শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫১

বুক পেতে জীবন-সম্পদ রক্ষা করেছে সুন্দরবন

ড. আতিক রহমান

বুক পেতে জীবন-সম্পদ রক্ষা করেছে সুন্দরবন

আগের তুলনায় সুন্দরবনে গাছের ঘনত্ব কমেছে। বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও কমে গিয়েছে। কিন্তু এরপরও সুন্দরবন লতাপাতা দিয়ে জড়িয়ে থাকায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত করার পর এর শক্তি কমে যায়। সুন্দরবনের সামনে অনেক দ্বীপ মাথা উঁচু করে আছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য বনটির উপযুক্ত ব্যবহার করে নতুন গাছপালা লাগানো যেতে পারে এবং সুন্দরবনের প্রসারও বাড়ানো যেতে পারে। এ ছাড়া সুন্দরবনকে নতুন করে জীব-বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলতে যা যা করা প্রয়োজন তা যথাযথভাবে করা হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করতে হবে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আতিক রহমান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।  এই পরিবেশ বিজ্ঞানী বলেন, এবার বুলবুলের যে আঘাত সুন্দরবনের ওপর পড়েছে তা সিডরের সময়ও সুন্দরবনের ওপর পড়েছিল। আর এ অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের কিছু বিষয় শিক্ষণীয় আছে। সিডরের সময় সুন্দরবন বুক পেতে ঘূর্ণিঝড়টি মোকাবিলা করায় বিপুল পরিমাণ জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা গিয়েছিল। যা এবার বুলবুলের সময়ও আমরা দেখতে পেরেছি। সিডরে প্রচ  ঝড়ে যখন সুন্দরবনে প্রচুর গাছপালা ভেঙে যায় তখন সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে দুটি মত দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি মত ছিল ভেঙে যাওয়া গাছগুলো সরিয়ে আবার নতুন করে সেখানে গাছ লাগানো হোক। কিন্তু আমরা যারা পরিবেশ তথা ইকো সিস্টেম নিয়ে কাজ করি তারা এই মতের বিপক্ষে ছিলাম। আমরা বলেছিলাম, প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো থাকতে দিতে হবে। আর দেখা গেল পরে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করে ভাঙা গাছগুলোকে সেভাবেই রেখে দেওয়ায় সুন্দরবনের ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলো থেকে নতুন করে ডালপালা ছড়ায়। আর সাত বছরে সেই গাছগুলো পরিমাণেও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও আগের তুলনায় সুন্দরবনে গাছের ঘনত্ব কমেছে। বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও কমে গিয়েছে। কিন্তু এরপরও এবার সুন্দরবন লতাপাতা দিয়ে জড়িয়ে থাকায় বুলবুল আঘাত করলে এর শক্তি কমে যায়।

ড. আতিক বলেন, সুন্দরবনের যেসব এলাকায় গাছের ঘনত্ব কমে গিয়েছে সেখানে সঠিক গাছপালা-গুল্মাদি লাগিয়ে নতুন জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে সুন্দরবনে ১১৪টি থেকে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড় আসলে এই বাঘগুলো নিজেদের রক্ষায় আশ্রয় করে নিতে পারবে। ঝড়ে কিছু হরিণ মারা গেলেও সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বর্তমানে আশঙ্কাজনক নয়। কুমিরও ঝড়ে নিজের মতো করে আশ্রয় খুঁজে নিতে পারবে। তবে ঝড়ে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

এই ঘূর্ণিঝড় থেকে আমাদের জন্য এটি শিক্ষণীয় যে সুন্দরবন মানুষের জীবন বাঁচায়। এটি আমাদের জন্য বড় সম্পদ। এর কোনো অপচয় করা যাবে না। পর্যটকদের সুন্দরবনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আরও কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সুন্দরবনের নিচ দিয়ে না গিয়ে পর্যটকদের জন্য ফেক্সিবল ঝুলানো রাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে। সুন্দরবনের গাছের উপরেও বন্যপ্রাণী ও গাছপালা থাকে। সেখানে আরেকটি নতুন জগৎ। সঠিক ব্যবস্থাপনায় নতুন এই জগৎও পর্যটকদের সামনে আনা যেতে পারে।   

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল প্রথমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত করে তারপর এটি বাংলাদেশের সুন্দরবনে প্রবেশ করে। তবে পশ্চিমবঙ্গে আঘাত করার সময়ই ঘূর্ণিঝড়টির শক্তি কমে যায়। বাংলাদেশে বুলবুল মধ্যরাতে আঘাত করে। আর এ সময় ভাটা থাকায় সাগরে পানির উচ্চতাও কম ছিল। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে জলোচ্ছ্বাস হওয়ার যে ভয় দেখা গিয়েছিল তা কেটে যায়। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম হয়েছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড়টি মোকাবিলায় প্রস্তুতি ভালো ছিল। ঘূর্ণিঝড়ের আগে ২২ লাখ মানুষকে নিরাপদে সাইক্লোন শেল্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়। সার্বিকভাবে এই ঘূর্ণিঝড়ে মৃতের সংখ্যাও কম। দেশের ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও এনজিও কর্মী, পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় সরকার সবাই মিলে একসঙ্গে প্রচ  শক্তিতে পরিণত হয়ে জনগণকে রক্ষা করেছে।


আপনার মন্তব্য