শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ মে, ২০২১ ২৩:৪৯

বড়ই দুঃসময় মণিপুরি শাড়ির

করোনায় তাঁত বন্ধ, কষ্টে আছে তাঁতিরা

শাহ্ দিদার আলম নবেল, সিলেট

বড়ই দুঃসময় মণিপুরি শাড়ির

একসময় মণিপুরি সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে ছিল তাঁত। কেউ মাটিতে বসে কোমর তাঁতে বুনতেন কাপড়, কেউ চেয়ারে বসে সেমি তাঁতে। সকাল থেকে বিকাল অবধি তাঁত ঘিরেই ছিল মণিপুরি নারীদের ব্যস্ততা। রঙিন সুতোর নিপুণ কারুকাজে রঙিন ছিল প্রতিটি পরিবার। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, সুতার মূল্যবৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া ও নকল কাপড়ের আধিপত্যে থমকে গেছে মণিপুরি আদিবাসীদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের চাকা। এত সংকটের মধ্যেও কমেনি ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি শাড়ির চাহিদা। বরং রুচিশীল শৌখিন নারীদের কাছে মণিপুরি শাড়ির চাহিদা বেড়েই চলেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বিরাজমান সমস্যাগুলো দূর করা গেলে আবারও ফিরবে মণিপুরি তাঁতশিল্পের সোনালি অতীত- এমন আশাবাদ এ সম্প্রদায়ের লোকজনের।

সিলেট মহানগরের শিবগঞ্জ আদিত্যপাড়া, দেবপাড়া, সেনপাড়া, আম্বরখানা, বড় বাজার, কুশিঘাট, সাগরদিঘির পাড়, নরসিংটিলা, খাদিম, লামা বাজার, লালাদিঘির পাড়, কেওয়াপাড়া ও সুবিদবাজার এলাকায় মণিপুরি সম্প্রদায়ের বাস। একসময় মণিপুরিদের ঘরে ঘরে ছিল তাঁত। নিজেদের প্রয়োজনীয় কাপড় তারা ঘরে তৈরি করতেন। বাণিজ্যিকভাবে  উৎপাদন করতেন শাড়ি, গামছা, ওড়না, মাফলার, থ্রিপিস, বিছানার চাদরসহ নানা জাতের কাপড়। সিলেটে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে মণিপুরি কাপড়ের ব্যাপক কদর ছিল। দোকানের পাশাপাশি অনেক পর্যটক তাঁতশিল্পীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কিনতেন পছন্দের কাপড়। এভাবে দিন দিন বাড়তে থাকে মণিপুরি কাপড়ের চাহিদা। বাড়তে থাকে খ্যাতি। এ সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের ও মেশিনে তৈরি কাপড় মণিপুরি বলে বাজারে ছাড়ে। ধীরে ধীরে ভেজাল মণিপুরি কাপড়ে সয়লাব হয় বাজার। ক্রেতারাও মণিপুরি মনে করে মেশিনের তৈরি ও নিম্নমানের কাপড় কিনে প্রতারিত হতে থাকেন। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একসময় অনেকেই ছেড়ে দেন ঐতিহ্য পরম্পরার পেশা।

মণিপুরি তাঁতশিল্প রক্ষায় ২০১১ সালে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ উদ্যোগ। মণিপুরি যুব সমিতির সহযোগিতায় উদ্যোগ নেওয়া হয় প্রশিক্ষণের। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬০০ মণিপুরি নারীকে বয়ন, রংকরণ, নকশা ও প্রিন্টিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মণিপুরি তাঁতশিল্পে জড়িতদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ভেজাল কাপড়ে বাজার সয়লাব হলেও রুচিশীল নারীদের কাছে মণিপুরি শাড়ির চাহিদা কমেনি। যে কোনো উৎসব এলেই বেড়ে যায় মণিপুরি শাড়ির চাহিদা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা এসে যাচাই করে কাপড় কিনে নিয়ে যান। অনেকে অগ্রিম অর্ডার দিয়ে যান। যে কোনো অনুষ্ঠানে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে নারীরা মণিপুরি কাপড় বেছে নেন। ফলে নীরবে চাহিদা বেড়ে চলেছে মণিপুরি শাড়ির। সিলেটে মণিপুরি তাঁতশিল্প নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন লক্ষীকান্ত সিংহ। তাঁতসংশ্লিষ্ট মণিপুরি নারীদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রসারে গড়েছেন ‘মোইরাং’ নামের প্রতিষ্ঠান। মণিপুরি তাঁতশিল্পের সৃষ্টি ভারতের মণিপুর রাজ্যের মোইরাংয়ে। মণিপুরি কাপড়ের পাড়ে ক্রিকোণ আকৃতির যে চিত্রটি দেখা যায় তাকেও বলা হয় মোইরাং। তাই ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে তাঁর প্রতিষ্ঠানটির নাম দিয়েছেন ‘মোইরাং’। তিনি জানান, বাজারে ভেজাল কাপড়, সুতার দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের তুলনায় মণিপুরি কাপড়ের দাম বৃদ্ধি না পাওয়া ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মণিপুরি তাঁতশিল্প বিকশিত হচ্ছে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া গেলে এ শিল্পের সোনালি অতীত ফিরে আসবে বলেও মনে করেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর