শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৫ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ এপ্রিল, ২০১৭ ২৩:৪৭

লাখো মানুষের স্নানোৎসব

প্রতিদিন ডেস্ক

লাখো মানুষের স্নানোৎসব

নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অষ্টমী স্নানোৎসব সম্পন্ন করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এ সংক্রান্ত নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন—

নারায়ণগঞ্জ : কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এবার ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান সম্পন্ন করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। লাখো পুণ্যার্থী স্নানোৎসবে যোগ দেন। রবিবার থেকেই মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো লাঙ্গলবন্দ এলাকা। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থস্থান নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দের ব্রহ্মপুত্র নদে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তিথি অনুযায়ী ৩ এপ্রিল বিকাল ৫টা ৪১ মিনিট ৭ সেকেন্ডে মহাষ্টমী স্নানোৎসবের লগ্ন শুরু হয়। লগ্ন শেষ হয় গতকাল বিকাল ৩টা ৩২ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে। হিন্দু পুণ্যার্থীদের মতে পবিত্র নদ ব্রহ্মপুত্রে স্নানমন্ত্র পাঠপূর্বক নিজ নিজ ইচ্ছানুযায়ী ফুল, বেলপাতা, ধান, দূর্বা, হরীতকী, ডাব, আম্রপল্লব ইত্যাদি দিয়ে পিতৃকুলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে ভক্তরা। এর আগে ২০১৫ সালে স্নানোৎসবে এক গুজবকে কেন্দ্র করে ১০ পুণ্যার্থী পদদলিত হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচিত হতে হয় স্নানোৎসবে থাকা দায়িত্বরতদের। এরপরই নজিরবিহীন নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয় স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা। স্নানোৎসব এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে পুণ্যার্থীরা ১৩টি ঘাটে স্নানোৎসব পালন করতেন। এ বছর ১৮টি ঘাটে স্নান করার সুযোগ পেয়েছেন। ঘাটগুলো হলো— আড্ডা সামপুর ঘাট, নমিত মোহন সাধু ঘাট, নাসিম ওসমান ঘাট, অন্নপূর্ণা ঘাট, রাজঘাট, মাকরী সাধু ঘাট, গান্ধী (শ্মশান) ঘাট, ভদ্রেশ্বরী কালী ঘাট, জয়কালী মন্দির ঘাট, পাষাণকালী ঘাট, মনোজকান্ত বড়াল ঘাট, প্রেমতলা ঘাট, মণি কৃষিপাড়া ঘাট, ব্রহ্মমন্দির ঘাট, দক্ষিণেশ্বরী কালীবাড়ি মঠ ঘাট, কালীগঞ্জ পঞ্চপাব ঘাট, পরেশ সাধু ঘাট, সাবদী কালীবাড়ি ঘাট। স্নান ঘাটের আশপাশের রাস্তায় এবার মেলা বসতে দেওয়া হয়নি। ঘাট এলাকা থেকে আশপাশের তিন কিলোমিটার এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি কোনো যানবাহন। তাই অনেক দূর থেকে হেঁটে স্নানঘাটে পৌঁছতে হয়েছে পুণ্যার্থীদের। এতে অবশ্য বয়োজ্যেষ্ঠদের তিন কিলোমিটার এলাকা হেঁটে স্নান ঘাটে পৌঁছতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। পথে পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দফায় দফায় তল্লাশি চালিয়েছে। স্নান উৎসব সুষ্ঠু করতে এ বছর লাঙ্গলবন্দের তিন কিলোমিটার এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছিল। ব্রহ্মপুত্র পাড়ের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা ও ওয়াচ টাওয়ার। এ বিষয়ে সন্ধ্যা রানী নামের এক পুণ্যার্থী জানান, এবার স্নান উৎসব নির্বিঘ্নে পালিত হয়েছে। স্নানের পরিবেশ খুবই সুন্দর। দুলাল মোদক নামের আরেক পুণ্যার্থী জানান, লাঙ্গলবন্দের তীর্থে প্রবেশের মুখে এখনো পর্যন্ত দুবার পুলিশি তল্লাশিতে পড়েছি। তবে পুলিশের দফায় দফায় তল্লাশিতে বিরক্ত হয়েছে অনেক পুণ্যার্থী। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, স্নানোৎসব কেমন হয়েছে তা আপনারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি পুলিশও সব ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ আমাদের সহায়তা করেছে। তাই কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই স্নানোৎসব সম্পন্ন হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমার কঠোর নজরদারি করেছি।

