Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ জুন, ২০১৮ ২৩:৫০

পরিচয় মিলছে না হাজার হাজার লাশের

মাহবুব মমতাজী

পরিচয় মিলছে না হাজার হাজার লাশের

হত্যার পর লাশ গুম করতে নদী বা জলাশয়ে ফেলে দেওয়ার কৌশল নেয় দুর্বৃত্তরা। আর সেইসব লাশই উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারপর কিছু লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়, আবার কিছু অজ্ঞাতই থেকে যায়। অজ্ঞাত থাকাগুলো পরিচয়হীন থেকে যায়। এভাবে বছরে পরিচয়হীন লাশের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সহস াধিক।

লাশগুলোর পরিচয় ও মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে পুলিশের তেমন তৎপরতা থাকে না। তাদের বক্তব্য, এসব উদঘাটনে তাদের নানা প্রতিবন্ধকতা থাকে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম সূত্রে জানা গেছে, চার বছরের বেওয়ারিশ লাশ দাফনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে তারা ১০৩ ব্যক্তির বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে। বছরে গড়ে সংস্থাটি এক হাজার ২৩৪ লাশ দাফন করে। গত বছরের জুলাইয়ে তারা ১১৪ লাশ দাফন করে। এ ছাড়া আগস্টে ১৪৭, সেপ্টেম্বরে ১২৪, অক্টোবরে ৮৮, নভেম্বরে ৯০, ডিসেম্বরে ১০৭ লাশ দাফন করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫০, ফেব্রুয়ারিতে ৬০, মার্চে ১৮১, এপ্রিলের ৬৮টিসহ মোট এক হাজার ২৯ লাশ দাফন করে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩০০। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৩৫৭ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৩৩৩ বেওয়ারিশ লাশ সংস্থাটি দাফন করে। এসব লাশের অধিকাংশের বয়সই ১৬ থেকে ৪৭ এর মধ্যে। পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস এ প্রতিবেদককে জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অজ্ঞাত লাশগুলোকে মৃত্যুর কয়েক দিন পর পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরে যায়, ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাদের বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করা হয় এবং ডিএনএ টেস্টের নমুনা সংগ্রহ করে ফ্রিজিং করে রাখা হয়।

কয়েকটি উদাহরণ : গত ১১ এপ্রিল সকালে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী টোল প্লাজার পাশের একটি দোকানের সামনে খয়েরি রঙের একটি ট্রলি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে সেটি খুললে কোমর থেকে পা পর্যন্ত কাটা এক নারীর দেহ দেখতে পান তারা। খবর দিলে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠায়। পরে অজ্ঞাত হিসেবেই দাফন করা হয়। এখনো পর্যন্ত সেই লাশের কোনো পরিচয় কিংবা হত্যার ক্লু বের হয়নি।

গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কদমতলী এলাকায় বস্তাবন্দী মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করে পুলিশ। পূর্ব কদমতলীর ২৪ ফুট রোডের একটি খাল থেকে ওই বস্তাটি পাওয়া যায়। খালের কচুরিপানার নিচে বস্তাটি লুকানো ছিল। বিকালে পথচারীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় বস্তার মুখ খুললে হাড়গোড় বেরিয়ে আসে। ধারণা করা হয়, ২-৩ মাস আগে লাশটি বস্তায় ভরে সেখানে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সেটি সেখানে পচে কঙ্কাল হয়ে যায়। কঙ্কালটির স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত ও করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়। একই দিনে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে বোরো ধানের খেত থেকে অজ্ঞাত এক নারীর লাশ উদ্ধার হয়। জানা গেছে, বোচাগঞ্জ উপজেলার আটগাঁও ইউপির আলমপুর মৌজার বোরো ধান খেতে আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে দুজন নারী লাশটি দেখে এলাকাবাসীকে খবর দেন। পরে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। এর আগে গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি একই উপজেলায় অজ্ঞাত আনুমানিক ২৬ বছর বয়সী এক নারী এবং পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়রা জানায়, ওইদিন সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ৬ নম্বর বনগাঁও ইউনিয়নের বনগাঁও ফার্মপাড়া বাঘেরঘাট কাঞ্চন নদীর দক্ষিণ সাদামহল এলাকায় লাশ দুটি ভাসতে দেখে স্থানীয় চৌকিদারকে খবর দেওয়া হয়। পরে চৌকিদার বোচাগঞ্জ থানাকে বিষয়টি অবহিত করে। বোচাগঞ্জ থানা পুলিশ এসে ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাশ উদ্ধার করে। এ বিষয়ে বোচাগঞ্জ থানার এসআই আবু তালেব জানান, আলমপুরে পাওয়া নারীর তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। আঙুলের ছাপ নিয়ে নির্বাচন কমিশন অফিসে পাঠানো হয়েছে, তবে এখনো কোনো রিপোর্ট আসেনি। আর সাদামহলে পাওয়া লাশটিরও পরিচয় মেলেনি। গত ৭ মার্চ রাজধানীর দারুস সালাম থানার বসুপাড়ার খাল থেকে এক নারীর বস্তাবন্দী অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বয়স আনুমানিক ২২। সেটিও অজ্ঞাত হিসেবেই থেকে গেছে। গত ৩ মে রাজধানীর বনানীতে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত এক নারীর মৃত্যু হয়। তার বয়স আনুমানিক ৫০। জানা  গেছে, কমলাপুরগামী একটি ট্রেনে কাটা পড়ে ওই নারী ঘটনাস্থলেই মারা যান। বনানীর রেলওয়ে প্লাটফর্মের পাশে রেললাইনে এ ঘটনা ঘটে। মৃত্যুর আগে ওই নারী রেললাইন ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ট্রেনে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার বাম হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, একটি পা থেঁতলে যায় এবং তার মাথা ফেটে যায়। এখনো পর্যন্ত লাশগুলোর কোনো কূলকিনারা হয়নি।  ওয়াকিবহাল সূত্র জানায়, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে প্রায়ই অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে অধিকাংশই খুনের শিকার। হত্যার পর লাশ গুম করতে খুনিরা লাশ নদী ও জলাশয়ে ফেলে দেয়। কখনো আবার মহাসড়কের পাশে নির্জন স্থানে লাশ ফেলে রাখে। কয়েকদিনের মধ্যে লাশ পচে গলে যায়। এতে করে লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে খুনের রহস্য উন্মোচন হয় না।

পরিচয় না থাকায় তদন্তে অনেক বেগ পেতে হয় পুলিশকে। এ কারণে এসব ঘটনা তদন্তে পুলিশের তেমন আগ্রহও থাকে না। অজ্ঞাত লাশের অনেকেই আবার দুর্ঘটনার শিকার। লাশগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে জুরাইন ও আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের শাখা বিষয়ক ও সমন্বয় কর্মকর্তা মো. আবদুল আউয়াল এ প্রতিবেদককে জানান, প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক বেওয়ারিশ লাশ এই সংস্থার মাধ্যমে দাফন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর কোলঘেঁষা বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, বালু নদী, শীতলক্ষ্যা নদীসহ বিভিন্ন জলাশয়ে লাশগুলো পাওয়া যায়। এর বাইরে রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহর, ডেমরা, মিরপুর বেড়িবাঁধ, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর রেললাইনের দুই পাশ, শ্যামপুরের ওয়াসা পুকুরপাড়, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর বেড়িবাঁধের পাশ থেকে প্রায়ই অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়। পচে গন্ধ বের না হলে লাশ কারও নজরে আসে না। এসব লাশের মধ্যে কোনোটি গুলিবিদ্ধ, কোনোটিতে ধারালো অস্ত্রের চিহ্ন, কোনোটি বস্তাবন্দী, কোনোটির হাত-পা বাঁধা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শরীরে জখমের চিহ্ন থাকে। হত্যার পর লাশ গুম করতে এবং আলামত নষ্ট করতে এ কৌশল নেয় খুনিরা।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর