শিরোনাম
প্রকাশ : ১৫ জুন, ২০২১ ১৯:৩০
প্রিন্ট করুন printer

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার; নিজের কাজটি যিনি ভালোভাবে করে গেছেন

ডা. আতাউর রহমান

অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার; নিজের কাজটি যিনি ভালোভাবে করে গেছেন
রোগী দেখছেন অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার
Google News

কিছু একটা করে ভাইরাল হওয়ার অসুখ যখন আজ গোটা পৃথিবীজুড়ে, প্রাণপনে মুখ দেখানোর চেষ্টা, এমনকি উৎকট উদ্ভট একটা কিছু করে জগৎবাসীর মনোযোগ আকর্ষণ আর আত্মপ্রদর্শনের অচিকিৎস্য ব্যাধি যখন রীতিমতো মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, তখনও কিছু মানুষ, হ্যাঁ ‘মানুষ’ তো থাকেনই সমাজের নানা পেশায় শ্রেণিতে ছড়িয়ে বিছিয়ে—নইলে সমাজটা টিকে আছে কী করে?

তেমনই কিছু মানুষ থাকেন আমাদের খুব কাছেই। নিত্যদিনের চেনাজানা-ধরাছোঁয়ার পরিধিতেই এদের অবস্থান। এদের উপস্থিতি অপেক্ষাকৃত নীরব। মগ্ন মনোযোগে নিজের কাজটুকু সর্বোচ্চ যত্নে ও আন্তরিকতায় করে যাওয়াতেই এদের সমস্ত আনন্দ। এই তাদের সাধনা।

ঠিক এমনই একজন মানুষ অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার। দেশের বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকার ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের অধ্যাপক। গত ১ মে ২০২১ সন্ধ্যায় যিনি পাড়ি জমিয়েছেন পরলোকে। পরম করুণাময় তাকে অনন্ত কল্যাণে পুরস্কৃত করুন।

আক্ষরিক অর্থেই ডা. সাহিদা আখতার ছিলেন একজন মাতৃময়ী সহৃদয় চিকিৎসক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বসাম্প্রতিক তথ্যউপাত্ত নিজের মন-মস্তিষ্কে ধারণ করেই যে কেবল চিকিৎসা দিতেন তা নয়, উপরন্তু তাঁর হৃদয়টাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঢেলে দিতেন তাঁর শিশুরোগীদের প্রতি। কথাটা এত জোর দিয়ে বলতে পারছি নিজের প্রত্যক্ষ ও একাধিক পরোক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে যা করার সে তো করতেনই, সবসময় চাইতেন এর চেয়ে অধিক কিছু করতে। সম্পর্কটি তাই ডাক্তার-রোগীর সীমানা ছাপিয়ে অধিকাংশ সময়ই হয়ে উঠত পরমাত্মীয়ের। হবে না-ই বা কেন? হাসপাতালে ভর্তি অপরিণত ওজনধারী শিশুর বাবা-মা-অভিভাবকদের যেভাবে আশা ও সাহস দিতেন আর তার পরামর্শগুলো যেভাবে পালন করতে উৎসাহ যোগাতেন তা এ-যুগে রীতিমতো দুর্লভ। 

বারডেম হাসপাতালের শিশু বিভাগের নিউন্যাটোলজি ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার। ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন শিশু অন্তঃপ্রাণ। সপক্ষে একটি ঘটনা এখানে পাঠকদের সাথে শেয়ার করা যেতে পারে।

নিউন্যাটোলজি ইউনিটের আইসিইউ-তে সপ্তাহখানেক ধরে ভর্তি অপরিণত ওজনের একটি শিশু। তার মা আছেন একই হাসপাতালের আরেকটি কেবিনে। দিনে কয়েক বার গিয়ে তিনি সন্তানকে খাইয়ে আসেন। কখনো খাবার রেখে আসেন—বাচ্চা ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেই যেন কর্তব্যরত নার্সরা খাইয়ে দিতে পারে। 

একদিনের ঘটনা। সেই মা গেছেন তাঁর বাচ্চাকে দেখতে। আইসিইউ-র দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখলেন সদ্যজাত শিশুটিকে ছোট্ট চামচে একটু একটু করে নিবিড় মমতায় খাইয়ে দিচ্ছেন অধ্যাপক সাহিদা নিজেই। জানা গেল, তিনি সেদিনের রাউন্ড শেষ করে নিজের রুমে ফিরে যাচ্ছিলেন, এর মধ্যেই দেখলেন বাচ্চাটি জেগে উঠেছে। এদিকে নার্সরাও কিছুটা ব্যস্ত। বাচ্চাটি ততক্ষণে ক্ষুধায় কান্না শুরু করার আগেই তিনি নিজেই তাকে খাওয়াতে শুরু করলেন!

আরেকদিনের ঘটনা। সেদিনও যথারীতি তিনি রাউন্ড দিচ্ছিলেন আইসিউ-তে। নাকে-শিরায় অক্সিজেন আর স্যালাইনের নলে জবুথবু একটি শিশু ঘুম ভেঙে বিকট স্বরে কেঁদে উঠল। তার মা কিংবা নার্স আসার আগেই দেখা গেল, অধ্যাপক সাহিদা আখতার ‘বাবা.. সোনা.. লক্ষ্মী কাঁদে না’ ইত্যাদি বলে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।       

যে-কালে উচিৎ সেবাটি দিতেই আমরা শত অজুহাতে বিমুখ, সেখানে হাসপাতালের অধ্যাপক নিজেই খাইয়ে দিচ্ছেন আর আদর-স্নেহ দিয়ে কান্না ভোলাচ্ছেন রোগীর। এমন ঘটনা ডা. সাহিদা আখতারকেই মানায়। ওয়ার্ডে ভর্তি তাঁর প্রত্যেক শিশুরোগীর পরিবারের হাসপাতালে অবস্থানরত সদস্যদের তিনি দেখলেই চিনতেন যে, কে কোন শিশুর বাবা-মা-অভিভাবক। দুপুরে কাউন্সেলিংয়ের নির্ধারিত সময়ে তো বটেই, দেখেছি হাসপাতালের সিঁড়ি-করিডোরে যে-কোনো সময় তিনি রোগীর পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্বেগাকুল জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছেন। কখনো দেখেছি নিজেই ডেকে নিয়ে ওদের অবহিত করছেন রোগীর বর্তমান অবস্থা। গরজের সবটাই যেন তাঁর।

বস্তুত এসব অনন্য চরিত্রবৈশিষ্ট্যগুলোই তাঁকে করে তুলেছিল সত্যিকারের একজন মানবিক চিকিৎসক। হাসপাতালজুড়ে তাঁর হাঁটা-চলা আর কথা-আলাপ যাবতীয় সব কিছুতেই ছিল একজন মমতাময়ী চিকিৎসকের ছাপ।

ক্যান্সারে ভুগছিলেন অধ্যাপক সাহিদা আখতার। চিকিৎসার পর মাঝে কয়েক বছর মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছিলেন। পুনরায় হয়ে উঠেছিলেন সদ্যজাত শিশু ও তাদের পরিবারের আশ্রয়স্থল। ক্যান্সার চিকিৎসা-পরবর্তী ধকলে মাঝে মাঝেই কিছুটা অসুস্থ বোধ করতেন, কিন্তু এটা কখনোই তাঁর কর্তব্য-শিথিলতার কারণ হয় নি। ওয়ার্ডে কিংবা আইসিইউ-তে ভর্তি শিশুদের পাশে তাঁকে বরাবরই দেখেছি দায়িত্বনিষ্ঠ।

অপরিণত ওজনের শিশুদের জন্যে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার পাশাপাশি একটি জিনিস খুব দরকার—কেএমসি বা ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার। অতি নাজুক এসব শিশুকে দিনে-রাতে যতটা সময় মায়ের বুকে উপুড় করে শুইয়ে রাখতে পারা যায় এদের সুস্থতার হার ও সারভাইভাল রেট তত বাড়ে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক এবং একইসাথে উত্তরাধুনিক এই চিকিৎসাপদ্ধতি রোগীমহলে প্রচলনের ব্যাপারে ডা. সাহিদা ছিলেন রীতিমতো আপসহীন। সব কথা, যাবতীয় চিকিৎসা পরামর্শ ও কাউন্সেলিংয়ের পর শিশুকে কেএমসি দেয়ার কথা অবধারিতভাবে তিনি বলতেনই এবং যতভাবে সম্ভব উদ্বুদ্ধ করতেন শিশুর মা, বাবা, অভিভাবকদের। একরকম করিয়েই ছাড়তেন। যে শিশুর মা-বাবারা এটা করছে তাঁদের দৃষ্টান্ত দিয়ে অন্যদের অনুপ্রাণিত করতেন। 

আর নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর ব্যাপারে তাঁর ব্যাকুলতা ছিল লক্ষণীয় এবং অবশ্যই শিক্ষণীয়। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিরাপস। শিশু বা মায়ের যত শারীরিক অসুবিধা-সীমাবদ্ধতা না থাকলে ডা. সাহিদা শেষ অবধি চেষ্টা করতেন প্রক্রিয়াজাত কৌটাদুধ না দিয়ে নবজাতককে যেন মায়ের দুধই খাওয়ানো হয়। এ ব্যাপারে ঘুরে ফিরে বলতেন এবং সবাইকে সচেতন করে তুলতেনই তাঁর যে-কোনো আলোচনা, সাক্ষাৎকার কিংবা টিভি চ্যানেলের স্বাস্থ্য বিষয়ক আলাপনে। 

মনে পড়ে, বছর দশেক আগে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে একবার নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উত্থাপন করে বলেছিলেন—‘আজকে বিজ্ঞাপনের প্রতাপে মায়েদের বুকের দুধ শুকিয়ে যাচ্ছে! এসব আমরা বলতে বলতে হয়রান হয়ে যাচ্ছি। আপনারা সবাই মিলে প্লিজ কিছু করেন।’ বাণিজ্য-আগ্রাসী এ-যুগে কোনো পেশাজীবীর পক্ষে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লোকসম্মুখে এমন সাহসী উচ্চারণ ও আহ্বান আদতেই বিরল।   

বহু সকৃতজ্ঞ স্মৃতিচারণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে করে যাওয়া সম্ভব এই অনন্য সেবাব্রতী মানুষটিকে নিয়ে। কারণ, সেবাই যে ছিল তাঁর প্রথম ব্রত। তাঁর শিশুরোগীদের সুস্থতাই ছিল তাঁর সমস্ত চিন্তাজুড়ে।

হাদীসে বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি কাজ তুমি সবচেয়ে ভালোভাবে করবে—এটাই আল্লাহর নির্দেশ’।  কথাটি যতবার পড়ি কিংবা শুনি, চকিতে যে ক’জনের চেহারা মনে ভেসে ওঠে সে তালিকায় শিশুদরদী প্রয়াত অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার অন্যতম। চিকিৎসক জীবনে কত অগণিত শিশু ও তাঁদের পরিবারের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন তিনি! সত্যিই তিনি নিজের কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবেই করে গেছেন।

লেখক: মেডিকেল কাউন্সিলর এন্ড মোটিভিয়ার, কোয়ান্টাম স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম।     

 

বিডি প্রতিদিন/হিমেল