শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ জুন, ২০২১ ২৩:৩৯

নারী পাচারে সক্রিয় ২০০ চক্র

১০ লাখের বেশি নারী ও শিশু বিদেশে পাচার হয়েছে, ৪ লাখ নারীকে ভারতে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়

মাহবুব মমতাজী

Google News

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডেরা দুবাই, বার দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, ফুজাইরা ও রাস আল খাইমায় অন্তত ৪০-৪৫টি ড্যান্স বার রয়েছে। বাঙালিরাই এসব বারের মালিক। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া তরুণীদের এসব বারে কাজ করতে নেওয়া হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি ভারতের মুম্বাই এবং বেঙ্গালুরুতে বিভিন্ন হোটেল আর ড্যান্স পার্টিগুলোতেও একইভাবে তরুণীদের নানা কাজে ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত কয়েক বছরে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর ড্যান্স ক্লাব কিংবা ড্যান্স স্কুলের আড়ালে থাকা পাচারকারী চক্রের হাত হয়ে ওইসব দেশে গেছে তরুণীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার নামে তরুণীদের পাচারে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ২০০ সংঘবদ্ধ চক্র। আর তাদের জাল ছড়িয়ে রয়েছে সারা দেশে। তাদের প্রধান লক্ষ্য নিম্নবিত্ত পরিবারের তরুণীরা। তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সেখানে নিয়ে যৌন পেশায়ও বাধ্য করা হচ্ছে। সিআইডির তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব চক্রের অনেকে রাজধানী, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুরের সালনা ও শ্রীপুর এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন নাচের স্কুল (ড্যান্স স্কুল) খুলে এই নারী পাচারে যুক্ত রয়েছেন। তারা একেকজন তরুণীকে বিদেশ যেতে রাজি করানো বাবদ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পান বিদেশে থাকা মূল চক্রের কাছ থেকে। ভারতে পাঠানোর সময় বৈধ ও অবৈধ পথ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দুবাইয়ের ক্ষেত্রে তরুণীদের মূলত তিন মাসের পর্যটক ভিসায় পাঠানো হয়। তরুণীদের সংগ্রহ, পাসপোর্ট করানো, ভিসা সংগ্রহ, বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার করানো এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত সবখানে এই চক্রের লোক রয়েছে। পাচার নারীদের বেলায় নতুন পাসপোর্ট করানোর ক্ষেত্রে চক্রেরই একটি অংশ অভিভাবক সেজে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে। বিভিন্ন কাজের কথা বলে দেশের বাইরে নেওয়া হলেও এদের অনেককে যৌন পেশায় বাধ্য করানোর অভিযোগ রয়েছে। একশ্রেণির ট্রাভেল এজেন্সিও এই পাচার কাজে জড়িত।  

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফিরে আসাদের কয়েকটি মামলা তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বেশ কয়েকজন তরুণী পালিয়ে দেশে ফেরত এসেছে। যাদের বেশির ভাগের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে, তাদের বয়স ১৬ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। অনেকেই এখন থাকেন বস্তিতে। 

নারায়ণগঞ্জের একটি বস্তি থেকে যাওয়া ১৯ বছরের এক তরুণী জানান, সাত-আট বছর আগে তিন ভাইবোনকে রেখে তার বাবা অন্যত্র বিয়ে করেন। এরপর তাদের মা পোশাক কারখানায় কাজ করে তাদের বড় করেন। মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে পরিবারের হাল ধরতে হয়। তিনি পোশাক কারখানায় কাজ নেন। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলছিল না। তখন বস্তির এক তরুণী তাকে দুবাই যাওয়ার বিষয়টি জানান। ২০১৮ সালের নভেম্বরে অনিক সরকার নামে এক যুবকের মাধ্যমে তিনি প্রথম আরব আমিরাতের ড্যান্স ক্লাবে যান। তিন মাস থেকে ফিরে আসেন। এরপর এই বছরের মাঝামাঝি আরেকবার গিয়েছিলেন। নাচের কথা বলে নেওয়া হলেও একপর্যায়ে যৌন পেশায় বাধ্য করা হয়। ঢাকার একটি বস্তিতে বাস করা ১৮ বছর বয়সী আরেক তরুণী জানান, প্রেম করে পছন্দের এক যুবককে তিনি বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর তার পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিতে শুরু করেন সেই ছেলে। একপর্যায়ে স্বামী বিদেশ চলে যান। তাকে চলার জন্য কোনো টাকা দেন না। নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কাজের সন্ধানে ছিলেন। তখন পাড়ার এক মেয়ে তাকে দুবাইয়ে কাজের কথা বলেন। পরিচয় করিয়ে দেন দুবাইয়ে থাকা মহিউদ্দিন নামে এক যুবকের সঙ্গে। তার মাধ্যমে তিনি দুবাই যান। পরে তাকেও যৌন পেশায় বাধ্য করা হয়। ভারত ও দুবাই থেকে ফিরে আসা তরুণীদের ভাষ্যমতে, ড্যান্স বারে কাজ করে ফিরে আসা তরুণীরা পরে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন ভালো উপার্জনের আশ্বাস দিয়ে। এরপর তাদের এজেন্ট বা চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। এ জন্য মাথাপিছু কমিশন পান। তাদের কথার সূত্র ধরে সিআইডি কর্মকর্তারা অভিযুক্ত পাচারকারী অনিক সরকারের খোঁজখবর নেন। ওই যুবকের বাড়ি ময়মনসিংহে। লেখাপড়া করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে নাচ শেখেন। এক সময় দুবাই যান। সেখান থেকে ফিরে এসে নিজেই ঢাকায় নাচের প্রতিষ্ঠান খোলেন। নৃত্য শেখানোর নাম করে অনিক দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণীদের দেশের বাইরে পাঠাচ্ছেন। তার চলাফেরাও বেশ বিলাসী। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন এ বিষয়ে বলেন, মানব পাচার ব্যবসাটি আদিম যুগ থেকে এখনো চলছে। এটি অতি লাভজনক হওয়ায় একটি চক্র এগুলো করে যাচ্ছে। নানা কৌশল ব্যবহার করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারী পাচার হচ্ছে। তবে ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিদের নাগালের বাইরে থেকে এ কাজ করা সম্ভব নয়।

ওদের খবর নেই : গত ১৬ বছরে পাচার হওয়া ২ হাজার ৬১৪ জনের খোঁজ এখনো মেলেনি। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক পুরুষও আছেন। তবে বেশির ভাগই নারী ও শিশু। রিয়া (ছদ্মনাম) নামে এক তরুণীর ঘটনা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে- রিয়া ও তার এক বান্ধবী নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লায় একটি টেইলারিং দোকানে কাজ করতেন। সেখানে একজন নারীর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। ওই নারী তাদের ভালো বেতনে ভারতে টেইলারিংয়ের কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। সেই প্রলোভনে পড়ে ওই দুই তরুণী গত ২০ জানুয়ারি সাতক্ষীরা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যান। এরপর তাদের মুম্বাইয়ে পাঠানো হয়। সেই থেকে তাদের আজও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় ওই দুই তরুণীর স্বজনরা গত ২৩ মার্চ নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা করেন। বিভিন্ন সময়ে পাচার হওয়া অন্তত ১৫ জনের তথ্য রয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, মামলা হওয়ার পর ৬/৭ জনকে তারা উদ্ধার করতে পেরেছেন। যারা ভারতের হায়দরাবাদে অবস্থিত প্রাজওয়ালা নামে একটি সেফহোমে রয়েছেন। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০০৪ সালের ১৫ জুন থেকে চলতি বছরের গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১২ হাজার ৩২৪ জন পাচার হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৭১০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১৬৪ জন পাচার হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ১১৪ জন। এসব পাচারের ঘটনায় অভিযুক্তের সংখ্যা ২৭ হাজার ৩৬৩ জন। এর মধ্যে গ্রেফতার কিংবা আদালতে আত্মসমর্পণ করেছে ১২ হাজার ২৮০ জন। শুধু চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত অভিযুক্ত করা হয় ৮৩৯ জনকে এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ৪৯৫ জনকে। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মানব পাচারের মোট সংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি নারী ও শিশু। যাদের যৌন কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই পাচার করা হয়। সীমান্ত পার করার পর বেশির ভাগ নারীকে মুম্বাই পাঠানো হয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পাচার হওয়া ১২ জন নারী এবং ৭ শিশুকে উদ্ধার করেছে বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া ২৩ জন পুরুষও উদ্ধার হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৭টি। সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের সভাপতি অধ্যাপক ইসরাত শামীম এ প্রতিবেদককে জানান, এখন আর ফুঁসলিয়ে পাচারের ঘটনা খুব কম। এখন পাচার হয় মাইগ্রেন্টের মাধ্যমে। অনলাইনেও পাচার হচ্ছে। অনলাইনে ছবি পাঠিয়ে, ভিডিও তৈরি করে কিংবা পর্নো ছবি তৈরি করে পাচারের সংখ্যা এখন বেশি। যখন ভুক্তভোগী ফেরত আসে তখনই জানা যায় সে পাচারের শিকার হয়েছিল। তার আগে তার অবস্থা সম্পর্কে জানা যায় না। ফেরত না আসা বেশির ভাগই নিখোঁজ অবস্থায় থাকে। আগে তো স্বজনরাও কোনো অভিযোগ করত না, এখন কিছু কিছু অভিভাবক অভিযোগ করে। সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের তথ্যানুসারে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ লাখের বেশি নারী ও শিশু বিদেশে পাচার হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ লাখ নারীকে ভারতে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। পাকিস্তানে একই পেশায় নিযুক্ত রয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি নারী। এ ছাড়াও পাচারকৃত নারীদের ধনী ব্যক্তিদের রক্ষিতা, অশ্লীল ছবি তৈরিতে ব্যবহার, বাসাবাড়ি ও কলকারখানায় লাভজনক শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার, শিশুদের বিকলাঙ্গ/অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃতির মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার ও নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে চড়া মূল্যে হস্তান্তর এবং মাদক চোরাচালান ও অন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয়। জাতিসংঘের গ্লোবাল রিপোর্ট অন ট্রাফিকিং ইন পারসন্স-২০২০ থেকে জানা যায়- ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়া। আর এই দক্ষিণ এশিয়ায় পাচার হওয়া পুরুষের হার ১২ শতাংশ এবং ৮৮ শতাংশ নারী। নারীদের মধ্যে প্রাপ্ত বয়স্ক ৮৭ শতাংশ, শিশু ১২ শতাংশ এবং বয়স না জানা ১ শতাংশ।

 

বছরওয়ারি পাচারের পরিসংখ্যান : পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ১৫ জুন থেকে ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ১২৮ জন পাচার হয়েছেন। উদ্ধার হয়েছেন ৯০৭ জন। ২০০৯ সালে পাচার হয়েছেন ১৩১ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৭৩ জন। ২০১০ সালে পাচার হয়েছেন ১৬৪ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ১০৩ জন। ২০১১ সালে পাচার হয়েছেন ১৮১ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৯৮ জন। ২০১২ সালে পাচার হয়েছেন ৫৭৩ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৫০১ জন। ২০১৩ সালে পাচার হয়েছেন ১ হাজার ৩৫৩ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ১ হাজার ১২৫ জন। ২০১৪ সালে পাচার হয়েছেন ২ হাজার ৮৯৯ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ২ হাজার ৬২১ জন। ২০১৫ সালে পাচার হয়েছেন ১ হাজার ৮১৫ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ১ হাজার ৩০৬ জন। ২০১৬ সালে পাচার হয়েছেন ৭৭০ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৫২৩ জন। ২০১৭ সালে পাচার হয়েছেন ৭৭০ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৫৪৬ জন। ২০১৮ সালে পাচার হয়েছেন ৫০২ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৩৫৫ জন। ২০১৯ সালে পাচার হয়েছেন ১ হাজার ১৬ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৯০৪ জন। ২০২০ সালে পাচার হয়েছেন ৮৫৮ জন এবং উদ্ধার হয়েছেন ৫৩৪ জন।