শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ মে, ২০১৮ ২৩:০০

প্রেমিকবেশে পাচারকারী

মির্জা মেহেদী তমাল

প্রেমিকবেশে পাচারকারী

সীমা আর কুলসুম। দুই বান্ধবী। সাভারের হেমায়েতপুরের একটি গার্মেন্টে চাকরি করেন। আমিনবাজারের কাছে একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন একসঙ্গে। একদিন সীমার মোবাইল ফোনে ৫০ টাকার ফ্লেক্সিলোড আসে। এর কিছুক্ষণ পর ওই নম্বর থেকে সীমার মোবাইলে কল করেন মারুফ নামে এক ব্যক্তি। নিজেকে সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন পরিচয় দেন। ভুল করে সীমার নম্বরে ৫০ টাকার ফ্লেক্সিলোড চলে গেছে বলে জানান। শুনে সীমা বলেন, ‘অসুবিধা নেই ভাইয়া! আমি পাঠিয়ে দেব আপনার নম্বরে।’ মারুফ বলেন, ‘তার দরকার নেই। না হয় আপনাকে ওটা গিফট করলাম।’ এমন এক কথা দুই কথা বলতে বলতে তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রথমে ভাই-বোন হিসেবে তাদের মধ্যে সম্পর্ক হলেও পরে তা প্রেমে গড়ায়। অন্যদিকে রং নম্বরে কল করার সুবাদে তার বান্ধবী কুলসুমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সাকিব নামে এক তরুণের। সাকিব নিজেকে পুলিশ অফিসার পরিচয় দেন। সীমা ও কুলসুম একই রুমে থাকেন। রাতভর তারা দুজন ফোনে তাদের প্রেমিকের সঙ্গে  কথা বলতে থাকেন। সীমাকে একদিন সাভার স্মৃতিসৌধে দেখা করতে বলেন মারুফ। দেখা করার সময় মারুফ সীমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে কুলসুমও সাকিবের কথায় একই এলাকায় দেখা করতে যান। সাকিবও কুলসুমকে যশোর বেনাপোলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। একই এলাকায় দুই বান্ধবী তাদের প্রেমিকদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন, কিন্তু তারা জানেন না। সাকিব এ সময় কুলসুমকে বলেন, এখানে আমার এক বন্ধু এসেছেন তার প্রেমিকাকে নিয়ে। ওকে ফোন দিয়ে আসতে বলি। কুলসুম বলেন, ফোন দাও। ফোন দেওয়ার পর মারুফ আসেন তাদের কাছে। সঙ্গে সীমা। কুলসুম তার বান্ধবী সীমাকে দেখে অবাক। কী ব্যাপার! তারা ভাবতেই পারেন না, দুই বন্ধুর সঙ্গে তারা দুই বান্ধবী সম্পর্ক গড়েছেন। নতুন করে সবাই সবার সঙ্গে পরিচিত হন। এ সময় তাদের কাছে আইডি কার্ড দেখতে চান সীমা ও কুলসুম। তারা আইডি কার্ড দেখান।

স্মৃতিসৌধ এলাকা থেকে সীমা ও কুলসুম চলে যেতে চাইলেও তারা জোর করে জুস খাওয়ান। এর পরই তাদের মাথা ঘোরা শুরু হয় এবং অজ্ঞান হয়ে যান। তাদের যখন জ্ঞান ফেরে নিজেদের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আবিষ্কার করেন। তাদের দুজনকে একটি লঞ্চে ওঠানো হয়। ঠিকভাবে তাদের মাথা কাজ করছিল না। সাকিব ও কুলসুম কেবিন ভাড়া করেন। সেখানেই তাকে রাতভর ধর্ষণ করেন সাকিব। আর সীমা ও মারুফ কেবিন না পাওয়ায় তারা লঞ্চের ছাদে চলে যান। কিছুক্ষণ পর স্টাফদের কাছে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে এক হাজার টাকায় স্টাফদের থাকার কেবিন ভাড়া করেন। সেখানে মারুফ সীমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মারুফ সীমাকে রেখে লঞ্চের কোনো স্থানে গিয়ে আড়াল করে রাখেন। পরে তাকে আর পাওয়া যায়নি। এরপর সীমা কুলসুম দুজন মিলে সাকিবের কাছে মারুফের বিরুদ্ধে কথা বলেন। সাকিবও মারুফকে ভণ্ড আখ্যায়িত করে নিজেকে ভালো সাজান তাদের কাছে। লঞ্চটি খুলনার তুষখালী থামলে সেখানে তারা নেমে যান। সেখান থেকে বাসে করে যশোর বেনাপোলে যান। কিন্তু সাকিবের ভাবভঙ্গি তাদের ভালো লাগছিল না। তারা ঢাকা চলে আসার জন্য বলছিলেন। এ সময় সাকিব তাদের ভয় দেখান। রাস্তায় তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি চলার সময় র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে। উদ্ধার হন সীমা ও কুলসুম। সাকিব পুলিশের কাছে সব ঘটনা খুলে বলেন। তিনি জানান, সাকিব মারুফ পরিকল্পিতভাবেই দুই বান্ধবীকে টার্গেট করেছিলেন। তারা প্রকৃত অর্থে নারী পাচারকারী। র‌্যাবসূত্র জানায়, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করার উদ্দেশ্যে সীমা ও কুলসুমকে যশোরে নিয়ে যান পাচারকারীরা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাচারকারী চক্রের সদস্য ডালিম মোল্লা (২৭), পল্টু সরদার (৪২) ও সাকিবকে (৩০) গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী সাভার থেকে মারুফকেও গ্রেফতার করা হয়। তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, দুই লাখ টাকার চুক্তিতে সীমা ও কুলসুমকে ভারতে পাচার করার কথা ছিল। কুলসুম বলেন, কেউ যেন মোবাইল ফোনের এমন কোনো প্রতারকের ফাঁদে পা না বাড়ান। কাউকে যেন বিশ্বাস না করেন। সীমা ও কুলসুম বলেন, পাচারকারীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়; যাতে আর কোনো নারীকে এভাবে চক্রান্তের শিকার হতে না হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সীমা ও কুলসুমকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে পাচার করতে চেয়েছিলেন ওরা। পাচারকারী চক্রের মূল হোতা জব্বার হোসেন ওরফে মারুফ ও সাকিব ধরা পড়লেও এমন প্রেমিকরূপী পাচারকারী চক্র সক্রিয় সারা দেশে। সচেতন থাকলে হয়তো তাদের কাছ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।


আপনার মন্তব্য