লাঙ্গলবন্দ স্নান ও নদের কাহিনী : লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সম্পর্কে চমৎকার এক কাহিনী প্রচলিত আছে। হিন্দু পুরাণ মতে, ত্রেতাযুগের সূচনাকালে মগধ রাজ্যে ভাগীরথীর উপনদী কৌশিকীর তীর ঘেঁষে এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল, যার নাম ভোজকোট। এ নগরীতে ঋষি জমদগ্নির পাঁচ পুত্র সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের নাম রুষন্নন্ত, দ্বিতীয় পুত্রের নাম সুশেন, তৃতীয় পুত্রের নাম বসু, চতুর্থ পুত্রের নাম বিশ্বাসুর, পরশুরাম ছিলেন সবার ছোট। পরশুরামের জন্মকালে বিশ্বজুড়ে চলছিল মহাসংকট। একদিন পরশুরামের মা রেণুকা দেবী জল আনতে গঙ্গার তীরে যান। সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরী গণসহ)। পদ্মমালীর রূপ এবং তাদের সমবেত জলবিহারের দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে যে, তিনি তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ঋষি জমদগ্নির হোমবেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার মোটেও খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে রেণুকা দেবী কলস ভরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। তপোবলে ঋষি জমদগ্নি সবকিছু জানতে পেরে রেগে গিয়ে ছেলেদের মাকে হত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার ছেলে মাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। পরবর্তীকালে পিতা খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে তিনি মা এবং ভাইদের প্রাণ ফিরে চান। তাতেই রাজি হন ঋষি জমদগ্নি। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেননি তিনি। এক পর্যায়ে পিতার কথামতো পরশুরাম তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায়। পরশুরাম মনে মনে ভাবেন, এই পুণ্য বারিধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ খুব উপকৃত হবে। তাই তিনি হাতের খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন তিনি। ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। এজন্য এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। এরপর এই জলধারা কোমল মাটির বুক চিরে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। পরবর্তীকালে এই মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।

জামালপুর : জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদ তীরে সম্পন্ন হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব অষ্টমী স্নান। অষ্টমী স্নান উপলক্ষে মঙ্গলবার ভোর থেকে মানুষের ঢল নামে  ব্রহ্মপুত্র নদ তীরে। অষ্টমী স্নান উপলক্ষে দিনাজপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, শেরপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় সমাবেশ হয়। বরিশাল : বরিশালের ঐতিহ্যবাহী দুর্গা সাগর দীঘিতে দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে অষ্টমীর পুণ্যস্নান। গতকাল সূর্যদয় থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুণ্যস্নানের আয়োজন করা হয়। কুড়িগ্রাম : আজ সিন্দুরমতী দীঘিতে সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্নানোৎসব। কুড়িগ্রামের রাজারহাট-লালমনিরহাট সীমান্তবর্তী সিন্দুরমতী নামক এলাকায় রহস্যময় এ দীঘির জলে সনাতন ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থীরা পাপমোচন হওয়ার জন্য স্নান করেন।

লক্ষ্মীপুর : পাপ মোচনের আশায় লক্ষ্মীপুরের রহমতখালী নদীতে অষ্টমী স্নান উৎসব পালন করেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। গতকাল সদর উপজেলার পৌর শহরের শাঁখারীপাড়া ঘাটে স্নানোৎসবের শুভলগ্ন সকাল ৮টা ১০ মিনিটে শুরু হয়ে চলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত।  মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জ শহরের বেউথা কালীগঙ্গা নদীতে অষ্টমী স্নান অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল ভোরে বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা বয়সী হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ নদীতে এসে স্নানে অংশ নেন। অন্নপূর্ণা সেবা সংঘ এই গঙ্গাস্নানের আয়োজন করে। কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল ভোর থেকে শুরু হয়ে বেলা ২টা পর্যন্ত এ উৎসব চলে।


আপনার মন্তব্য