শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৫৩

প্রকৃতি

সাপের সঙ্গে বন্ধুত্ব রোমনের

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

সাপের সঙ্গে বন্ধুত্ব রোমনের

অনায়াসে সাপ ধরেন উচ্চশিক্ষিত বোরহান বিশ্বাস রোমন। সাপ কিলবিল করে তার হাত পেঁচিয়ে ধরে, হাতের ওপর খেলা করে, ফণা তুলে মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু ছোবল দেয় না। সাপগুলো রোমনের সঙ্গে ঠিক বন্ধুর মতো আচরণ করে।

প্রায় এক যুগ ধরে সাপের সঙ্গে রোমনের এমন বন্ধুত্ব। রোমন আহত সাপ উদ্ধার করে চিকিৎসা দেন। তারপর প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেন। এ জন্য একটা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন তিনি। নাম ‘সাপ উদ্ধার ও সংরক্ষণ কেন্দ্র’। ২০০৯ সালে রাজশাহীর পবা উপজেলার ধর্মহাটা গ্রামে রোমন প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন।

সম্প্রতি পঞ্চগড়ে পাওয়া দেশের একমাত্র ‘রেড কোরাল কুকরি’ সাপটি রোমনের সংরক্ষণ কেন্দ্রেই রয়েছে। শরীরে গুরুতর জখম থাকা সাপটির পরিচর্যা চলছে। কমলা রঙের এ সাপটির বাংলা কোনো নামও ছিল না। রোমন নাম রেখেছেন ‘কমলাবতী’। সুস্থ হলে সাপটি চট্টগ্রাম মেডিকেলের ভেনম রিসার্চ সেন্টারে নেওয়া হবে। রোমন সেখানকার প্রশিক্ষক। রোমন বন বিভাগের বিভিন্ন কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে সাপ ধরার কলাকৌশল শেখান। অথচ সাপ রাখার জন্য বন বিভাগ ২০১১ সালে তার নামে মামলা করেছিল। বন্যপ্রাণী হেফাজতে রেখে বিষ সংগ্রহ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২০১৬ সালে আদালত রোমনকে খালাস দেয়। এখন রোমনই ভরসা হয়ে উঠেছেন সবার। বাসাবাড়িতে সাপ ঢুকলে তার কাছে কল আসে। রোমন সাপটি মেরে না ফেলার অনুরোধ করেন। তারপর যেখানে যাওয়া সম্ভব ছুটেন। সাপটি উদ্ধার করে নিজের প্রতিষ্ঠানে আনেন। গবেষণা করেন। তারপর ছেড়ে দেন।

রোমন জানান, কিশোর বয়স থেকেই তিনি বন্যপ্রাণীদের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। ১৫-১৬ বছর আগে থেকে তিনি বন্যপ্রাণীদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলোর সঙ্গে জড়িত। সবাই পাখি আর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের নিয়ে কাজ করছে। কেউ সরীসৃপের বিষয়ে আগ্রহী নয়। তিনি ঠিক করলেন সরীসৃপদের নিয়ে কাজ করবেন। এরপর ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে সাপ ধরার প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে নিজের গ্রামে গড়ে তোলেন সাপ উদ্ধার ও সংরক্ষণ কেন্দ্র।

২০১১ সালে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ রোমনের সাপ উদ্ধার ও সংরক্ষণ কেন্দ্রে অভিযান চালায়। তারা সেখানে ৮৫টি সাপ পায়। সাপগুলো জব্দ করে রোমনের কাছেই রাখে। কারণ সাপ ধরার মতো কর্মী ও সংরক্ষণের জায়গা তাদের নেই। অথচ সেদিনই রোমনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। জব্দ সাপগুলোর বিষয়ে পরে কেউ কোনো খোঁজ নেয়নি। বয়সের কারণে বেশির ভাগ সাপ মারা যায়। আর কিছু সাপ ছেড়ে দিয়ে রোমন পড়াশোনায় মনোযোগী হন। মাঝে এমফিল করতে যান সিঙ্গাপুর। এর আগে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মলিকুলার বায়োলজিতে অনার্স ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেন। এরপর পুনরায় সাপ উদ্ধার, চিকিৎসা, গবেষণা এবং পরে ছেড়ে দেওয়ার দিকে মনোযোগী হন।

রোমন বলেন, ‘সাপ ধরতে যেমন সাহসের প্রয়োজন তেমনি সাপের প্রতি ভালোবাসাও থাকতে হবে। সে রকম লোক পাওয়া কঠিন। তার পরও আমি অন্তত ১৫ জেলায় ১৫ জনকে তৈরি করতে পেরেছি। রাজশাহী ও চট্টগ্রামে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’ বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বোরহান বিশ্বাস রোমন আমাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেন। তাকে আমরা কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে ডাকি। তার থেকে নানা পরামর্শ নিই। কারণ রাজশাহীতে আমাদের একজনও সাপ ধরার এক্সপার্ট নেই।’


আপনার মন্তব্য