শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২৩:০৬

ঝড়বৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের আট স্টেটে ৬১ মৃত্যু

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিরাও

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি

ঝড়বৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের আট স্টেটে ৬১ মৃত্যু
Google News

হারিকেন আইডার তান্ডবে লুইজিয়ানা-মিসিসিপির পর বড় ধরনের ধাক্কা খেল নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের আট স্টেট। এসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আচমকা ঝড় আর প্রবল বর্ষণে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৬১ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে এবিসি নিউজ। উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত সংস্থাসমূহ বলছে, মৃত্যুর বড় সংখ্যাই নিউজার্সি স্টেটের। নিউইয়র্ক সিটিতে ১৩ জনসহ এই স্টেটে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে দুই বছর বয়সী একটি শিশুসহ। প্রাকৃতিক এই ভয়ংকর দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ক্ষতির শিকার হলেও মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে কেউ নেই বলে কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আইডার আঘাতে নিহতদের স্বজনের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে  উঠতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। গতকাল হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়ংকর অবস্থার কথা বিজ্ঞানীরা বলে আসছেন, এটা তারই প্রভাব। সুতরাং আমাদের সেভাবেই পদক্ষেপ নিতে হবে। বাইডেন বলেন, আমি নিউইয়র্ক, নিউজার্সির গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছি।  নিশ্চিত করেছি যে, ফেমার লোকজন মাঠে রয়েছেন। সবকিছু তদারকি করছেন। বিপদগ্রস্তদের পাশে রয়েছেন। নিউইয়র্কের স্টেট গভর্নর ক্যাথি হকোলও ইউএস সিনেটের লিডার সিনেটর চাক শ্যুমার, কংগ্রেসে পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্স, নিউইয়র্ক সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়োকে পাশে নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভয়ংকর এই আচমকা দুর্যোগে ক্ষতবিক্ষত কমিউনিটিকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রশাসন সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা পাবেন ক্ষতিপূরণ। গভর্নর ও সিটি মেয়র বলেছেন, ক্ষতির বিবরণ তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাঠে নেমেছে।

নিউজার্সির স্টেট গভর্নর ফিল মারফিও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন নিহতদের জন্য এবং তিনি বলেছেন, বেশ কিছু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের হদিস উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, পেনসিলভেনিয়াসহ আশপাশের সড়ক-মহাসড়কে পানিতে ডুবে বিকল হওয়া গাড়ি অপসারণের পর বৃহস্পতিবার রাতে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

আচমকা বর্ষণে ঘণ্টায় কোনো কোনো স্থানে ৭ ইঞ্চি পর্যন্ত পানি জমেছিল। রাস্তাগুলো পরিণত হয় বানের পানির স্রোতের মতো। প্রবল বেগে প্রবাহিত পানিতে ভেসে যায় অনেক গাড়ি। মৃতদের অধিকাংশই বেসমেন্টে আটকে পড়েছিলেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। দমকল বাহিনীর কর্মীরা বেসমেন্ট থেকে লাশ উদ্ধার করেছেন। রাত ৯টার পর নিউইয়র্ক সিটি ও এর আশপাশে বৃষ্টি শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সবকিছু সয়লাব হয়ে পড়েছিল। সে সময়েই ভূমির সমান্তরাল অবস্থায় থাকা বেসমেন্টের প্রবেশ পথে পানি ঢুকে পড়েছে প্রবল বেগে। স্বল্প সময়েই ভিতর থেকে দরজা খোলার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায় পানির ধাক্কায়। সিটিসমূহের পদস্থ কর্মকর্তা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ব্রিফিংকালে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, বেসমেন্টে মানুষ ঘুমাতে পারেন না। বিশেষ করে শিশুদের রাত কাটানোর কোনো সুযোগই নেই। তবুও কীভাবে তারা বেসমেন্টে বসবাস করছিলেন। এ ব্যাপারে প্রতিটি সিটি ও স্টেটের পক্ষ থেকে সাঁড়াশি অভিযানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো সিটি মেয়র বলেছেন, বেসমেন্টকে বসবাসের আইনি প্রক্রিয়ায় আনা দরকার। তাহলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে না। কারণ, সবাই বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টের অনুমতি নিয়ে বেসমেন্টকেও বসবাসের নিরাপদ স্থানে পরিণত করবেন। 

বর্ষণে ভেসে যাওয়া এক ব্যক্তিকে খুঁজতে গিয়ে কানেকটিকাট স্টেটের মহাসড়ক-টহলের পুলিশ অফিসারও পানিতে ভেসে গিয়ে মারা গেছেন।

নিউজার্সি, নিউইয়র্ক, দেলওয়ারে, ফিলাডেলফিয়া সিটির রেল, বাস, গণপরিবহন স্বাভাবিক অবস্থায় চলাচল শুরু করতে পারেনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নাগাদ। স্থানীয় প্রশাসন এবং কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও (যেগুলোর ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল) বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক কর্মকর্তাকে ঘরে বসেই কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পেনসিলভেনিয়া স্টেটের ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট ডিরেক্টর র‌্যান্ডি প্যাডফিল্ড বলেছেন, সর্বত্র ব্যাপক ক্ষতির আলামত দেখছি।

নিউইয়র্ক পুলিশের উদ্ধারকারী টিমের প্রধান রোডনি হ্যারিসন বলেন, পাতাল ট্রেনে আটকা পড়া ৮৩৫ যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে অক্ষত অবস্থায়। রেল চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা। পানিতে আটকা পড়া অনেক লোকজনকে উদ্ধারের পর আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কুইন্সে ফ্লাশিং টেনিস কোর্টে। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হকোল বলেছেন, তিনি প্রতিটি নাগরিককে প্রতিবেশীর খোঁজ নিতে বলেছেন। কেউ যদি পানিতে আটকে থাকেন, তাহলে যেন স্থানীয় প্রশাসন অথবা ৯১১-এ ফোন করা হয়।

নিউইয়র্ক স্টেট, নিউইয়র্ক সিটি এবং নিউজার্সি স্টেটে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং ইতিহাসে এই প্রথম বৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি অবস্থা জারির ঘটনা ঘটল। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গত ৫০০ বছরেও এমন বর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে, নিউইয়র্ক সিটিতে মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে ৮ জনই কুইন্সের বিভিন্ন বাসায় বেসমেন্টে আটকা পড়েছিল বলে পুলিশ কমিশনার ডারমোট শিয়া জানান। অপর তিনজনের মৃত্যু হয়েছে সিটি সংলগ্ন ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টিতে পানিতে গাড়ি ভেসে যাওয়ায়।

নিউজার্সির স্টেট কর্তৃপক্ষ জানায়, মৃত্যুবরণকারী ২৩ জনের মধ্যে এলিজাবেথ সিটিতে একটি অ্যাপার্টমেন্টের চারজন রয়েছেন। এলিজাবেথ নদীর তীরে অবস্থিত অ্যাপার্টমেন্টটি পানিতে ডুবে গিয়েছিল বলে এই সিটির মেয়র ক্রিস বলোওয়েজ গণমাধ্যমকে অবহিত করেছেন। প্যাসেইক সিটির মেয়র ডন লেমন বলেছেন, ৭০ বছরের এক ব্যক্তি বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানোর সময় সেটি ভেসে যায়। পেনসিলভেনিয়া স্টেটের মন্টগোমারি কাউন্টি বোর্ড অব কমিশনারের চেয়ার ড. ভ্যাল আরকোশ বলেন, এ এলাকায় ঝড়বৃষ্টির সময় তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিকটস্থ ব্রিজপোর্ট সিটির ম্যানেজার কিথ এস ট্রুম্যান বলেছেন, বন্যার পানিতে ভেসে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

ম্যারিল্যান্ড স্টেটের মন্টগোমারি কাউন্টির ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ। প্লাবিত একটি অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। ভার্জিনিয়া স্টেটের বুচানন কাউন্টি শেরিফের পক্ষ থেকে হিউরলির গ্যাসেস ফোর্ক এলাকায় পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের খবর জানানো হয়েছে।