শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৩ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ মে, ২০২১ ২৩:৪২

খুনে ছিল হিংস্র কুকুর

মির্জা মেহেদী তমাল

খুনে ছিল হিংস্র কুকুর

রেলিং ঘেরা বিশাল ছাদ। সেই ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাঁচটি ভয়ংকর ‘রোটেলার’ (জার্মানির মাংসাশী হিংস্র জাতের কুকুর)। চিৎকার করছে। হঠাৎ ছাদের দরজা দিয়ে রক্তাক্ত এক তরুণকে ছাদে ঠেলে দেওয়া হয়। এরপরই ছাদের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। রক্তাক্ত তরুণটি তখনো কিছু বুঝতে পারেনি। মাথা তুলতেই তার চোখে পড়ে ভয়ংকর সেই রোটেলারগুলোর দিকে। এবার দাঁড়ায় তরুণ। দরজার দিকে ছুটতে থাকে। দুই হাতে আঘাত করে দরজায়। কেউ খুলছে না। লোহার দরজাটার ওপাশে চার তরুণ। তারা হাসছে। রক্তাক্ত তরুণটি পেছনে তাকায়। কুকুরগুলো দৌড়ে আসছে। গগনবিদারী চিৎকার করতে থাকে ভয়ে সেই তরুণটি। কিন্তু দরজা খুলে দেয় না পাষন্ড তরুণরা। এবার অসহায় তরুণের জীবন রক্ষার শেষ চেষ্টা। ছুটতে থাকে রেলিংয়ের দিকে। কুকুরগুলো ধেয়ে যাচ্ছে তার পেছনে। রেলিংয়ে উঠে পড়ে তরুণটি। কুকুরগুলোও উঠে পড়ে! তরুণটি আবারও লাফিয়ে পড়ে ছাদে। দৌড়াতেই থাকে। কিন্তু বেশিক্ষণ পারল না। হুমড়ি খেয়ে পড়ল তরুণটি। তিনটি ভয়ংকর কুকুর তখন তার শরীর কামড়ে ধরে। ছাদের দরজা থেকে এক তরুণ কুকুরগুলোকে ডাক দিল। কুকুরগুলো সেই ভয়ংকর রূপ থেকে শান্ত হয়ে গেল। সেই তরুণরা রক্তাক্ত তরুণের সামনে এসে বসল। চারজন মিলে চার হাত পা ধরে ছাদ থেকে একদম নিচে ছুড়ে ফেলে দিল অসহায় তরুণটিকে। এটি ভয়ংকর কোনো ফিল্মের ক্লিপ নয়। এভাবেই চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকার একটি ভবনের ছাদে কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল কলেজছাত্র হিমাদ্রী মজুমদার হিমুর ওপর। রক্তাক্ত হিমুকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তির ২৬ দিনের মাথায় মৃত্যু হয় হিমাদ্রীর। মৃত্যুর আগে তার ওপর নজিরবিহীন ভয়ংকর ও পৈশাচিক হামলার বিবরণ দিয়ে গেছে। হত্যাকারীরা প্রভাবশালী হলেও তারা রক্ষা পায়নি। ২০১২ সালের এপ্রিলে সারা দেশে তোলপাড় করা এ ঘটনার বিচারে আদালত পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। তবে এখনো মূল আসামিসহ দুজন রয়েছে পলাতক। হিমাদ্রী তার জবানিতে বলেছিলেন, ‘পাঁচটি কুকুর যখন একসঙ্গে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন রিয়াদ, ড্যানি, শাওন, সাজু অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘আমাদের সঙ্গে বেয়াদবি করার মজা বুঝ!’ মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল নগরীর পাঁচলাইশ থানার ১ নম্বর সড়কের ‘ফরহাদ ম্যানশন’ নামে ১০১ নম্বর বাড়ির চারতলায় কুকুর লেলিয়ে দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয় হিমাদ্রী মজুমদার হিমুকে। তিনি নগরীর ইংলিশ মিডিয়াম সামার ফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থী ছিলেন। অচেতন অবস্থায় তাকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা ২৬ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ওই বছরের ২৩ মে হিমু মারা যান। এ ঘটনায় হিমুর মামা প্রকাশ দাশ অসিত পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় পাঁচটি কুকুর লেলিয়ে দিয়ে হিমুকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়।

যেভাবে হত্যা করা হয় হিমুকে : ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল রাউজানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে মেজবান খাওয়ার জন্য দুপুরের মধ্যে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ন্যাশনাল কারিকুলাম ভবনের মোড়ে সহপাঠীদের সঙ্গে জড়ো হওয়ার কথা ছিল হিমুর। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে এসে হাজির হন তিনি। সেখানে আগে থেকে ওতপেতে ছিল সাবেক সহপাঠী রিয়াদ, সাজু, ড্যানি ও শাওন। তারা তাকে টানাটানি করে নিয়ে যায় মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ন্যাশনাল কারিকুলাম ভবনের তৃতীয় তলায়, রিয়াদের বাসায়। এ সময় হিমু তার ঘনিষ্ঠ সহপাঠীদের ফোন করতে চাইলে তার মোবাইল ফোনটি রাস্তায় ফেলে পা চাপা দিয়ে ভেঙে দেয় তিন বখাটে। রিয়াদের বাসায় নিয়ে হিমুকে প্রচন্ড মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে চারতলার ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। ছাদে ছিল হিংস্র প্রকৃতির তিনটি কুকুর। হিমুকে কামড়ানোর জন্য সেগুলোকে লেলিয়ে দেয় বখাটেরা। হিংস্র কুকুর কামড়ানোর পর এক পর্যায়ে ছাদের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয় হিমুকে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে সার্জিস্কোপ হাসপাতালের ইউনিট-২ এ ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। ২৭ দিন পর ২৩ মে বুধবার রাতে সেখানে মারা যান হিমাদ্রী মজুমদার হিমু। হিমু হত্যায় নেতৃত্ব দানকারী জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ ঘটনার পরই দেশত্যাগ করে। পুলিশ জানতে পারে, আসামিরা এক সময় হিমুর স্কুলে পড়তেন। বয়সেও তারা সিনিয়র। হিমু ছিলেন প্রতিবাদী। তিনি ওই এলাকাকেন্দ্রিক একটি মাদকবিরোধী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে প্রধান আসামি জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ ও তার সহযোগীরা ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির। মাদকবিরোধী আন্দোলনে জড়িত হওয়ায় রিয়াদ ও তার সহযোগীরা বেশ কয়েকবার হিমু ও তার সহপাঠীদের হুমকি দেন। এসব হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে ঘটনার এক বছর আগে থানায় বেশ কয়েক দফা জিডিও করেন হিমু ও সহপাঠীরা। এ নিয়ে হিমুদের সঙ্গে রিয়াদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। জানা যায়, বিরোধের সূত্র ধরে রাউজানে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলে হিমুকে শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন রিয়াদসহ আসামিরা। এতে হিমুর কয়েকজন সহপাঠীকে ব্যবহার করা হয়। তাদের দিয়েই তারা কৌশলে হিমুকে ডেকে পাঠান। ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল তারা হিমুকে রিয়াদের বাড়ির পাশে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের সামনে আসতে বলেন। হিমু সেখানে পৌঁছতেই তাকে রিয়াদ, ড্যানি, শাওন ও সাজু জোর করে ওই বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তার ওপর চালানো হয় নারকীয় নির্যাতন। পুলিশ জানতে পারে, আসামিরা এক সময় হিমুর স্কুলে পড়তেন। বয়সেও তারা সিনিয়র। হিমু ছিলেন প্রতিবাদী। তিনি ওই এলাকাকেন্দ্রিক একটি মাদকবিরোধী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে প্রধান আসামি জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ ও তার সহযোগীরা ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির। মাদকবিরোধী আন্দোলনে জড়িত হওয়ায় রিয়াদ ও তার সহযোগীরা বেশ কয়েকবার হিমু ও তার সহপাঠীদের হুমকি দেন। এসব হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে ঘটনার এক বছর আগে থানায় বেশ কয়েক দফা জিডিও করেন হিমু ও সহপাঠীরা। এ নিয়ে হিমুদের সঙ্গে রিয়াদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। জানা যায়, বিরোধের সূত্র ধরে রাউজানে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলে হিমুকে শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন রিয়াদসহ আসামিরা। এতে হিমুর কয়েকজন সহপাঠীকে ব্যবহার করা হয়। তাদের দিয়েই তারা কৌশলে হিমুকে ডেকে পাঠান। তারা হিমুকে রিয়াদের বাড়ির পাশে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের সামনে আসতে বলেন। হিমু সেখানে পৌঁছতেই তাকে রিয়াদ, ড্যানি, শাওন ও সাজু জোর করে ওই বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তার ওপর চালানো হয় নারকীয় নির্যাতন।