শিরোনাম
প্রকাশ : ৯ এপ্রিল, ২০২১ ১০:৫১
প্রিন্ট করুন printer

মা-বাবা-বোন-নানীর পাশে ঠাঁই হলো না দু’ভাইয়ের

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র

মা-বাবা-বোন-নানীর পাশে ঠাঁই হলো না দু’ভাইয়ের

মা-বাবা-বোন আর নানীর পাশে কবর হলো না ঘাতক দুই পুত্রের। পরিকল্পনা অনুযায়ী পাশাপাশি চারটি কবর খোড়ার পর পঞ্চম এবং ষষ্ঠ কবর খোড়ার সময় পানিতে ভরে যায় এ দুটি। শতচেষ্টা করেও পানি সরানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় বেশ কিছু দূরে শুকনা কবরের জায়গা খুঁজে সেখানেই দাফন করা হয় তানভির তৌহিদ (২১) এবং তার ছোট ভাই ফারহান তৌহিদ (১৯)কে। 

টেক্সাস স্টেটের ডালাস সিটি সংলগ্ন এলেন সিটির অদূরে ডেন্টন মুসলিম গোরস্থানে ৮ এপ্রিল বৃহস্প্রতিবার অপরাহ্নে একই পরিবারের ৬ জনের দাফন উপলক্ষে দু’সহস্রাধিক শোকার্ত মানুষের আহাজারিতে পুরো এলাকা থমকে দাঁড়ায়। 

উল্লেখ্য, বাংলাদেশি আমেরিকান এই পরিবারের ৬ সদস্যের গুলিবিদ্ধ লাশের হদিস মেলে গত সোমবার ভোররাতে। এলেন সিটির ১৫১৭ পাইন ব্লাফ ড্রাইভের বাসায় তৌহিদুল ইসলাম (৫৪) তার স্ত্রী আইরিন ইসলাম (৫৬), কন্যা পারভিন তৌহিদ (১৯) শাশুড়ি আলফাতুন্নেসা, দুই পুত্র তানভির এবং ফারহানকে নিয়ে বাস করতেন। এদেরই লাশ উদ্ধারের পর ফারহানের ইন্সট্রগ্রামে পোস্টিংয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, মানসিক বিষন্নতায় আক্রান্ত ফারহানের পরামর্শে বড়ভাই তানভির সম্মত হয় পরিবারের সকলকে হত্যার পর নিজেরাও আত্মহত্যা করবেন। তারই পরিণাম গোটা পরিবারের চিরবিদায়। 

এ ব্যাপারে ফারহান তার দীর্ঘ পোস্টিংয়ে উল্লেখ করে যে, আমি যদি আত্মহত্যা করি তাহলে পরিবারের সকলেই সারাটি জীবন কষ্ট পাবেন। তাই সকলেই যদি একত্রে মরে যেতে পারি তাহলে দু:খ পাবার কেউই থাকবে না। ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসক এবং পুলিশ জানিয়েছেন, দু’ভাই মা-বাবা-বোন-নানীকে দু রাউন্ড করে গুলিতে হত্যা করেছে। আর আত্মহত্যায় ব্যবহার করা হয়েছে দু’জনের জন্যে দুই রাউন্ড বুলেট। মোট ১০ বুলেটে ৬টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে এই বাসার ভেতরে। পুরান ঢাকার সন্তান তৌহিদ ডিভি লটারিতে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে এসে কয়েক বছর নিউইয়র্কে কাটিয়ে ৮ বছর আগে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন এলেন সিটিতে। সর্বশেষ পেশায় ছিলেন সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে। দু’পুত্র পড়ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে। একমাত্র কন্যাটি পড়ছিলেন ফুল স্কলারশিপে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে। আমেরিকান স্বপ্ন পূরণে ধির পায়ে এগুচ্ছিলেন তৌহিদ। কিন্তু মাঝপথে থামিয়ে দিল মানসিক বিকারগ্রস্ত দুই পুত্র। গোটা কমিউনিটিতে হতবাক করেছে এই হত্যা ও আত্মহত্যার পরিক্রমা। শোকে স্তব্ধ কমিউনিটির সাথে জানাজা এবং দাফনের সময় শতশত আমেরিকানও এসেছিলেন। এলেন ইসলামিক সেন্টারে ৬ জনের জানাজা শেষে কফিনবাহী গাড়িকে স্কর্ট করে গোরস্থান পর্যন্ত নিয়ে যায় এলেন সিটির পুলিশ। কফিনের মিছিল অনুসরন করছিল দু’হাজার মানুষের হাজারখানেক গাড়ি। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, পুরো একটি এলাকা ধীর লয়ে বিষন্ন চিত্তে অজানার গন্তব্যে এগুচ্ছে। 

চার কবর খোড়ার পর পঞ্চম আর ষষ্ঠ অর্থাৎ ঘাতক দু’ভাইয়ের জন্যে নির্ধারিত কবর খোড়ার সময়েই পানিতে ভরে যাওয়ায় অনেকে নানান মন্তব্য করছিলেন। সে সময় এলেন মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমান বশির পবিত্র কোরআন-হাদিসের আলোকে সকলকে নিবৃত্ত করেন যে, বান্দার মৃত্যু হবার পর সকল দায়িত্ব সৃষ্টিকর্তার। আমাদের কর্তব্য হলো তাদের জন্যে দোয়া করা। এছাড়া, কেউই নিশ্চিত নই যে, তারাই হত্যার পর আত্মহত্যা করেছে। তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তাই ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং মরহুম সকলের জন্যেই দোয়া করতে হবে। 

জানাজার সময় ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ভার্চুয়ালে তৌহিদ পরিবারের নিকটাত্মীয়দের সাথে কথা বলেন রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম। তিনি মৃতদের আত্মার মাগফেরাত এবং শোক-সন্তপ্ত স্বজনের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন। প্রবাসীদের অনুরোধ জানান, পারিবারিক বন্ধন মধুর রাখতে সন্তানের সাথে যেন সকলেই চমৎকার সম্পর্ক অটুট রাখেন। আর কোন পরিবার যেন এমন দু:খজনক পরিস্থিতির শিকার না হন সেজন্য সকলকে সজাগ থাকার বিকল্প নেই। সন্তানের যে কোন সমস্যা-প্রয়োজনকে আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করার উদারতা থাকতে হবে প্রতিটি প্রবাসীর। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রদূতের প্রতিনিধি হিসেবে আগেই সেখানে ছুটে এসেছেন মিনিস্টার (কন্স্যুলার)  হাবিবুর রহমান। তৌহিদের বড়ভাই হায়দার আলী ফ্লোরিডা থেকে এসে জানাজায় শরিক হন। তার সাথে কথা বলে শান্তনা দিয়েছেন হাবিবুর রহমান। 

দাফনের পর কবরে ফুলগাছ লাগানো হয়। অনেকে শেষ বিদায়ের সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। জানাজায় অংশগ্রহণকারি বিশিষ্টজনদের মধ্যে ছিলেন হাশমত মবিন, আদর চৌধুরী, শাহীন হাসান, ওয়ালি রহমান, কামরুল আহসান, মির্জা শহীদ, সাঈদ চৌধুরী হারুন প্রমুখ। তৌহিদ পরিবারের ঘনিষ্ঠ নারীরাও কবরস্থানের সন্নিকটে দাঁড়িয়ে মোনাজাতে অংশ নেন। আর এভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল তৌহিদ পরিবারের নাম-নিশানা। 

এলাকার প্রবীন প্রবাসীরা জানান, অর্ধশত বছরের মধ্যে টেক্সাসে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে এককভাবে আর কোন পরিবারের প্রাণ ঝরেনি। ফলে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ানরাই শুধু নন, আমেরিকানরাও বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সন্তানকে আরো বেশী সময় দেয়ার চেষ্টা করবেন বলে সংকল্পবদ্ধ হয়েছেন। ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় এই পরিবারের সকলের আত্মার শান্তি কামনায় মোমবাতি প্রজ্বলনের কর্মসূচিতেও শতশত আমেরিকান এসেছিলেন। সকলেই গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এলেন সিটির সেলিব্রেশন পার্কে নিহতদের স্মরণে এই ‘মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি’তে সিটি মেয়র ক্যান ফাক-সহ বহু শোকার্ত মানুষের সমাগম ঘটে।  

মানসিক বিকারগ্রস্ত তানভির তৌহিদ এবং তার ছোট ভাই ফারহান তৌহিদ ২ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত রাতে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে তাদের বাবা তৌহিদুল ইসলাম, মা আইরিন ইসলাম, একমাত্র বোন পারভিন তৌহিদ এবং নানী আলফাতুন্নেসাকে গুলি করে হত্যা করে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এলেন সিটির ১৫১৭ পাইন ব্লাফ ড্রাইভের বাসায় দু’ভাই ছাড়া আর কেউ জীবিত ছিলেন না। ময়নাতদন্তকারি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব নর্থ টেক্সাসের সভাপতি হাসমত মোবিন আরো জানান, মা-বাবা-বোন-নানীর জন্যে দুটি করে মোট ৮টি বুলেট ব্যবহার করা হয়। এরপর দুটি বুলেট ব্যবহার করা হয় দু’ভাইয়ের আত্মহত্যার জন্যে।  

এর আগে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে হাসিব বিন রাব্বি কর্তৃক তার মা-বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তারপর কানাডার টরন্টোতে মেনহাজ জামান তার মা-বাবা-বোন-নানীকে হত্যা করে। এদু’জনই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত হয়েছে। তারাও অভিভাবকের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রচনায় সক্ষম হয়নি। সবসময় নিজেদেরকে অপরাধী মনে হয়েছে।  

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর