শিরোনাম
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল, ২০২১ ১৮:০৫
প্রিন্ট করুন printer

আইনগত সহায়তা করুণা নয়, বরং অধিকার

জসিম উদ্দিন

আইনগত সহায়তা করুণা নয়, বরং অধিকার
জসিম উদ্দিন

আজ জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস। সরকারি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। ২৮ এপ্রিলকে দিবসের জন্য বেছে নেয়ার কারণ হলো ‘‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০” এ দিনে কার্যকর হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বহু দেশে আইনগত সহায়তা দিবস উদযাপিত হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে 
'Law Day' এবং Legal Services Day- দুটিই উদযাপিত হয়। আইনগত সহায়তা বিষয়ে জনমত তৈরি করাই শুধু নয়, আইনি বিষয়াদি বিশেষত: আইনি সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে এরূপ দিবস উদযাপন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩৩ নং অনুচ্ছেদে আইন সহায়তা ব্যবস্থার মূল চেতনা পরিস্ফুট হলেও কাঠামোগতভাবে বাংলাদেশে আইনগত সহায়তার ধ্যান-ধারণা একেবারেই নতুন। পদ্ধতিগত বিভিন্ন আইন যেমন, দেওয়ানী ও ফৌজদারি কার্যবিধিতে আইনগত সহায়তার কথা বলা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অভাবে এটি বেশ আগেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের উপর বৈষম্য মেনে নিতে পারে না। 

আর্থিক অভাবের কারণে কেউ আইনের আশ্রয় নিতে পারবে না-এটি কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না। এ কারণে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন প্রণয়ন করে, যা সময়ে সময়ে সংশোধিত হয়ে ক্রমেই একটি কার্যকর, গতিশীল ও সেবা মূলক আইনে পরিণত হয়েছে। এ আইনের আওতায় বর্তমানে সুপ্রীম কোর্টসহ জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। 

সরকারি ব্যবস্থাপনায় দরিদ্র মানুষকে আইনি সেবা দেয়া রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য মূলনীতি হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(১) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে।” 

খ্যাতিমান রাষ্ট্রনায়ক আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন ২০০ বছর পূর্বেই বলে গেছেন, “The first duty of society is justice”. মূলত: সমাজ তথা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। যেখানেই ন্যায়বিচার, সেখানেই সমতার প্রশ্ন চলে আসে। ন্যায়বিচার ও সমতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিচারাঙ্গনে সমতা নিশ্চিত করতে আইন সহায়তা ব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আইন সহায়তার মাধ্যমে নিঃস্ব ও দরিদ্র মানুষ বিচারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে ধনিক শ্রেণির সমান অবস্থানে আসার সুযোগ পায়। 

সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সমতল ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো সমাজের দরিদ্র, নিঃস্ব ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারসমূহের নিশ্চয়তা বিধান করা। সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে একমাত্র আইন আদালতের মাধ্যমেই মানুষ তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু দারিদ্রতা কিংবা অর্থের অভাবে কেউ যদি তার বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারে অথবা আইনের আশ্রয় লাভ করতে না পারে, তবে তার অন্য সব মৌলিক অধিকারগুলোও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আর্থিক দৈন্যতার কারণে কেউ যাতে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্যই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত আইন সহায়তা ব্যবস্থার উদ্ভব। 

বাংলাদেশে জনকল্যাণমূলক বহু আইন বা প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে মানুষ এর সুফল পাচ্ছে না। কিন্তু সরকারি সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এটি সারা দেশে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থার অধীন ‘জেলা লিগ্যাল এইড অফিস’ কে ঘিরে বিচারপ্রার্থী মানুষের মাঝে যে আকাঙ্খা ও কর্মচাঞ্চল্য তৈরী হয়েছে তা পূরণ করা এখন সংস্থার অন্যতম অগ্রাধিকার। দ্রুততম সময়ে মানসম্মত আইনি সেবা নিশ্চিত করা সরকারি আইন সহায়তা ব্যবস্থার জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি আইনের সংশোধন ও নতুন নতুন নীতিমালা, বিধিমালা ইত্যাদি প্রণয়নের মাধ্যমে আইন সহায়তা কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়েছে। আইনগত সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকেও সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। শুধু বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিই নয়, আইনগত শিক্ষা বিস্তার, আইনগত তথ্য সহজলভ্যকরণ, আইনগত মৌলিক ধারণালব্ধ জনগোষ্ঠীর হার বৃদ্ধি করা এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচারে সহজ অভিগম্যতা নিশ্চিত করা সংস্থার কার্যপরিধিভূক্ত কর্মসূচি হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। 

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস একটি শক্তিশালী ভ‚মিকা পালন করতে পারে। মূলত: বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যতীত বিচার বিভাগে চলমান মামলাজট নিরসন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৮ লাখ মামলা বিচারাধীন আছে। প্রায় প্রতিবছরই দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা নিষ্পত্তিকৃত মামলার চেয়ে গড়ে অন্তত: ২/৩ লাখ বেশি থাকে। অর্থাৎ প্রতি বছরই বিচারাধীন মামলার তালিকায় যোগ হচ্ছে লক্ষাধিক নতুন মামলা। অথচ পূর্বের মামলাই নিষ্পত্তি করতে বিচার বিভাগ কে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আর এসব কিছুরই অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বিচারাঙ্গনে তৈরি হচ্ছে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং ভয়াবহ মামলাজট। মামলার বিচার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থায় বর্তমানে প্রচলিত সেকেলে ধারা হতে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, সমতা - সব কিছুই হুমকির মুখে পড়বে।  

ন্যায়বিচার কখনো বিলম্বিত হতে পারে না। বিলম্বিত বিচার মূলত: বিচার অস্বীকারের শামিল। রাশিয়ান কবি Yevgeny Yevthushenko বলেছেন, “Justice is like a train that is nearly always late”. কিন্তু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এতটাই বিলম্বিত যে, পিতামহ কর্তৃক দায়েরকৃত মামলা তার এবং তার পুত্রের সময়কালকে নিঃশেষিত করে নাতির জীবদ্দশায় নিষ্পত্তি হচ্ছে। একটি দেওয়ানি মামলার ভার তিন পুরুষ ধরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এমনকি মামলা চালানোর মোট ব্যয়, বহুক্ষেত্রে মামলার মোট মূল্যমানকেও অতিক্রম করছে। বছরের পর বছর মামলার গ্লানি টানতে গিয়ে মামলার পক্ষগণ একদিকে নিঃস্ব হচ্ছে, অন্যদিকে বিচার বিভাগের প্রতি এসব মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। 

কয়েক বছর পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি ওয়ারেন বার্জার ওয়ার্ল্ডনেটের সাথে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছেন, “সম্ভাব্য ন্যূনতম ব্যয়ে, ন্যূনতম সময়ে এবং পক্ষদের উপর সামান্য চাপ রেখে ন্যায়বিচার সাধন করাই হবে বিচার বিভাগীয় পদ্ধতির কাজ”। চর্তুদিক থেকে স্রোতের মতো আসা মামলার লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে। একই সাথে ছোট খাটো ও আপোষযোগ্য বিরোধসমূহ আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। এতে মানুষের মধ্যে সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। মামলার পক্ষগণের অর্থ ও সময়-দু’টিরই সাশ্রয় হবে। 

আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তিকৃত সমাধানে কোনো পক্ষই হারে না, বরং উভয়পক্ষই জিতে। এ কারণে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসকে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে ব্যবহারের যে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। লিগ্যাল এইড অফিসকে ঘিরে একটি কার্যকর ও টেকসই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্র আরও উদ্যোগী হবে এবং এর দ্বারা সত্যিকার অর্থেই বিচারপ্রার্থী মানুষ উপকৃত হবে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা। 

লেখক: যুগ্ম জেলা জজ (বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আইন কর্মকর্তা পদে প্রেষণে কর্মরত)।

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত

এই বিভাগের আরও খবর