শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

যে গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষই ভুগছেন জ্বরে

মাহবুবুল হক পোলেন, মেহেরপুর

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গড়াডোব গ্রামে গত এক মাসে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে পাঁচজন করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। বাকিদের কারও করোনা পরীক্ষা করানো হয়নি। তবে সবাই করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। গতকাল সরেজমিনে গড়াডোব গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহৎ এ গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষই জ্বর, ঠান্ডা ও কাশিতে ভুগছেন। স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই এখানে। দেখা গেছে, প্রধান সড়কে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও সড়ক ছেড়ে কয়েক শ গজ ভিতরে দোকানে দোকানে চলছে রমরমা চায়ের আড্ডা। কেউ মাস্ক পরেননি। ঠাসাঠাসি করে বসে আড্ডায় মত্ত। স্বাস্থ্যবিধি কী তা এ গ্রামের কেউ জানেন না বললেই চলে।

কেন গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেননি, সে প্রশ্নে প্রায় সবারই এক কথা- ‘কেউ তাদের এসব বিষয়ে বোঝাতে আসেনি’। মাস্ক কেন পরতে হবে তা-ও তাদের জানানো হয়নি। গ্রামের মানুষ রেডিও-টিভির খবর তেমন একটা শোনেন না। সিনেমা দেখে বা গান শুনে অভ্যস্ত তারা। সে কারণে তারা স্বাস্থ্যবিধির কিছুই জানেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেহেরপুর সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে বাড়ি বাড়ি করোনার বিষয়ে নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রথম দিনই দুপুর থেকে মেডিকেল টিমের খোঁজ থাকেনি। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গড়াডোব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত করোনা টেস্টের মেডিকেল টিমের সন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে কেউ নেই, সুনসান নীরবতা। মেডিকেল টিমের কোনো কর্মীকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে গড়াডোব কমিউনিটি ক্লিনিক ও মেডিকেল টিমের সুপারভাইজার আবদুল হান্নানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আজ প্রথম দিনে ২০ জনের করোনা টেস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন পজিটিভ।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামের মানুষকে করোনা টেস্টের জন্য পাওয়াই যাচ্ছে না। কেউ ক্যাম্পের মুখোমুখি হচ্ছেন না।’ তবে তিনি দাবি করেন, ‘আমরা আমাদের প্রচার অব্যাহত রেখেছি।’

গাংনী ধানখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখেরুজ্জামান বলেন, ‘গড়াডোব গ্রামে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ গ্রামে ঘরে ঘরে ঠান্ডা, জ্বর, সর্দি-কাশি রয়েছে। এজন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। না হলে এ গ্রাম থেকে পুরো জেলায় করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে।’

গ্রামের বাসিন্দা একরামুল হক বলেন, ‘এ গ্রামে প্রায় ১২ হাজার লোকের বাস। এখানে মানা হচ্ছে না কোনো স্বাস্থ্যবিধি। প্রশাসন প্রধান সড়কে টহল জোরদার করলেও গ্রামের ভিতরের চিত্র ভিন্ন। ভিতরে কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন দোকানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে আড্ডা। বেশির ভাগ লোকের ঠান্ডা কাশি লেগে থাকলেও নমুনা পরীক্ষা করানোর কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণেও কোনো প্রচার নেই।’

এসব বিষয়ে গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমি খানম বলেন, ‘শুধু গড়াডোব গ্রাম নয়, সমগ্র গাংনীতে করোনা প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। লকডাউন বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কাজ করছে। করোনা আক্রান্ত অসহায় পরিবারের বাড়িতে খাদ্যও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে আমরা জনগণের অসচেতনতার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছি। বাংলাদেশর অন্যান্য জেলার মতো এখানকার মানুষও কথা শুনছেন না, সচেতন হচ্ছেন না।’

সিভিল সার্জন ডা. নাসীর উদ্দিন বলেন, ‘এলাকার মানুষ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আমরা জেনেছি গড়াডোব গ্রামে করোনার বড় প্রকোপ চলছে। প্রায় ঘরে ঘরে করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তি রয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘গ্রামবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রচার চালানো হচ্ছে। টিকা গ্রহণের ব্যাপারে তাদের উৎসাহিত করতেও ব্যাপক প্রচার চালানো হবে।’

জেলা প্রশাসক মনসুর আলম খান বলেন, ‘একটি গ্রামে এক মাসে এত মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি অস্বাভাবিক। এ গ্রামে বিশেষ নজরদারির জন্য উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’