শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩১ মে, ২০২০ ২৩:৫৯

ভিন্ন পরিবেশের ফলে এগিয়ে মেয়েরা

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৮২.৮৭ শতাংশ, জিপিএ-৫ এক লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮

আকতারুজ্জামান

ভিন্ন পরিবেশের ফলে এগিয়ে মেয়েরা
মোবাইল ফোনে ফল জানার পর উচ্ছ্বাস -বাংলাদেশ প্রতিদিন

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা-২০২০ এর ফলাফল গতকাল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সারা দেশের ২০ লাখ ৪০ হাজার ২৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫২৩ জন। পাসের হার ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সারা দেশ থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর সারা দেশ থেকে ২১ লাখ ২৭ হাজার ৮১৫ জন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছিল ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ১৬৫ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ২ শতাংশ। সে হিসেবে গত বছরের চেয়ে পরীক্ষার্থী কমলেও বেড়েছে পাসের হার। গতবার মোট ১ লাখ ৫ হাজার ৫৯৪ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। গতবারের চেয়ে এবার ৩০ হাজার ৩০৪ জন বেশি পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। চলতি শিক্ষাবছর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা বেশি পাস করেছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে ছাত্রীরা। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৮৪ দশমিক ১ শতাংশ ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ৮১ দশমিক ৬৩ শতাংশ ছাত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ছাত্রদের চেয়ে ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ ছাত্রী বেশি পাস করেছে। এ ছাড়া সারা দেশে মোট ৬৫ হাজার ৭৫৪ জন ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭০ হাজার ১৪৪ জন।

করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ভিন্ন এক পরিবেশে এবার ফল সংগ্রহ করেছে পরীক্ষার্থীরা। স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের ছিল না কোনো হইহুল্লোড়, নাচ-গান-উচ্ছ্বাস। বাড়িতে বসে মোবাইলে ও অনলাইন থেকে ফল সংগ্রহ করেছে তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এবারের মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ করেন। এরপর সচিবালয় থেকে ফেসবুক লাইভে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এ সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফলাফলে দেখা গেছে, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড থেকে ১৬ লাখ ৩১ হাজার ৩০৮ জন ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ২১৮ জন। এসব বোর্ডে পাসের হার ৮৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

মাদ্রাসা বোর্ড থেকে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮১৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪১০ জন। এ বোর্ডে পাসের হার ৮২ দশমিক ৫১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭ হাজার ৫১৬ জন।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৫ জন ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৯৫ হাজার ৮৯৫ জন। পাসের হার ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ। এ বোর্ডের অধীনে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ হাজার ৮৮৫ জন।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছরের ফলের সূচকে বেশ কিছু ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত বছরের মতো এ বছরও উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন বা অতিমূল্যায়ন রোধে বোর্ডগুলো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রধান পরীক্ষকদের উত্তরমালা প্রণয়নের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। পরীক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য একটি প্রশ্নমালা সকল প্রধান পরীক্ষককে সরবরাহ করা হয়েছে।

কভিড-১৯ এর কারণে এবার সম্পূর্ণ পেপারলেস পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের ঘরে থেকে মোবাইল ফোনে ফল প্রাপ্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য ফল প্রকাশের দিন কোনো ধরনের সমাবেশ বা উৎসব না করার নির্দেশনাও প্রদান করা হয় শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে। পরীক্ষায় কৃতকার্য সকল পরীক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানান শিক্ষামন্ত্রী। যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আগামীতে পরীক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

করোনা সংক্রমণের কারণে গতকালও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। এসএসসি ও সমমানের এবারের ফলাফলের দিনে স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের ছিল না উপস্থিতি, ছিল না কোনো হইহুল্লোড়। অনলাইন ও মোবাইলে ফল সংগ্রহ করেছে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা। প্রতিষ্ঠানে না এলেও ফল প্রাপ্তির পর শিক্ষকদের ফোনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে কৃতী শিক্ষার্থীরা।

ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এসএসসিতে ৬৮৭ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এদের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৬২০ জন, ব্যবসায় শিক্ষা থেকে ৪৮ জন ও মানবিক বিভাগ থেকে ১৯ জন জিপিএ-৫ পায়। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, দেশ কভিড-১৯ এর কারণে চরম দুর্যোগে পতিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবার ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও নাচগান নেই প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে। তারপরও উত্তীর্ণ কৃতী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ফোন করে নিজেদের আনন্দ ও সন্তুষ্টির কথা শিক্ষকদের জানিয়েছেন। ভালো ফলাফলের জন্য প্রতিষ্ঠানের ফলপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকদের ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান অধ্যক্ষ।

মাইলস্টোন কলেজ থেকে এবার ১ হাজার ৩৮১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে শতভাগ পাস করেছে। পাসকৃতদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৩৫ জন শিক্ষার্থী।

প্রতিবছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের এক সপ্তাহ পরে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভর্তি সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে না বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। তাই করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

পাসের হারে এগিয়ে রাজশাহী বোর্ড, পিছিয়ে সিলেট : এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারের দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডে পাসের হার ৯০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে সিলেট বোর্ড। এই বোর্ডে পাসের হার ৭৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, অন্য বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৮২ দশমিক ৩৪ শতাংশ, কুমিল্লায় ৮৫ দশমিক ২২ শতাংশ, যশোরে ৮৭ দশমিক ৩১ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৮৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, বরিশালে ৭৯ দশমিক ৭০ শতাংশ, দিনাজপুরে ৮২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮২ দশমিক ৫১ শতাংশ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ।

জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে ঢাকা বোর্ড : জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় এবারও শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে ৩৬ হাজার ৪৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। অন্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে ২৬ হাজার ১৬৭ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ১০ হাজার ২৪৫ জন, যশোরে ১৩ হাজার ৭৬৪ জন, চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৮ জন, বরিশালে ৪ হাজার ৪৮৩ জন, সিলেটে ৪ হাজার ২৬৩ জন, দিনাজপুরে ১২ হাজার ৮৬ জন, ময়মনসিংহে ৭ হাজার ৪৩৪ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৭ হাজার ৫৬১ জন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪ হাজার ৮৮৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

শতভাগ পাস ৩ হাজার ২৩ প্রতিষ্ঠানে, পাস করেনি ১০৪টিতে : এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৩ হাজার ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ ছাত্র-ছাত্রী পাস করেছে। অন্যদিকে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করতে পারনি। গত বছর শতভাগ পাস করেছিল ২ হাজার ৫৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছর ছিল ১০৭টি। সে হিসেবে শতভাগ পাসের সংখ্যা বেড়েছে ও শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে।

পাসের হারে এগিয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা : অন্যান্য বছরের মতো এবারও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে। এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিজ্ঞানের ৯৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। অন্যদিকে মানবিকে ৭৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৮৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।

বিদেশ কেন্দ্রে পাস ৩১৮ জন : বিদেশের ৯টি কেন্দ্র থেকে ৩৩৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩১৮ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৪টি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে।

পুনর্নিরীক্ষার আবেদন ৭ জুনের মধ্যে : এসএসসি ও সমমানে উত্তীর্ণরা আজ ১ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ফল পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করতে পারবে। এ আবেদন করতে টেলিটক মোবাইল অপারেটর থেকে থেকে RSC স্পেস বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর স্পেস রোল নম্বর স্পেস বিষয় কোড লিখে ১৬২২২ নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। একই এসএমএসে একাধিক বিষয়ের আবেদন করা যাবে। প্রতিটি আবেদনের জন্য ১২৫ টাকা হারে ফি প্রযোজ্য হবে।

এসএমএসের মাধ্যমে ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এসএসসি ও সমমানের ফল দেওয়া হয় গতকাল। শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের ওয়েবসাইট (www.educationboardresults.gov.bd) থেকেও ফল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রি-রেজিস্ট্রেশন করে এ পরীক্ষার ফল সংগ্রহ করেছে শিক্ষার্থীরা। প্রসঙ্গত, প্রতিবছর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু এ বছর করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এই ফল বিলম্বে প্রকাশ করা হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর