শিরোনাম
প্রকাশ : ১৬ মে, ২০২১ ১৪:৩৫
আপডেট : ১৭ মে, ২০২১ ১৭:১৯
প্রিন্ট করুন printer

জননেত্রী শেখ হাসিনা: নির্বাসনের দিনগুলি

ড. শাহিনুর রহমান

জননেত্রী শেখ হাসিনা: নির্বাসনের দিনগুলি
ড. শাহিনুর রহমান
Google News

 

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি। বাংলা শ্রাবণ মাস পেরিয়ে ভাদ্রের শুরু। বর্ষার পানিতে ধানমণ্ডি লেক কানায় কানায় ভরা। লেকের পাড়ে ৩২ নম্বর বাড়িটার গায়েও লেগেছে বর্ষা ঋতুর শ্যামলিমার ছোপ।

১৫ আগস্টের মাঝরাতে একদল উর্দিধারী আততায়ী অতর্কিতে ঘুমন্ত বাড়িটায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পৃথিবীর ঘৃণ্যতম, নৃশংসতম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডটি ঘটাল। একই রাতের মধ্যে তারা নিশ্চিহ্ন করে দিল একটি পরিবার। বাংলার ইতিহাসে আবারও লেখা হলো নবাব সিরাজউদ্দৌলার চেয়েও করুণ এক ট্র্যাজেডি আর মীরজাফরের চেয়েও জঘন্য বেঈমানির আরেক কাহিনী।

নবোদিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার সুযোগ্য সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ও তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী, দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল আর তার নববিবাহিত স্ত্রী, মুজিব দম্পতির কনিষ্ঠ পুত্র মাত্র ১০ বছরের বালক শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান কর্নেল জামিল, সবাই সে রাতে নিহত হন। একই রাতে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্য সেরনিয়াবাত এবং ভাগ্নে যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনিরের বাসভবনেও পৃথক দুটি হামলা চালিয়ে সন্তানসম্ভবা বধূ, দুগ্ধপোষ্য শিশু, বৃদ্ধসহ সবাইকে হত্যা করা হয়। এই পৈশাচিক নির্বিচার হত্যালীলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার পবিত্র শোণিতের উত্তরাধিকারী দুটিমাত্র প্রাণ জাতির পিতার দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। হত্যাকাণ্ডের সময় তারা বিদেশে থাকার কারণেই প্রাণে বেঁচেছেন, আর প্রাণে বেঁচেছেন বলেই পিতার জ্যেষ্ঠতম সন্তান শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে কাণ্ডারিহীন নৌকার মতো প্রবল প্রতিকূল স্রোতে নিমজ্জমান দলকে এবং দুঃশাসন কবলিত দেশকে পুনরুদ্ধার করে শামিল করে দিতে পারলেন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জোয়ারে, বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দণ্ডবিধান করতে পারলেন পিতা এবং স্বজন হন্তারকদের।

এসব কাহিনী এখন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত এবং কম-বেশি সবারই জানা। কিন্তু আমরা কি কখনও গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, বিদেশে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর দুটি কন্যা, সহোদরা বোন দুটি তরুণী যখন স্বদেশে তাদের সকল স্বজনের হত্যার, ক্ষমতায় বিশাল মেরুপরিবর্তনের দুঃসংবাদ শুনতে পেয়েছিলেন, তখন তাদের মনের অবস্থা কী হয়েছিল? কোন অতলান্ত অন্ধকারময় ভবিষ্যতের ছবি তাদের অন্তর্চক্ষুতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল? শেখ হাসিনার বয়স তখন মাত্র ২৮ বছর, আর তার দশ বছরের ছোট বোন রেহানার বয়স ১৮ বছর। প্রতিভাবান তরুণ বিজ্ঞানী ড. এম.এ.ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে এর আট বছর আগে। শিশুপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও শিশুকন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে নিয়ে তিনি তখন স্বামীর কর্মস্থল পশ্চিম জার্মানিতেই ছিলেন। তার অত্যন্ত আদরের ছোট বোন রেহানাও তখন সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কলঙ্কিত এবং পাহাড় আছড়ে পরা সবচেয়ে প্রিয়জনদের হরাবার খবরটা পাওয়ার পর স্বভাবতই তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। আলোকিত প্রশান্ত মহাসাগর থেকে তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন অশান্ত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক অন্ধকার মহাসমুদ্রে। সর্বব্যাপী মহাশোক তাদের আশ্রয় করেছিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তাদের আত্মরক্ষার প্রশ্ন। কারণ বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারীদের সম্পূর্ণ নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর আততায়ীরা তখন হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল, হত্যার সুযোগ খুঁজছিল বঙ্গবন্ধুতনয়াদের। তাদের শকুনিদৃষ্টি এড়িয়ে কীভাবে তারা আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী প্রায় ছয় বছর অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত দেশান্তরে কাটিয়েছেন এবং আত্মরক্ষা করেছেন, সেই কাহিনী সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়। এটা তো সবার জানা কথা যে, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যায় প্রত্যক্ষ মঞ্চে সামরিক উর্দিধারীদের দেখা গেলেও পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল তারই নিজের দল আওয়ামী লীগের মধ্যকার খন্দকার মোশতাক আহমেদ, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, জিয়াউর রহমান প্রমুখ কিছু গোপন পাকপন্থী মীরজাফর। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল সামরিক বাহিনীর ভেতরের ও বাইরের সোনার পাথরবাটি ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’-এর প্রবক্তা জাসদিরা।

জাতির পিতার হত্যাবশিষ্ট পরিবারের তথা আমাদের জাতীয় জীবনের সেই কঠিন ক্রান্তিকালে স্বজনহারা, সর্বহারা এতিম দুটি কন্যার দিকে সার্বিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমাদের রাজনীতি অঙ্গনের গৌরব, সুভদ্র সজ্জন, বর্তমানে প্রয়াত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, যিনি তখন পশ্চিম জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

জোট নিরপেক্ষ বিশ্বের তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতা যুগোস্লভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের নিজ নিজ দেশে বঙ্গবন্ধু কন্যাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারা দু'জনই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ও সমর্থক এবং সপরিবারে তার নৃশংস হত্যায় গভীর শোকার্ত ও প্রতিবাদে সোচ্চার। এ আমন্ত্রণের জন্য নেতৃদ্বয়কে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জনকের কন্যারা ঝড়ে নীড়হারা দুটি পাখির মতো আশ্রয় নেন ভারতের নয়াদিল্লিতে। ১৯৮১ সালে নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবনযাপনকালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্যদিয়ে পকিস্তানের প্রেতাত্মারা সারা বিশ্বে যে কলঙ্ক লেপন করলো তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বেইমানদের বাংলার মানুষ বিশ্বাস করেননি বলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের দোসরদের সরে দাঁড়াতে হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে স্বাধীনতার চেতনাকে স্বাধীনতা বিরোধীরা রুখতে পারেনি, পারেনি বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে দাবিয়ে রাখতে। সে কারণেই আজ বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২১ সালের উন্নয়ের বাংলাদেশ। আরও দেখছি জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার অদম্য বিরামহীন পথ চলা। 

আজকে আমার এই লেখার উদ্দেশ্য হলো যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৮১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত  আমাদের জননেত্রী শেখ হাসিনা কেমন ছিলেন এবং কিভাবে ১৫ আগস্টের শোক মাথায় নিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনাকে বাস্তব করার পদক্ষেপগুলো একটার পর একটা সফল করলেন তা সকলের জানা প্রয়োজন। 

লেখক: কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, ফোকলোরিস্ট, গবেষক, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ এবং সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত