন্নীত করেছে। রুমের সবকিছু অবশ্যই সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত : ফার্নিচার এবং ফিটিংস সরকারি, দেয়ালে টানানো চিত্র ও ক্যালিগ্রাফি একইভাবে ব্যক্তিগত নয়। বিভিন্ন রেজিমেন্টের প্ল্যাক এবং দেয়ালে ঝুলানো মেডেল, টেবিল ও তাকে সাজানো বস্তুর উদার প্রদর্শনীর বাইরে অন্য কিছুর প্রতি খুব কম মানুষের দৃষ্টি পড়ে। একটি তাকের দুই পাশে ফ্রেমে বাঁধাই করা দুটি আরবি ক্যালিগ্রাফি; একটিতে আল্লাহর ঐশ্বর্য ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আল্লাহু আকবর,’ অপরটিতে পবিত্র কোরআনের আয়াতের একটি অংশ, ‘নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুম কারিব,’ (আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং বিজয় আসন্ন)।

জেনারেল টিক্কা খান সেনাবাহিনীতে তার প্রথম দিকের জীবন এবং তার অনেক ভারতীয় বন্ধুর কথা বললেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই বছর আগে আমি দিল্লিতে ছিলাম। যুদ্ধ শুরু হলে জেনারেলের রোমেলের অধীনে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাকে সেকেন্ড ফিল্ড রেজিমেন্টের সঙ্গে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।

আমার ঊর্ধ্বতন ছিলেন কুমারামাঙ্গালাম, তখন তিনি মাত্র লেফটেন্যান্ট ছিলেন। আমার সঙ্গে ছিলেন যোধপুরের কল্যাণ সিং। উমরাও সিংও ছিলেন, যিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন; কোটাহ’র অভয় সিং ছিলেন। তারা সবাই ছিলেন রাজপুত। কিন্তু প্রেম সিং ছিলেন শিখ এবং তিনিও মেজর জেনারেল হয়েছেন। আমরা তাকে বলতাম, ‘খোরে-কী-হোসি’ (যিনি জানেন যে কী ঘটবে)। কারণ প্রেম সিং সবসময় তার হাত ওপরের দিকে তুলতেন এবং পোথোহারি টানে উচ্চারণ করতেন, ‘খোরে কী হোসি!’ সাবেক বন্ধুর ভঙ্গি নকল করে তিনি ওপরের দিকে হাত তুলে নাড়েন। গভীরে ডুবে থাকা চোখ পুরু লেন্সের মাঝ দিয়ে জ্বল জ্বল করে উঠল।

‘জার্মানরা আমাকে বীর-উল-হাকিমে আটক করে। আমি ১৫ মাস যুদ্ধবন্দী হিসেবে ছিলাম। এরপর আমি পালিয়ে যাই। আমি আমার সেকেন্ড ফিল্ড রেজিমেন্টে ফিরে আসি। আমাকে বার্মা ফ্রন্টে পাঠানো হয়। আমরা জাপানিদের বিরুদ্ধে এবং আইএনএ’র (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি) বিরুদ্ধে লড়াই করি। আমরা আপনাদের জেনারেল শাহ নওয়াজ খানকে আটক করি। আমার ডান হাতে আঘাত লেগেছিল,’ বাম হাত দিয়ে ডান হাতের ওপরের অংশ টেনে তিনি বলেন।

‘আঘাত খুব গুরুতর ছিল না, কিন্তু আমি তিন মাস যুদ্ধের বাইরে ছিলাম। যে সময় আমি হাসপাতাল ত্যাগ করি তখন যুদ্ধ শেষ হয়েছে। আমাকে ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং প্রথমে দেওলালি এবং এরপর মথুরায় পোস্টিং দেওয়া হয়। মথুরা থেকে কল্যাণে পোস্টিংয়ের পর আমি স্টাফ কলেজ কোর্সে যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত হই। ১৯৪৬ সালে আমি দেরাদুনে ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে ইনস্ট্রাক্টর ছিলাম। আমি আয়াপ্পার (পরবর্তীতে লে. জেনারেল) কাছে থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করি। এরপর আমি মেজর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করি। ওই বছরের গ্রীষ্মকালে আমি বিয়ে করি ...।’

 

‘আপনার জ্ঞাতি বোনকে?’

‘জি হ্যাঁ! আপনি কী করে জানেন?’ প্রশ্ন করার দৃষ্টিতে পুত্রের দিকে ফিরে তিনি জানতে চান।

‘আমি অনুমান করেছি। অধিকাংশ পাঞ্জাবি মুসলিম তাদের চাচাতো বা মামাতো বোনকে বিয়ে করে।’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন,’ তিনি স্বীকার করলেন। ‘এরপর আসে স্বাধীনতা ও দেশ বিভাগ। এবং আমি পাকিস্তানে চলে আসি।’

পাকিস্তানে প্রতিযোগিতা কম ছিল এবং পদোন্নতি হয়েছে দ্রুত। কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে শুরু করে টিক্কা খান ১৯৪৮ সালে কোয়েটা স্টাফ কলেজে যান এবং ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি জেনারেল হেড কোয়ার্টার্সে আসেন।

 

এর ছয় মাস পর তিনি লে. কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন এবং তার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয় একটি নতুন মিডিয়াম আর্টিলারি রেজিমেন্ট গড়ে তোলার। ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ণ কর্নেল হিসেবে আর্টিলারির ডেপুটি ডাইরেক্টরের দায়িত্ব লাভ করেন। এক বছর পর ১৯৫৫ সালের জুনে তিনি ব্রিগেডিয়ার হন এবং নওশেরা, পেশোয়ার এবং কোয়েটায় পোস্টিংয়ের পর হেড কোয়ার্টার্সে ফিরে আসেন। ১৯৬২ সালে তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান।

টিক্কা খান তার ধারা বর্ণনা থামিয়ে ১৯৬৪ সালে কোয়েটায় তার ভূমিকা প্রসঙ্গে আমাকে জানান, যখন ভারতীয়দের কাছে তিনি ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ খেতাব পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী সেখানে যা ঘটেছিল, তা হচ্ছে, একদল দস্যু স্থানীয় পুলিশ দলের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে আটজনকে হত্যা এবং ১৭ জনকে আহত করে। দুষ্কৃতকারীদের নির্মূল করার অভিযানে একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়। ‘ব্যস, এটুকুই,’ তিনি বলেন, ‘আর আপনাদের সংবাদপত্রগুলো এটিকে এক ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ বানিয়ে প্রচার করেছে।’

১৯৬৫ সালের যুদ্ধে জেনারেল টিক্কা খান প্রথমে কচ্ছের রাম এলাকায় আমাদের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করেন। ‘এটি ছোটখাটো একটি সংঘর্ষ ছিল,’ তিনি বলেন, ‘আপনাদের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের বিরুদ্ধে আমাদের রেঞ্জাররা লড়েছে। সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি হয় এবং কয়েক দিন পর ৪ জুলাই সেখান থেকে আমাদের বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়।’

এরপর আসে ২২ দিনের যুদ্ধ। জেনারেল টিক্কা খান শিয়ালকোট সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। ভারতীয় পক্ষে তার মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন তার সাবেক বন্ধু জেনারেল থাপান এবং নরোনহা। ‘এক ধরনের অচলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হয়,’ টিক্কা খান বলেন। ‘আমাদের একজনের বিপরীতে আপনারা তিনজন ছিলেন, কিন্তু আমরা আমাদের ভূমি ধরে রেখেছিলাম।’

পাকিস্তানিরা দাবি করে যে, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে তারা বিজয়ী হয়েছে। ‘আপনারা বিজয় দিবস পালন করেন,’ আমি বলি। ‘হতাহতের সংখ্যা, অথবা সমরাস্ত্র আটকের তুলনা করা হলে এটিকেও যৌক্তিক বলে মনে হয় না। অধিকাংশ বিদেশি সামরিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন যে, আমরা ভারতীয়রা আপনাদের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম।’

জেনারেল টিক্কা খান আমার দিকে ফিরে ম্লান হাসলেন এবং কোনো ধরনের আবেগ ছাড়াই উত্তর দেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আপনারা বেশি হারিয়েছেন। এর কারণ ছিল যে, আপনারা আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন এবং হামলাকারীরাই সবসময় বেশি মানুষ এবং সরঞ্জাম হারায়।’

‘ভূখ-ের ব্যাপারে কী বলবেন? এবং ট্যাঙ্ক ও বিমান? আমাদের সংখ্যা আপনাদের সংখ্যার সঙ্গে কোনোভাবেই তুলনায় আসে না।’

জেনারেল তার অবস্থানে অটল এবং আগের কথাই বললেন, ‘আমরা মনে করি, আপনারা অনেক বেশি হারিয়েছেন।’ এরপর তিনি স্বীকার করলেন, ‘পার্থক্যটা খুব বেশি নয়, কিন্তু আমরা মনে করি যে, যুদ্ধে আমরা আপনাদের চেয়ে ভালো করেছি।’

এ প্রসঙ্গে আমি আর কথা বাড়ালাম না।

ভারত-পাকিস্তান ২২ দিনের যুদ্ধ অবসানে জেনারেল টিক্কা খান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোয়ার্ট ও মাস্টার জেনারেল হন এবং ১৯৬৯ সালের এপ্রিলে তাকে লে. জেনারেল করা হয়। ওই বছরের গ্রীষ্মকালে রাজনীতিতে তার প্রথম হাতেখড়ি ঘটে। আগস্ট মাসে তাকে লাহোরের সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয় এবং তিনি প্রায় দুই বছর সেই পদে ছিলেন। এর পরই পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক আলোড়ন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ততদিনে জেনারেল টিক্কা খান নিজেকে একজন দৃঢ়চেতা ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতির অধিকারী করে তুলেছেন, যিনি অপ্রয়োজনীয় সহিংসতার আশ্রয় না নিয়েই গোলযোগপূর্ণ এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। তিনি তার সহকর্মীদের এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছেও আস্থা অর্জন করেন। তার অনেক সিনিয়র অফিসারের মতো তার নিজের রাজনৈতিক কোনো অভিলাষ ছিল না। রাজনীতির খেলায় নিজেকে না জড়িয়ে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করার ব্যাপারে তার ওপর নির্ভর করা যেত। অতএব, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তাকে নির্বাচন করা স্বাভাবিক একটি ব্যাপার ছিল।

“১৯৭১ সালের ৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আমাকে করাচিতে তলব করেন। আমাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ব্যক্তিগত আলোচনা হয়। তিনি আমাকে অবিলম্বে ঢাকায় যেতে বলেন, কারণ সেখানকার পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়,’ জেনারেল টিক্কা খান বললেন। ‘লাহোরে আমাকে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের উদ্দেশে প্রথম ফ্লাইট ধরিÑআপনারা ওই সময়ের মধ্যে আপনাদের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করেছেন এবং আমাকে সিলন (শ্রীলঙ্কা) হয়ে যেতে হয়। আমি ৭ মার্চ সকালে ঢাকায় অবতরণ করি।’’

“পরিস্থিতি ছিল খুবই জটিল। অ্যাডমিরাল আহসান গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন; জেনারেল ইয়াকুবও পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তখনো গভর্নরের বাসভবনে বাস করছিলেন। আমি ক্যান্টনমেন্টের একটি বাড়িতে উঠলাম। চিফ সেক্রেটারি, পুলিশের আইজি ও ডিআইজিদের একটি বৈঠক আহ্বান করলাম। আমি জানতে পারলাম যে, পরিস্থিতি বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, শেখ মুজিবুর রহমান পরদিন রেসকোর্সে আয়োজিত এক সমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। চিফ সেক্রেটারি এবং আইজির পরামর্শে আমি শেখ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করলাম। তিনি গভর্নর হাউস অথবা ক্যান্টনমেন্টে আসবেন না। নিরপেক্ষ কোনো স্থানে আমাদের বৈঠকের পরামর্শ তিনি এড়িয়ে গেলেন। তিনি চাইছেন, তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বজায় রাখার জন্য আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।’’

“যাহোক, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। কিন্তু আমি জানতে পারলাম যে, তার লোকজন সর্বত্র রয়েছে এবং গোলযোগ সৃষ্টি করছে। আমি গভর্নরের বাসভবনে উঠলাম এবং সেখানে আসার ব্যাপারে তার আপত্তি রয়েছে জেনে তার কাছে বার্তা পাঠালাম যে, আমাদের বৈঠক অ্যাসেম্বলি ভবনে হবে, যেটি আমার যতটা মনে আছে তার কাছে বর্ণনা করেছিলাম, ‘আপনার ভবিষ্যৎ ভবন’ হিসেবে। মুজিব এমনকি আমার এই পরামর্শেও সাড়া দেননি।’’

তার কথায় বিঘ্ন ঘটিয়ে আমি প্রশ্ন করি, ‘প্রধান বিচারপতি কী আপনাকে শপথ পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানাননি?’

‘তিনি ভীত ছিলেন। আমার কাছে তিনি একটি নোট পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে, তার জীবন বিপন্নকল্পে তিনি ভয় করছেন। তবে আমি এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতার তোয়াক্কা না করে গভর্নর ও সামরিক প্রশাসক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন শুরু করি।’

তিনি পুনরায় তার বর্ণনায় ফিরে এলেন, ‘১২ মার্চ আমি খবর প্রকাশ করলাম যে, প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফরে আসছেন। তিন দিন পর ইয়াহিয়া খান এবং মি. ভুট্টো পৌঁছলেন এবং নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো।

‘আমি আপনাকে জানাতে চাই যে, তখন পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি,’ জেনারেল টিক্কা খান জোর দিয়ে বললেন। ‘একজন সৈনিকও ক্যান্টনমেন্টের বাইরে পা রাখেনি। করাচিতে একটি ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে কর্তব্য পালন করতে পাঠানোর জন্য, তাদের জাহাজে উঠানো হয়নি; কারণ এ উদ্যোগের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরে গোলাবারুদ বোঝাই অবস্থায় নোঙর করেছিল, বাঙালিরা গোলাবারুদ খালাস করতে অস্বীকার করে। আমি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার জন্য আদেশ জারি করি। এমনকি রাজনৈতিক আলোচনা যখন ব্যর্থ হলো, তখনো আমি কোনো সামরিক পদক্ষেপ আদেশ দেইনি।

‘যখন আমি জানতে পারলাম যে, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ইউনিটগুলো কুষ্টিয়া, পাবনা, চট্টগ্রাম এবং আরও অনেক স্থানে পুলিশ বিদ্রোহ করেছে এবং তাদের অবাঙালি অফিসারদের হত্যা করেছে; এমনকি অনেক স্থানে তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে; শুধু তখনই আমার পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে যে, আমাকে ব্যাপকভিত্তিক এক বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবং আমি আমার পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।’

‘১৯৭১ সালের ২৫ ও ২৬ মার্চ রাতের সেই চরম সময়ের আনুপূর্বিক ঘটনাগুলো কী আপনি স্মরণ করতে পারেন,’ আমি প্রশ্ন করি।

‘জি হ্যাঁ,’ তিনি উত্তর দেন এবং স্মৃতি রোমন্থন করতে শুরু করেন, ‘আমি খবর পেয়েছিলাম, ইউনিভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা করা হলেও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং বাঙালি পুলিশের ব্যবহারের জন্য অস্ত্রশস্ত্র মজুদের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমার আদেশে বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে সারা দেশে সব বাঙালি পুলিশ সদস্যকে নিরস্ত্র করা হয়। পরে সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর লোকজন পিলখানার দখল নেয়, যেখানে অস্ত্রশস্ত্রের মজুদ ছিল। আমি অপারেশনের নির্দেশ দেই এবং কোথায় কী ঘটছে জানার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে টেলিফোন ও রেডিও যোগাযোগের মধ্যে ছিলাম।’

শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার এবং তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে জেনারেল কিছু উল্লেখ করেননি।

‘দেশের অনেক স্থানে ভারী গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটছিল। ঢাকায় আমরা সারা রাত ধরে প্রতিরোধের স্থানগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য অভিযান চালিয়েছি। সকালের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।’

‘কিন্তু তা কী মূল্যে? সংবাদপত্রগুলোতে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, আপনি রীতিমতো রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে যা ঘটেছে, সে সম্পর্কে অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ রয়েছে ...।’

‘এগুলো আপনাদের প্রপাগান্ডাÑ আপনাদের অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং আপনাদের সংবাদপত্রের কাজ। এরপর আমি একটি উপসংহারে উপনীত হই যে, কেউ যদি সত্য জানতে চায়, তাহলে ভারত যে সংখ্যাই বলুক, প্রতিটি সংখ্যাকে সত্তর দিয়ে ভাগ করতে হবে।’

একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাই। ‘প্রতিটি সংখ্যাকে সত্তর দিয়ে ভাগ করা বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?’

‘আপনাদের সংবাদপত্র এবং সেগুলোকে অনুসরণ করে বিদেশি সংবাদপত্রগুলো রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যে, ২৫ মার্চ রাতে এবং ২৬ মার্চ ঢাকায় সাত হাজার লোক নিহত হয়েছে। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা একশর নিচে ছিলÑ সঠিক সংখ্যা ৯৭। আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম সব মৃতদেহ দুটি হাসপাতালে আনার জন্য। একটি হাসপাতালে ছিল ৬৬টি, অপর হাসপাতালে ৩১টি, অর্থাৎ মোট ৯৭টি। ধরা যাক, দুটি বা তিনটি মৃতদেহ পাওয়া যায়নি অথবা আত্মীয়স্বজন নিয়ে গেছে এবং সব মিলিয়ে মোট একশটি। এটিকে সত্তর দিয়ে গুণ করুন, তাহলেই ভারতীয়রা যে সংখ্যা বলেছে তা পেয়ে যাবেন।’

‘এমনকি আপনাদের মাসক্যারেনহাস ...’

‘ওহ মাসক্যারেনহাস!’ জেনারেল মন্তব্য করলেন, মেজাজি ভঙ্গিতে হাত নেড়ে তাকে নাকচ করলেন, যেন নাকের সামনে থেকে কোনো দুর্গন্ধ দূর করছেন।

‘আপনারা কতজন লোক হারিয়েছিলেন?’ আমি প্রশ্ন করি।

‘একজন নিহত এবং চারজন আহত।’

‘তাহলে তো এটিকে প্রতিরোধ বলা চলে না,’ আমি সাহস করে বলি।

তিনি আমার খোঁচা অগ্রাহ্য করে ভারতীয় ও বিদেশি সংবাদপত্রের নিন্দা অব্যাহত রাখলেন। ‘আপনাদের অল ইন্ডিয়া রেডিও আমাকে হত্যা করার খবর প্রচার করেছে এবং বিবিসি খবরটি আপনাদের কাছ থেকে নিয়েছে। আমি সেটিকেই বলি, ‘ফোরকাস্ট অব অপারেশন’ বা অভিযানের আভাসÑআশা করতে থাকি কেউ আমাকে হত্যা করুক।’ বিজয়ীর ভঙ্গিতে জেনারেল হাসলেন। আমি স্বীকার করলাম, অল ইন্ডিয়া রেডিও ভুল করেছে।

‘শুধু ওই একটি ঘটনাই নয়, সবকিছুতেই তা করে’ জেনারেল বললেন। ‘তারা বলেছে যে, আমি হিন্দুদের হত্যা করেছি। জুন মাসে যখন ইউনিভার্সিটি খুলে দেওয়া হয়, সব হিন্দু কর্মচারীসহ ৯৭ শতাংশ কর্মচারী তাদের নিজ নিজ কাজে যোগ দেয়। আপনারা মোট নিহত সংখ্যা মার্চ মাস থেকে শুরু করে ৩০ লাখে তুলেছেন এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থী সংখ্যা দেখিয়েছেন এক কোটি। আমি জানি, ২৬ হাজারের বেশি লোক নিহত হয়নি এবং শরণার্থী সংখ্যাও পঁচিশ লাখ ছাড়িয়ে যায়নি।’

সংখ্যাগুলোর ব্যাপারে আমি প্রতিবাদ করলাম, ‘আমি শরণার্থীদের সংখ্যা গণনা করিনি, কিন্তু আমি অসংখ্য শরণার্থী শিবিরে গেছি; আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি যে, শরণার্থী সংখ্যা অতিরঞ্জিত নয়; প্রত্যেকের নামে ইস্যু করা রেশন কার্ড এবং তাদের যে সহায়তা করা হয়েছে, সেই সংখ্যার ভিত্তিতেই মোট শরণার্থী সংখ্যা বলা হয়েছে। আমরা এক বছরের বেশি সময় রিফিউজি ট্যাক্স পরিশোধ করে যাচ্ছি।’

জেনারেল ধরা দিতে চান না। ‘আমি অপারেশনের দায়িত্বে ছিলাম। আমার জানা উচিত। আমার অনুমানের ভিত্তি জেলাগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য। আমি গাড়িতে এবং হেলিকপ্টারে সব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। আমি আপনাকে বলতে পারি যে, নিহতের সংখ্যা কিছুতেই ২৬ হাজার অতিক্রম করেনি। আমরা আমাদেরে আট হাজার সৈন্যকে হারিয়েছি। সংখ্যার বিচারে এটি খুব বেশি নয়। আমি একটি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়ছিলাম।’

আমার সঙ্গে যে তথ্য অফিসার ছিলেন, তিনি অনধিকার চর্চার মতো আকবর ইলাহাবাদীর কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিলেন;

‘শউক-ই-তুল-ও-পেছ ইস জুলমাত ক্যাদে হ্যায় আগার

বাঙালিকে বাত সুন, আউর বাঙলালকে বাল দেখ।’

(কাহিনিকে দীর্ঘ করতে চাইলে কাহিনি লেজে মোচড় দাও,

কোনো বাঙালির কথা শোন, আর তার স্ত্রীর চুলের দৈর্ঘ্য দেখ)

তিনি আমার দিকে তার প্রতি আক্রমণ করলেন; ‘আমাদের কাছে প্রমাণ আছে যে, মার্চ মাসেই ভারতীয় অনুপ্রবেশ শুরু হয়েছিল। আমাদের কাছে প্রমাণ আছে যে, বাঙালিরা বিহারিদের হত্যা করেছে।’ তিনি কোন শহরের নাম উল্লেখ করলেন, যা আমার কাছে বগুড়ার কাছে সান্তাহার, যেখানে তার মতে ১৭ হাজার বিহারিকে হত্যা করা হয়েছে। ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে আমাদের কাজ কঠিন করে তুলেছিল আপনাদের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স, যারা শুধু সীমান্ত এলাকাকেই উত্তপ্ত করে রাখেনি Ñ তারা আমাদের ভূখ-ের অভ্যন্তরে ছয়-সাত মাইল এলাকায় অনুপ্রবেশ করেছিল।

‘আপনাদের সংবাদপত্র কাহিনি প্রচার করেছে যে, আমাদের সৈন্যরা হাজার হাজার বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছে এবং অসংখ্য অবৈধ সন্তানের জন্ম হয়েছে। মে মাসের পুরো সময়ে আমার কাছে ধর্ষণের দুটি ঘটনা এসেছে। ধর্ষণের শিকার মিলিটারি পুলিশের পাঞ্জাবি মহিলা। অভিযুক্ত দুজন লোককে যথাক্রমে সাত বছর ও তিন বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে আমি চলে আসার সময়ের মধ্যে আরও দুটি ঘটনা আমাকে জানানো হয়। মোট চারটি ঘটনা ঘটেছে। সরদার সাহেব, আমি আমাদের সৈন্যদের জানি। আমি চল্লিশ বছর যাবত তাদের সঙ্গে আছি। তারা ধার্মিক এবং খোদাভক্ত মানুষ, যারা নারীদের সম্মানহানির মতো কাজে লিপ্ত হয় না। সবই ছিল আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য চক্রান্তের অংশ। তিন লাখ নারীকে ধর্ষণের ঘটনা যদি ঘটত, তাহলে এসব নারীর যেসব সন্তানের জন্ম হয়েছে, তারা কোথায়?”

আমি ব্যাখ্যা করি যে অনেকে গর্ভপাত করিয়েছে - অনেক শিশুকে মাদার তেরেসার সহায়তায় দত্তক নেওয়া হয়েছে।

‘না, না,’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এসব ছিল আমাদের সেনাবাহিনীর বদনাম করার জন্য পরিচালিত চক্রান্তের অংশ।’

‘তাহলে আপনি কি ব্যাখ্যা দিতে পারেন যে, আপনার সেনাবাহিনী বাঙালি জনগণ কর্তৃক এত ঘৃণিত কেন?’ আমি তাকে প্রশ্ন করি। জেনারেলের মতে, এর কারণ ভারতীয় অপপ্রচারকারীদের ছড়ানো মিথ্যা কাহিনি। আমি তার সঙ্গে এ বিষয়ে তর্কে জড়ানোর অসারতা উপলব্ধি করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলাম।

‘জেনারেল সাহেব, আপনি হয়তো আমার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইবেন, অথবা উত্তর নাও দিতে পারেন। আপনি কি বলবেন যে, আপনার সেনাবাহিনী যুদ্ধে এত দুর্বলভাবে প্রতিরোধ করল কেন?’ যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে আমাদের জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সঙ্গে আমার ইন্টারভিউর কথা আমি তাকে বলি। ‘এমনকি জেনারেল অরোরাও আশা করেননি যে, আপনাদের বাহিনী এত দ্রুত টুকরো টুকরো হয়ে যাবে; কারণ পাকিস্তানি সৈন্যদের যুদ্ধ করার মান ও যোগ্যতার ওপর তিনি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন।’ আমি তাকে ভারতীয়দের দ্বারা গোলাবারুদসহ বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম আটক করার বিষয় উল্লেখ করি। ‘কী ঘটেছিল? আপনারা কেন এগুলো ব্যবহার করেননি অথবা হাতিয়ার সমর্পণের আগে অন্তত গোলাবারুদ্ধের গুদাম ধ্বংস করে দেননি?’

টিক্কা খান নিদারুণ অকপটতায় আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন, ‘স্বীকার করতেই হবে যে, চতুরতায় আপনাদের জেনারেলরা আমাদের জেনারেলদের অতিক্রম করেছিলেন। তারা আমাদের সেনাবাহিনীকে উপযুক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে যুদ্ধ করার সুযোগ দেননি। তারা সব সীমান্তে আমাদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখে এবং আমাদের ইউনিটগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ভারতীয়দের দ্বারা নিয়াজি যে তার রণনৈপুণ্য প্রদর্শনের সম্পূর্ণ অসমর্থ হয়ে পড়েছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ জেনারেল ফজল মুকিম খান তার ‘পাকিস্তান’স ক্রাইসিস ইন লিডারশিপ’ গ্রন্থে বিপর্যয় সংক্রান্ত যে বিশ্লেষণ করেছেন, তার সঙ্গে তিনি একমত পোষণ করেন।

‘কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ছিল স্থানীয় জনগণের মধ্য থেকে শত্রুতা, যারা আমাদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল,’ তিনি উপসংহার টানলেন। ‘এ ধরনের একটি যুদ্ধে ১০ শতাংশ মানুষ এক পক্ষে, ১০ শতাংশ আরেক পক্ষে; অবশিষ্ট ৮০ শতাংশ সমর্থন করেছে বিজয়ী পক্ষকে। এ ঘটনাই ঘটেছে বাংলায়; পরবর্তী পর্যায়ে জনগণের ৯০ শতাংশই আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। একজন হাবিলদার, যিনি পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি আমাকে সঠিক উত্তর দিয়েছেন, যখন তিনি বলেন, ‘আওয়াম হামারে খেলাপ হো গ্যায়ে হ্যায়’ (জনগণ আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে)।

‘তা সত্ত্বেও নিয়াজি যুদ্ধে আরও ভালো করতে পারতেন। প্রতিরক্ষার জন্য ভৌগোলিক অবস্থা অনুকূল ছিল। ঢাকা থেকে অল্প দূরে রাজেন্দ্রপুরে তার জন্য এক মাসের গোলাবারুদের মজুদ ছিল। গভর্নর মালিক আমাকে বলেছিলেন, তাদের মাত্র এক মাসের খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। আমি তাকে বলি, ‘তাতে কী হয়েছে? রেশনের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনুন। এটা যুদ্ধ।’ কিন্তু তারা অতি শিগগিরই হাল ছেড়ে দিয়েছিল।’

‘পশ্চিম সীমান্তের ব্যাপারে কী বলবেন? আপনাদের সেনাবাহিনী এদিকেও লক্ষ্যণীয় কিছু করেনি।’

‘পশ্চিম সীমান্ত?’ তিনি প্রশ্ন করেন। ‘পশ্চিম সীমান্তে প্রকৃত কোনো যুদ্ধ হয়নি। আমাদের রিজার্ভ অক্ষত ছিল। আমাদের যোদ্ধা রেজিমেন্টগুলোকে যুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়নি। ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধবিরতির আদেশ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল। আমরা আরও অনেক মাস পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারতাম এবং যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারত সমান শর্তে।’

আমরা দুই ঘণ্টা ধরে কথা বলছিলাম। আমি দাঁড়িয়ে বিদায় নেওয়ার আগে বললাম, ‘আমি আশা করছিলাম যে, ভারতের সঙ্গে হিসাব-নিকাশ চুকানো সম্পর্কে আপনার কাছে অনেক কিছু শুনব। কিন্তু আমি স্বস্তি বোধ করছি যে, এখানে কেউ আরেকটি যুদ্ধের কথা বলে না।’

জেনারেল টিক্কা খান উত্তর দিলেন, ‘পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে চায়; কিন্তু তা হতে হবে সম্মানজনক শান্তি।’

 

 

জেনারেল টিক্কা খান

জেনারেল টিক্কা খান বাংলাদেশের মানুষের কাছে একজন ঘৃণিত মানুষ। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক। কসাই টিক্কা নামেই তিনি পরিচিত। তার স্বদেশি পাকিস্তানিরাই তাকে এ নামে ডাকত। ১৯৭০ সালে বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ দমনে জেনারেল টিক্কা খান নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালান। সে জন্য পশ্চিম পাকিস্তানিরাই তাকে বেলুচিস্তানের কসাই নামে পরিচিতি দেয়। বেলুচিস্তানে বর্বর হত্যাযজ্ঞের পর পাকিস্তানের শাসকচক্র পূর্ব পাকিস্তানকেও একটি কসাইখানা বানাতে চেয়েছিল। তারা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নামে নানা টালবাহানা করতে থাকল আর তলে তলে বাংলাকে রক্তাক্ত করার জন্য সব ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নিতে থাকল। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই টিক্কা খানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালে ঢাকায় সামরিক অভিযান ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার জন্য তিনি ‘বাংলার কসাই’ হিসেবে কুখ্যাতি পান। বাংলাদেশের  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে টিক্কা খানকে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডে-এর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে জেনারেল পদে উন্নীত করেন এবং ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ তাকে সেনাবাহিনী প্রধান নিয়োগ করা হয়।

 

খুশবন্ত সিং

খুশবন্ত সিংহ ভারতের খ্যাতিমান রম্য লেখক ও সাংবাদিকদের একজন। ১৯১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের হাদালিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর অঞ্চলটি পাকিস্তানের অধীনে চলে যায়। তিনি সংবাদপত্র ‘যোজনা’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এ ছাড়াও ভারতের ‘দ্য ন্যাশনাল হেরাল্ড’ ও ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’ও সম্পাদনা করেছেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের লোকসভার সদস্য ছিলেন। তার লেখা জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে অন্যতম ট্রেন টু পাকিস্তান, আই শ্যাল নট হিয়ার দ্য নাইটিঙ্গেল এবং দিল্লি। খুশবন্ত ৯৫ বছর বয়সে ‘দ্য সানসেট ক্লাব’ উপন্যাস লেখেন। এ ছাড়াও তার ননফিকশন দুই খন্ডের রচনা, ‘অ্যা হিস্টরি অব দ্য শিখস’ ছাড়াও অনুবাদ, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে লেখা, উর্দু কবিতা সব মিলিয়ে তার লেখার পরিমাণ অনেক। ২০০২ সালে পেঙ্গুইন থেকে তার আত্মজীবনী ‘ট্রুথ, লাভ অ্যান্ড এ লিটল ম্যালিস’ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৪ সালে খুশবন্ত ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক পদক পদ্মভূষণ অর্জন করেন। কিন্তু অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রতিবাদে ১৯৮৪ সালে তিনি পদ্মভূষণ ফিরিয়ে দেন। ২০০৭ সালে তিনি দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক পদক পদ্মবিভূষণে সম্মানিত হন।


আপনার মন্তব্য