শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৪৭

দৃশ্যমান হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

একের পর এক বন্যা, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়

জিন্নাতুন নূর

ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। চলতি বছরই একাধিক বন্যার কবলে পড়ে দেশটি। লবণাক্ত হয়ে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার জমি। এতে কৃষির যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি সুপেয় পানি প্রাপ্তিতেও সমস্যা বাড়ছে। এ ছাড়া হচ্ছে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আগে দেশে প্রতি এক দশকে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানত। এখন দু-তিন বছরেই বড় ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। কৃষকরাও প্রকৃতিতে লক্ষ্য করছেন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

চলতি বছরের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ‘আঘাত’ হানে। এরপর আসে ঘূর্ণিঝড় ‘নিসর্গ’। অতিবৃষ্টি, বন্যা ও উপকূলীয় এলাকায় নজিরবিহীন জোয়ারের ঘটনাও ঘটে। সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ঘরবাড়ি উঁচু করে বানানো শুরু করেছেন। আবার বন্যার শেষের দিকে সহজে পানি নামছিল না। এর কারণ বড় ধরনের জোয়ার। এতে উত্তরাঞ্চলে পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। এসব ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২০১৯ সালে দেশে আঘাত আনে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ ও ‘ফণী’। সে বছর ছিল তীব্র দাবদাহ। রেকর্ড শৈত্যপ্রবাহও লক্ষ্য করা যায়। ২০১৮ সালে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’। তার কয়েক বছর আগে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’, ‘আইলা’ ও ‘সিডর’। সংশ্লিষ্টরা বলেন, এ বছর মহামারীর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও দুর্ভোগে ফেলে মানুষকে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ার মতো রোগবালাই বাড়ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট)-এর ছয়জন গবেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের বন্যার ওপর গবেষণা করেন। গবেষণা মতে, বিশ্বে তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ফলে বেড়েছে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগও। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের  তথ্যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত এক দশকে দেশের ৭ লাখ মানুষ বসতভিটা হারিয়েছেন। বিগত সময়ে বঙ্গোপসাগরে পানির উচ্চতাও বেড়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের ১৩.৩ মিলিয়ন মানুষ ঘরছাড়া হবেন। ২০১৮ সালের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ প্রোফাইল বাংলাদেশ’ নেদারল্যান্ডস সরকারের প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ বাড়ছে। আর ইউএনডিপি ট্রপিক্যাল ঘূর্ণিঝড়ে ঝুঁকির জন্য বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় প্রথম রেখেছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আতিক রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কতগুলো প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। এ বছর চার মাস ধরে চারটি বড় ধরনের বন্যা হয়েছে। এ বছরই ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ হয়েছে। এরপরই আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘নিসর্গ’। এত কম সময়ের ব্যবধানে ঘূর্ণিঝড় আগে হয়নি। আগে প্রতি ১০ বছরে একটি বড় ঘূর্ণিঝড় হতো। এখন প্রতি দু-তিন বছরে বড় ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া তাপমাত্রা ও ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনও চোখে পড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টি হচ্ছে। যখন হওয়ার কথা তখন হচ্ছে না। যখন হওয়ার কথা না তখন হচ্ছে। কদমসহ বিভিন্ন ঋতুভিত্তিক ফুল যখন ফোটার কথা তা ফুটছে না। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে সাইক্লোন, বন্যা ও খরার জন্য। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো খাপ খাইয়ে নেওয়া বা অভিযোজনের প্রস্তুতির দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। স্থানীয়ভাবে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগে থেকে যে প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তাতে আগের চেয়ে মানুষের মৃত্যুহার কমে গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দুর্যোগ কেন্দ্রগুলোকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যেতে হবে।

এর বাইরে দেশের ৮০ ভাগ কৃষক প্রকৃতিতে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন। বর্ষাকাল দেরিতে শুরু হওয়ায় গত পাঁচ বছরে কৃষিকাজে সমস্যা হচ্ছে। বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এসব সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ক্ষতির পরিমাণ ১২ শতাংশ। আবার নতুন করে দেশের কিছু এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের জন্য ভূমিধস দেখা দিয়েছে।


আপনার মন্তব্য