শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৩২

তদারকি নেই, আমদানির ফাঁকে বিদেশ থেকে আসছে ভেজাল ও নিম্নমানের বিটুমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

তদারকি না থাকায় বিদেশ থেকে আমদানির ফাঁকে দেশে আসছে ভেজাল ও নিম্নমানের বিটুমিন। প্রতি মাসেই কোটি কোটি টাকার বিটুমিন আনা হচ্ছে। ওইসব ভেজাল বিটুমিন দিয়েই দেশের জেলা শহর ও গ্রামের হাজার হাজার কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। আর নিম্নমানের এসব বিটুমিন ব্যবহারে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তা নষ্ট হয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি অপচয় হচ্ছে সরকারের শত শত কোটি টাকা।

জানা গেছে, দেশে বিটুমিনের চাহিদার মোট মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করে সরকারি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। বাকি ৮০ শতাংশের চাহিদা মেটে আমদানি করা বিটুমিনে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা হলো, বিটুমিন আমদানির পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ। অনুসন্ধানী তথ্য বলছে, আমদানি করা বিটুমিনে বিএসটিআইর অনুমোদন নেই। পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও বুয়েটের অনুমোদন ছাড়াই বিটুমিন আসছে দেশে। সরেজমিনে দেখা যায়, আমদানি করা বিটুমিনগুলোকে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে রাখা হচ্ছে মাসের পর মাস। ফলে হারাচ্ছে গুণগতমান। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) সহযোগী অধ্যাপক ও বিটুমিন বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুস সাকিব বলছেন, ‘উৎপাদন থেকে আমদানি পর্যন্ত অসাধু ব্যবসায়ীরা নানাভাবে আমদানি করা বিটুমিনের গুণগতমান নষ্ট করেন। মুনাফার কৌশলে বিক্রি হচ্ছে হাতে হাতে। আর প্রতিবারই মিশছে ভেজাল। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করা বিটুমিনের উৎসও অজানা থাকে।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএসটিআইর অনুমোদনহীন, কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে আমদানি হয়ে আসা এসব নিম্নমানের বিটুমিন আবার রাস্তায় ব্যবহার হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের ৬০-৭০ ভাগ রাস্তা নির্মাণের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে  যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের আমদানিনির্ভর বিটুমিন ব্যবহারে রাষ্ট্রের ত্রিমুখী ক্ষতি হচ্ছে। এক. বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়। দুই. টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে না। আর তিন. কিছু অসাধু ঠিকাদার আর অসৎ ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট ভাঙা যাচ্ছে না। তাদের পরামর্শ, টেকসই সড়ক উন্নয়ন করতে হলে দেশি ভালোমানের বিটুমিন ব্যবহারের পাশাপাশি নির্মাণকাজে তদারকি বাড়াতে হবে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা দেখা গেছে, বিএসটিআই, বুয়েট কিংবা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের গুণগতমান যাচাইয়ের সুযোগ কম থাকায় বিদেশ থেকে বিটুমিন আমদানিকারকরা কম দামের নিম্নমানের কিংবা ভেজাল ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন আমদানি করছেন এবং সেসব বিটুমিন এখন দেশের বিভিন্ন সড়কে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ৮০-১০০ গ্রেডের  পরিবর্তে ৬০-৭০ গ্রেডের গাঢ় বিটুমিন ব্যবহারের কথা বলা আছে। এদিকে বিএসটিআই কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক পণ্যের মান ধরলে গ্রেড অনুযায়ী ৫০ থেকে ৭০ পর্যন্ত খুবই উন্নতমানের বিটুমিন।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলীরা জানান, দেশে দুই ধরনের বিটুমিন বাজারজাত হয়। একটি ৬০-৭০ গ্রেডের, যা অধিকতর গাঢ়। এই শ্রেণির বিটুমিন রাস্তার পিচ ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহƒত হলে সড়ক উন্নত ও টেকসই হয়। আর ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন কিছুটা তরল। তরল বিটুমিন দিয়ে পিচ ঢালাই হলে রাস্তা টেকসই হয় না। প্রকৌশলীরা আরও জানান, ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন গুণগতমানে তরল বা পাতলা হওয়ার কারণে গ্রীষ্মকালে সড়কগুলো গলে ঢিবির মতো উঁচু, নিচু বা ঢেউয়ের আকৃতি ধারণ করে। এতে সড়কে সৃষ্টি হয় অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। আবার বর্ষায় বৃষ্টির সময় ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং সড়কে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়।

খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘দেশের সড়কে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার করা উত্তম। এ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার হলে সড়ক খুবই টেকসই থাকে। ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন পাতলা হওয়ায় পিচ ঢালাই গ্রীষ্মকালে গলে যায়। আমাদের আবহাওয়ার জন্য ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিনই উপযোগী।’ এটি ব্যবহারে সড়ক টেকসই হয় বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানান, দেশে বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন বিটুমিনের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি ৭০ হাজার টন উৎপাদন করে। বাকি বিটুমিন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেসরকারিভাবে আমদানি করা বিটুমিন ভেজাল এবং গুণগতমান যাচাইয়ের খুব বেশি সুযোগ না থাকায় নিম্নমানের বিটুমিন দিয়ে দেশে সড়কের কাজ হচ্ছে।

বিএসটিআইর একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের বাজার আমদানি করা বিটুমিনের নামে ভেজাল ও মানহীন বিটুমিনে ছেয়ে গেছে। ওইসব ভেজাল, নকল ও কম দামের বিটুমিনে কাজ হওয়ায় সড়ক টেকসই হচ্ছে না। রাস্তা দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। এ কারণেই সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। উন্নয়নকাজ করার কয়েক মাসের মধ্যেই ওইসব সড়ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর