শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৮

কর্ণফুলী-হালদার গলার কাঁটা প্লাস্টিক বর্জ্য

মরছে নদী, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, দেখার কেউ নেই

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

কর্ণফুলী-হালদার গলার কাঁটা প্লাস্টিক বর্জ্য

দেশের অর্থনীতির হৃৎপি- বন্দরের প্রাণ কর্ণফুলী এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্য। প্রতিদিনই এ প্লাস্টিক বর্জ্য গৃহস্থালি বর্জ্যরে সঙ্গে সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। ফলে দূষিত হচ্ছে নদী। নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। হুমকিতে পড়ছে মাছ। কিন্তু এ নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন গৃহস্থালি, শিল্পসহ নানা বর্জ্য অপসারণ করে। এর মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পৃথক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য থাকেই। এসব বর্জ্য নগরের ছোট-বড় ৩৬টি খাল হয়ে সরাসরি পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। অন্যদিকে ১৯টি ছোট-বড় খালের মাধ্যমে গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্যরে সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য পড়ছে হালদা নদীতে।

জানা যায়, জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে প্লাস্টিক পণ্য। এর মধ্যে আছে প্লাস্টিকের বোতল, খেলনা, যন্ত্র, খাবার, টুথপেস্ট ও এর মোড়ক, চিপসের মোড়ক, খনিজ পানির বোতল, পলিথিন ব্যাগসহ ওয়ান টাইম ব্যবহারের নানা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক সামগ্রী। প্লাস্টিক অপচনশীল হওয়ায় ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া এর অধিকাংশই যুগের পর যুগ একইভাবে পরিবেশে টিকে থাকে। পরিবেশ-বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্লাস্টিক পণ্য জীবনযাত্রার সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িয়ে থাকায় ব্যবহারের পর অধিকাংশেরই সর্বশেষ গন্তব্যস্থল হয়ে থাকে খাল-নদী। এগুলো বিপন্ন করছে পানিতে বাস করা জীববৈচিত্র্য। প্রতিনিয়তই দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। গবেষকদের মতে, সমুদ্রের প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ১০০ গ্রাম করে প্লাস্টিক বর্জ্য ভাসছে। গোটা বিশ্বের সমুদ্র এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ এখন ৪০ হাজার টনের বেশি। এসব বর্জ্যরে জন্য বিপন্ন হয়ে উঠছে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী এগুলোকে খাবার মনে করে খেতে গিয়ে প্রাণও হারাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম নগরের সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশগুপ্তা বলেন, ‘নদীতে প্লাস্টিক পণ্য ফেলা কোনোমতেই উচিত নয়। এ ব্যাপারে আমরা সব সময় সবাইকে সতর্ক করে আসছি। এ ছাড়া ব্যবহারনিষিদ্ধ পলিথিন বন্ধেও আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছি। তবে নগর থেকে নদীতে কী পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পড়ছে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘প্লাস্টিক বর্জ্যরে মধ্যে ভয়াবহ হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কা ও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে প্লাস্টিকের কণাগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে পড়ে। এমনকি একসময় সেগুলো আর খালি চোখে দেখা যায় না। এ ছাড়া এ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা যখন সমুদ্রের পানিতে মিশে যায়, সেগুলো সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। অতিক্ষুদ্র হওয়ায় এগুলোকে চিহ্নিত করা কঠিন। তাই জলাধারগুলোকে প্লাস্টিক পণ্য থেকে রক্ষা করা জরুরি।’ স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হালদা নদীর ভাঙন ঠেকাতে ও নদীতীর রক্ষায় উপজেলার দক্ষিণ মাদার্সা, উত্তর মাদার্সা ও বুড়িশ্চর ইউনিয়ন অংশে বাঁধ নির্মাণ এবং ব্লক বসানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১২ কিলোমিটার এলাকায় কাজ শেষ হয়েছে। ফলে নদীতীর রূপ পেয়েছে একটি প্রাকৃতিক দৃষ্টিনন্দন স্থান হিসেবে। হালদা পাড়ের প্রাকৃতিক ও নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি শুক্র-শনিবার হাজারখানেক ও প্রতিদিন ৫০০-এর মতো পর্যটক আসেন। কিন্তু পর্যটকদের ও পিকনিকের নানা খাবার, খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিকের বোতল, প্লাস্টিকের প্যাকেট, গ্লাস, প্লেট, পলিথিন ও চিপসের প্যাকেটগুলোর শেষ গন্তব্যস্থল হচ্ছে হালদা নদী। এ ছাড়া এখানে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অন্তত ২০টি দোকান। ফলে দূষিত হচ্ছে হালদা, নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। বুড়িশ্চর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা মুজিবুল হক বলেন, ‘পর্যটকদের পিকনিকসহ নানা খাবার-জাতীয় পণ্যের অপচনশীল প্লাস্টিক হালদা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এটি বন্ধ করা উচিত।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর