গল্প
এই নিয়ে তিনবার যেন তিনি শুনতে পেলেন,
মেয়েটাকে একলা ফেলেই চলে যাচ্ছিস! তোর মনে কী দয়ামায়া বলতে কিচ্ছু নেই?
প্রতিবারই চমকে পেছনে ফিরে তাকিয়েছেন ফরিদ সাহেব। কিন্তু কাউকে দেখতে পাননি। ভূতপ্রেতে জীবনেও বিশ্বাস করেন না তিনি। তাহলে কোত্থেকে আসছে কথাগুলো! অবচেতন মনের কথা এত জোরে শোনা যায়! তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন এবার। ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন রোডের রাস্তা ধরে হাঁটছেন তিনি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জ্বলছে লাইটপোস্টের বাতি। প্রথমদিকে লাইটগুলো যখন লাগানো হয়েছিল দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকত এখানটায়। একটি দুটি করে ভাঙতে ভাঙতে এখন মাত্র কয়েকটি লাইট জেগে আছে। শুনেছেন দুর্বৃত্তের কাজ। কিন্তু লাইটগুলো ঠিক করার গরজও কেউ মনে করেনি তাই ছায়ান্ধকারে ঢেকে থাকে রাস্তাটি। কোনো দুষ্ট ছেলেপেলে পিছু নিয়েছে কিনা পেছনে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে দেখে আসলেন। নাহ্। কোথাও কোনো মানুষের দেখা নেই। অন্ধকার দলা পাকিয়ে আছে বিল্ডিংয়ের কোনায়, গাছের মাথায়। চিন্তা করতে লাগলেন তিনি আগাগোড়া বিষয়টি।
অফিসের কাজে প্রায়শ ঢাকা যেতে হয় ফরিদ সাহেবকে। রাতের ট্রেনেই আবার ফিরে আসেন। এবার রাতের ট্রেন ধরতে পারলেন না। তীব্র গরমের পর বিকেলের দিকে আকাশ যেন কালো মেঘে ছেয়ে গেল। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই ঝমঝম করে নামল বৃষ্টি। বিজলি চমকের সঙ্গে বিকট হুঙ্কার! বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতে করতে ঘড়ির কাঁটা কখন আটটা তিরিশের ঘর পেরিয়ে গেছে খেয়ালই করেননি। ট্রেন ৯টায়। বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়লেন ট্রেন ধরার জন্য। মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনের দূরত্ব বেশি না। সময় বাঁচানোর জন্য সিএনজি নিতে চাইলেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কোনো সিএনজি ড্রাইভারকে রাজি করাতে পারলেন না কমলাপুর স্টেশন যেতে। সবার এক কথা।
স্যার, রিশকায় চইলা যান। রাস্তায় পানি জইম্যা গ্যাছে। গাড়ি চালান যাইব না।
এমনিতেই ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যাম লেগেই থাকে। এখন বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় কী অবস্থা কে জানে! অগত্যা রিকশাই ভরসা। ঘণ্টাদেড়েকের বৃষ্টিতে নদীতে পরিণত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। রিকশাওয়ালার মেজাজ সপ্তম চড়ে আছে। আবার এই পানি তাদের জন্য আশীর্বাদও। ইচ্ছেমতো ভাড়া চাওয়া যায় যাত্রীদের কাছে। স্টেশন যাওয়ার জন্য তিরিশ, চল্লিশ টাকা সোজা দ্বিগুণ করে দিয়েছে সবাই। কিন্তু এখন ভাড়া নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। উঠে পড়লেন একটি রিকশায়। রিকশাওয়ালা সিটি করপোরেশনকে গালিগালাজ করে, ফরিদ সাহেবের কান ঝালাপালা করে কখনো প্রায় হাঁটুসমান, কখনো প্রায় কোমর সমান পানি ভেঙে রিকশা নিয়ে যখন স্টেশনে পৌঁছাল- ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে তার আরও কুড়ি-পঁচিশ মিনিট আগে। এই পানির মধ্যে আবার বাসস্টেশন যাবেন, সে সাহস করতে পারলেন না। সাড়ে ১১টায় তূর্ণা নিশীতা গটগট করে বেরিয়ে গেল স্টেশন ছেড়ে। মহানগর প্রভাতীর টিকিটও পাওয়া গেল না। সারা রাত স্টেশনে অনেক ছুটোছুটির পর অবশেষে সুবর্ণের এই টিকিটটি জোগাড় করলেন। শোভন চেয়ার, ‘ঠ’ বগি। সিটে বসে হাঁফ ছাড়লেন, যখন দেখলেন অনেকেই সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি গরমটাকে যেন উসকে দিল আরও। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ভেজা গায়ে, কেউ কাকভেজা। স্যাঁতসেঁতে বাতাসের সঙ্গে মিশেছে ঘামের বিশ্রী গন্ধ। দম বন্ধ করা পরিবেশ গোটা কম্পার্টমেন্টে। পত্রিকা খুলে আজকের খবরগুলো পড়ার দিকে মন দিলেন। অন্য খবরের পাশাপাশি প্রতিদিনকার মতো খুন, ধর্ষণ, আত্মহত্যার খবর। কিছু কিছু ঘটনার প্রতিবাদে এতক্ষণে ফেসবুক নিশ্চয় ভরে উঠেছে। মনে মনে হাসলেন তিনি। যে যার মতো করে ঘটনার বিবরণে ভরে তুলেছে ফেসবুক নামের পত্রিকার পাতা। কাল যদি আরেকটি ঘটনা ঘটে, এগুলো ভুলে গিয়ে ওটা নিয়েই মাতামাতি হবে। খুব হইচই হবে। নতুন আরেকটি ঘটনায় চাপা পড়ে যাবে ওটাও। পাতাটা বাদ দিয়ে ভিতরের পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলেন। খেলাধুলার খবরগুলোয় একটু নজর বুলিয়ে রেখে দিলেন পত্রিকাটি। অফিসের কাজে আটকা পড়া। তবুও কেন যেন নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠল মনটা। টঙ্গীতে বেশ কিছু যাত্রী নেমে যাওয়ায় বগি অনেকটা ফাঁকা এখন। ভ্যাপসা, দুর্গন্ধময় ভাবটাও নেই আর। ট্রেন আবার চলতে শুরু করতেই গা-টা এলিয়ে দিলেন সিটে। সারা দিনের ছুটোছুটি, ধকলের পর শরীর একটু আরাম পেতেই চোখের পাতা লেগে গেল আপনা আপনিই।
আটপৌরে ঘুম। কোনো স্টেশনে থামলেই ছুটে যাচ্ছে। এই ঘুম পুরোপুরি ভাঙল শোরগোল শুনে। লাকসাম স্টেশন থেকে কয়েকজন উঠেছে। এরাই নিজেদের মধ্যে হৈ চৈ করে কথা বলছে।
রহিম মিয়ার আইজ খুশির দিন। এক্কেরে হাত খালি কইরা যাইতাছে।
কোঁচড় তো ভইরা গ্যাছে। মুহের হাসি কেমুন দ্যাখছ না! আরেকজন বলল।
হাসি হাসি মুখ করা একজনকে উদ্দেশ করে বলা। যাকে নিয়ে বলা হচ্ছে বোঝাই যাচ্ছে কথাগুলো সে খুব উপভোগ করছে।
বহুত দিন পর ভাগ্য মুখ তুইল্যা চাইছে। খুশি তো লাগবই। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই বলল রহিম মিয়া নামের লোকটি।
হাটুরে হবে। এরপর শুরু হলো নিজেদের মধ্যে হিসাব-নিকাশ। কে কত বিক্রি করল, ক্রেতা দাম কম বলায় কে ঘরে পালা দেশি মোরগটি দেয়নি। ক্রেতাদের সঙ্গে স্বর উঁচু করে কথা বলতে বলতে ওদের হয়তো এভাবেই কথা বলায় অভ্যাস হয়ে গেছে। ট্রেন গতি নিয়ে চলতে শুরু করেছে আবার। বন্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন রাতের নিকশ কালো অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এখানেও বৃষ্টি হচ্ছে। রুপোর সুতোর মতো পানির ধারা এঁকেবেঁকে জানালার কাচ বেয়ে নেমে যাচ্ছে মাটিতে।
চায়ের হাঁক শুনে এককাপ চা দিতে বললেন। সেই লোকগুলোও নিল। রহিম মিয়া নামের লোকটি আরও কিছুটা উঁচু স্বরে বলল,
এইদিকে চাইড্ডা চা দেন। বিস্কুট আছে ভাই? থাইকলে দুইডা কইরা বিস্কুটও দিয়েন।
যেন কম্পার্টমেন্টের সবাইকে জানাতে চায়, সে আজ জিতেছে। কিন্তু সেই জিতের আনন্দ সে একলা নিচ্ছে না। প্রকাশিত খুশি। এদের সমাজে এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এদের ভালোবাসা যেমন প্রকাশ্য, ঘৃণাটাও তেমন। গলার স্বরের মতোই উচ্চকিত এদের জীবন। চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মতো আলো-আঁধারির খেলা চলে না এখানে। ফরিদ সাহেব মনে মনে ভাবেন, বেশ ভালোই আছে রহিম মিয়ারা। বৃষ্টির মতো ঝরঝরে জীবন এদের।
লাকসাম থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব কম নয়। তবুও প্রতিবার এই স্টেশনে আসলেই ফরিদ সাহেবের মন কেমন যেন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। নাড়ির টান একেই বলে মনে হয়। লাকসাম পেরুলেই ফেনী! আহ! একেবারে নিজের শহরের সঙ্গে! রাত ১১টার দিকে ট্রেন থামল বটতলী স্টেশনে। এক্সিট গেটের পাশে এক মহিলাকে জেরা করছে পুলিশ। মহিলার টিকিট নেই। ছয় সাত বছরের মেয়েটি মায়ের আঁচল ধরে সেঁটে আছে গায়ের সঙ্গে। ছেলেটি কোলে। মহিলা কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে পুলিশ দুজনকে। ফরিদ সাহেব কি মনে করে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন কী ঘটনা?
আর কী! টিকিট না নিয়ে ট্রেনে উঠে এখন নাকি কান্না। মনে করছে চালাকি করে পার পেয়ে যাবে।
কথার মাঝখানে মৃদুস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল মেয়েটি।
সা’ব! বিশ্বাস করেন! আমি চালাকি করতাছি না। বিপদে পইড়া টেরেনে উইট্টা পড়ছি। এই পত্তম টেরেনে উটছি। টিকিট কীভাবে লইতে হয়, এইডাও জানি না। সা’ব! হেদের একটু বুঝাইয়া কন না! ফরিদ সাহেবকে পেয়ে যেন সে যেন সহায় খুঁজে পেল। দূর থেকে যাকে মহিলা মনে হয়েছিল, কাছে এসে দেখলেন তেইশ-চব্বিশ বছর বয়স হবে তার। চুল থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে আছে অভাব। মায়ের কান্না দেখে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকা মেয়েটির চোখও টলমল করছে পানিতে। ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে মায়ের ঘাড়ে মাথা রেখে। রাত অনেক। এভাবে এখানে ওদের ফেলে যেতে বিবেক বাধা দিল। ওদের ভাড়াটা তিনিই দিয়ে দিলেন। ঝামেলাটা মিটিয়ে তিনি বেরিয়ে এসে বাসার পথ ধরেছেন। আসার পথেই কথাগুলো শুনতে পেলেন। পরপর তিনবার! বুঝতে পারছেন না কী করবেন! কি ভেবে আবার ফিরে গেলেন টিকিট কাউন্টারের সামনে। দেখলেন সারি সারি চেয়ার থাকা সত্ত্বেও মেয়েটি ফ্লোরে বসে আছে। ঠান্ডায় কুঁকড়ে মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের পাশ ঘেঁষে। ছেলেটি কোলে।
এভাবে বসে আছ কেন! কোথায় যাবে, চলে যাও! কেউ নিতে আসবে?
মেয়েটি চুপ করে আছে।
আরে বাবা কথা না বললে কী করে বুঝব কী সমস্যা! বেশ বিরক্তি নিয়েই বললেন তিনি।
সা’ব...
কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল মেয়েটি। নিজের মনকে শান্ত করে এবার কিছুটা নরম গলায় বললেন,
দেখো, স্টেশন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বসে না থেকে কোথায় যাবে চলে যাও।
কোথায় যামু? এই শহরের কিছুই আমি চিনি না।
অচেনা জায়গায় দুটো বাচ্চা নিয়ে চলে এলে! মেয়েটির সাহস দেখে আশ্চর্য ফরিদ সাহেব।
এক কুটুম আছে, তার ঠিকানা লইয়া আইছি।
কুটুমের ঠিকানা হাতে নিয়েই চলে এসেছে। অচেনা জায়গায়। খালি হাতে। ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে লাগছে ফরিদ সাহেবের কাছে। বাড়ছে কৌতূহলও। এদিকে বাসা থেকে ফোন আসছে বারবার।
তোমার কুটুম কি জানে তুমি আসবে?
না। ঠিকানা লইয়া আইছি। ভিতরের কান্নাটা মুখে স্পষ্ট।
বোকা মেয়ে। এই রাতে এতবড় শহরে কোথায় খুঁজবে তোমার কুটুমকে?
পকেট থেকে বের করে দুটো একশ টাকার নোট মেয়েটির হাতে দিয়ে বললেন,
বাচ্চা দুটোকে কিছু কিনে দিও। বাসে করে যেও যেখানে যাবে।
কি মনে করে পকেট থেকে নিজের একটি কার্ড দিয়ে বললেন,
এখানে আমার ফোন নম্বর আছে। দরকার হলে ফোন দিও। আবারও ফোনে রিং হচ্ছে। তিনি বেরিয়ে এলেন স্টেশন থেকে। ভেজা রাস্তা দেখে বুঝতে পারলেন বৃষ্টি এখানেও হয়েছে। সঙ্গে ছাতা নেই। তাড়াতাড়ি পা চালালেন বাসার দিকে। রাত ১২টা তো হবেই। মনে দ্বিধা নিয়েই বাসায় পৌঁছে গেলেন মিনিট কুড়ির মধ্যে।
কাপড়-চোপড় ছেড়ে, ফ্রেশ হয়ে পাশের রুমে গেলেন। গভীর ঘুম আরিবা, আদিবা। ফরিদ সাহেবের দুই মেয়ে। চোখেমুখে নেই কোনো ভয়ার্ত ভাব। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে দু’জন। মনে পড়ে গেল বাসা থেকে কুড়ি, পঁচিশ মিনিটের দূরত্বে একই বয়সি আর দুটো বাচ্চা উপোস ঘুমিয়ে আছে। ঠান্ডায় কুঁকড়ে থাকা শরীরে মায়ের আঁচল ছাড়া আর কিছু নেই। তার দিয়ে আসা টাকায় ওদের মা খাবার কিনতে পেরেছে কী না কে জানে! কিছু খাবার তো আমি নিজেই কিনে দিয়ে আসতে পারতাম! হঠাৎ এ কথাটি মনে এসে ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। মেয়ে দুটোকে আদর করে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। স্ত্রী টেবিলে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। খেতে বসে বার বার মনে পড়ছে মেয়েটির কথা, বাচ্চা দুটোর কথা। কানে অনবরত বেজে চলেছে সেই আওয়াজ-মেয়েটিকে একলা ফেলেই চলে যাচ্ছিস? ঘুমোতে গিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করছেন।
কী ব্যাপার? কী হয়েছে তোমার? এসেছ পর্যন্ত কেমন গম্ভীর হয়ে আছ? কিছু খেলেও না। স্ত্রীর প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বললেন,
বৃষ্টিতে ভিজে শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। তাই ঘুম আসছে না।
ইচ্ছে করেই মিথ্যেটা বললেন। দেখা আর অদেখাতে অনেক পার্থক্য। খামোখা বাইরের কথা ঘরে এনে অশান্তি হবে। পুরুষ হলে হয়তো কিছুক্ষণ তাকে নানা বিশেষণ দিয়ে চুপ হয়ে যেত। কিন্তু মেয়ের বেলায় হাজার প্রশ্ন করবে। ফরিদ সাহেব ছোটোকাল থেকেই দেখে বড় হয়েছেন, তার বাবাকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। বাবার সূত্রে এই অভ্যাস তারও। কিন্তু তার স্ত্রীর কথা হলো এখন বাবার আমল নেই। চড়া দামের বাজারে নিজেদেরই চলতে হয় হাজার হিসাব-নিকাশ করে। ফরিদ সাহেব প্রথমদিকে বউকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। এখন আর করেন না। তার কথায়ও যুক্তি আছে। ব্যাংকের একজন অফিসারের যে বেতন, তাতে আসলেই হিমশিম খেতে হয় সবদিক সামলে চলতে। আবার নিজেকেও পারেন না দমিয়ে রাখতে। তাই বাইরের কথা বাইরেই রেখে দেন।
তোমার কী হয়েছে ঠিক করে বল তো? অফিসের কাজে ঢাকা গিয়েছিলে। কোনো ঝামেলা হয়েছে?
না না। কোনো ঝামেলা হয়নি। ট্রেনে খানিকটা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সে জন্য হয়তো ঘুম আসছে না। বুঝতে পারছেন বউ ঠিকই তার অস্থিরতা আঁচ করতে পারছে। প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই বউকে ঘুমোতে বলে নিজেও পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করলেন।
অফিসে যাওয়ার পথে কৌতূহল সামলাতে পারলেন না। রিকশা ঘুরিয়ে নিলেন স্টেশনে। নেই! এদিক সেদিক খোঁজ করলেন, কয়েকজন সুইপারকে জিজ্ঞেসও করলেন। কেউ কিছু বলতে পারেনি। ব্যস্ত স্টেশনে প্রতিদিন হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করে। একজন মা তার বাচ্চা দুটো নিয়ে কুটুমের বাড়িতে পৌঁছাতে পারল কি-না কে রাখে সে খবর! পস্তাচ্ছেন ঠিকানাটি কেন দেখেননি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসার পথে আবার যেন শুনতে পেলেন-মেয়েটিকে তুই একলা ফেলে রেখে চলে যাচ্ছিস? চমকে পেছন ফিরে তাকান। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। কে করছে এই প্রশ্ন! তিনি যখন নিজের কার্ড দিয়ে বের হয়ে আসছিলেন, মেয়েটির চোখে করুণ এক আকুতি ছিল। সে কী বলতে চেয়েছিল
সা’ব! আমগোরে সঙ্গে লইয়া যান! একটু আশ্রয় কুনোহানে জুটাইয়া দ্যান!
ফরিদ সাহেবের চোখ খুঁজে বেড়ায় তেইশ চব্বিশ বছরের একটা মেয়ে আর তার দুটো বাচ্চাকে। যাদের বয়স তার নিজের দুই মেয়ে আরিবা আদিবার মতো...