Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪৫
সুন্দরী সুজানা, দুই বৃদ্ধ এবং এক উকিল!
গোলাম মাওলা রনি
সুন্দরী সুজানা, দুই বৃদ্ধ এবং এক উকিল!

আমি যে সুজানার কথা বলতে যাচ্ছি তিনি হাল আমলের কোনো নায়িকা কিংবা সুন্দরী ললনা নন। মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে আধুনিক নগরীর শহরতলির এক দরিদ্র পল্লীতে তিনি বসবাস করতেন।

তার রূপযৌবন পুরুষদের মাথা ঘুরিয়ে দিত। তার সততা এবং উত্তম চরিত্রের কাহিনী মানব ইতিহাসের কিংবদন্তি উপাখ্যান হিসেবে পবিত্র বাইবেলে স্থান পেয়েছে।   তার জীবনের একটি নির্মম ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই বিচার ব্যবস্থায় ওকালতি এবং ফৌজদারি বিচারে সাক্ষ্যগ্রহণের রীতি প্রবর্তিত হয়েছে। গত কয়েক হাজার বছরের আইন বিজ্ঞান, আইন আদালত এবং আইন শাস্ত্রের শিক্ষালয়গুলোতে সুন্দরী সুজানার কাহিনী যে কতবার বর্ণিত হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। মহান আইন পেশার বিজ্ঞ বিচারক, শিক্ষক এবং আইনজীবীগণ সময়-সুযোগ পেলেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে বাইবেলে বর্ণিত সুজানার কাহিনী বর্ণনা করেন এবং সেই কাহিনীর আলোকে জীবনের লক্ষ্য স্থির করার জন্য পরামর্শ দেন।

আদিকালের ব্যাবিলন নগরীর কাছাকাছি একটি গ্রামে বসবাস করতেন সুজানা। স্বামী, পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে অত্যন্ত সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। সাধারণ দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও তার অসাধারণ রূপ লাবণ্য এবং সততা, কর্মনিষ্ঠা ও উত্তম চরিত্রের জন্য তিনি পুরো ব্যাবিলন নগরী তো বটেই আশপাশের শহর-বন্দর এবং নগরের অধিবাসীদের কাছে মশহুর ছিলেন। ব্যাবিলন তখন আসিরীয় সম্রাট নেবুচাঁদনেজার অধীনে শাসিত হচ্ছিল। সিরিয়া, ইরাক, জেরুজালেমসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তখন কেন্দ্রীয় শাসন চললেও সম্রাট পুরো সাম্রাজ্যের স্থানীয় শাসন চালানোর জন্য আজকের জমানার পঞ্চায়েত, ইউনিয়ন পরিষদ বা কাউন্টির মতো ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে স্থানীয় মুরব্বিদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, যাকে বলা হতো ‘কাউন্সিল অব এল্ডার্স’। এই কাউন্সিল সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজস্ব আদায়, পুলিশি ব্যবস্থা তদারক এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাসমূহের নিষ্পত্তি করতেন। সুজানাদের গ্রামের কাউন্সিল অব এল্ডার্সের সদস্য ছিলেন দুজন বয়স্ক মানুষ, যাদের কুকর্মের কারণেই বাইবেলে সুজানার কাহিনী ঠাঁই পেয়েছে।

সুজানার অপরূপ রূপ লাবণ্য দেখার পর আলোচিত দুই বৃদ্ধ প্রবলভাবে কামাতুর হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সুজানা যখন তার স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে বের হতেন অথবা তার কাজের মেয়েটিকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী বাগানবাড়িতে গোসল করতে যেতেন তখন বৃদ্ধদ্বয় রাস্তার পাশের কোনো বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়ে সুন্দরী ললনার দেহসৌষ্ঠব দেখার চেষ্টা করতেন। তারা সুজানাকে একান্তে পাওয়ার জন্য ক্রমেই পাগলপারা হয়ে ন্যায়নীতি ভুলে গেলেন এবং নিজেদের বাসনা চরিতার্থ করার জন্য উপায় খুঁজতে লাগলেন। ঘটনার দিন সুজানা তার কাজের মেয়েটিকে নিয়ে গোসল করছিলেন। হঠাৎ কি মনে করে তিনি কাজের মেয়েটিকে বাড়ি থেকে তেল নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দিলেন। বৃদ্ধরা সুজানাকে নির্জনে পেয়ে সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য এগিয়ে গেলেন এবং নিজেদের কুপ্রস্তাব পেশ করলেন। সুজানা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বৃদ্ধদের প্রত্যাখ্যান করলে তারা তাকে জোরজবরদস্তির মাধ্যমে ভোগ করতে উদ্যত হলেন। এ অবস্থায় সুজানা চিৎকার দিলে বৃদ্ধরা পালিয়ে যান এবং তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি প্রদান করেন।

কাউন্সিল অব এল্ডার্স সুজানার বিরুদ্ধে নিজেদের আদালতে ব্যভিচারের অভিযোগ আনালেন এবং নিজেরাই মামলার চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে আদালতে বললেন যে, সুজানা জনৈক যুবকের সঙ্গে যখন ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলেন তখন তারা ঘটনাটি দেখে ফেলেন। বিচার বিভাগ তখনো নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হতে পারেনি এবং আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ, ওকালতি, সাক্ষীদের ক্রস এক্সামিনেশন বা আলাদা করে পৃথকভাবে সাক্ষ্য নেওয়ার রীতিও চালু ছিল না। কাউন্সিল অব এল্ডার্স একাধারে নির্বাহী বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং অন্যদিকে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তারা অভিযোগ গ্রহণ করতেন, অথবা নিজেরাই সুয়োমটো রুল জারি করতেন। তারা যদি নিজেরা সাক্ষ্য দিতেন তবে অন্য কোনো সাক্ষের দরকার পড়ত না। ফলে সুজানার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন এবং তার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করতে তাদের একটুও বেগ পেতে হলো না। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী ব্যভিচারী নারীকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে হত্যা করা হতো। সুজানার বিরুদ্ধে রায় কার্যকর করার জন্য দুরাচার বৃদ্ধদ্বয় ব্যাপক লোকসমাগম করলেন।

হাজার হাজার লোকের বিশাল সমাবেশ অসহায় এবং দরিদ্র সুজানার রক্ত দেখার জন্য এবং তার করুণ আর্তচিৎকার শোনার জন্য উল্লাস করতে আরম্ভ করল। আগেই বলেছি যে, সুজানাকে সবাই সৎ চরিত্রের ধার্মিক মহিলা হিসেবেই জানত। কিন্তু তার বিপদের সময় কেউ মুখ খুলল না, বরং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় যদি কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও তার সৌন্দর্যময় উলঙ্গ শরীর দেখার সুযোগ পাওয়া যায় এমন লোভ অনেককে পেয়ে বসল। জনতার উল্লাসধ্বনির মাঝে দানিয়েল নামের জনৈক যুবক চিৎকার করে বলল— আমি বিশ্বাস করি না সুজানা এমনটি করেছেন এবং বৃদ্ধরা সত্য বলেছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় জনতার উল্লাসধ্বনি থেমে গেল। তারা প্রথমে ভয় পেয়ে গেল— তারপর বলে উঠল তা তুমি কী করতে চাও? দানিয়েল বললেন— আমি শুধু দুই সম্মানিত বৃদ্ধকে আলাদা করে আপনাদের সামনে দুটি প্রশ্ন করতে চাই। উপস্থিত জনতা হর্ষধ্বনি দিয়ে দানিয়েলকে সমর্থন জানাল। ফলে বৃদ্ধদ্বয় প্রকাশ্যে জনসভায় সাক্ষ্য প্রদানে বাধ্য হলেন।

দানিয়েল প্রথম বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি কখন এবং কোথায় সুজানাকে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে দেখেছেন। উত্তরে বৃদ্ধ জানালেন— তিনি চাঁদনী রাতে একটি গাছের নিচে সুজানাকে অপকর্ম করতে দেখেছেন। এরপর দ্বিতীয় বৃদ্ধকে একই প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাব দিলেন যে, দিনের আলোতে ফসলের মাঠে অপকর্মটি হয়েছিল। উপস্থিত জনতা ক্ষোভ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। কিছুক্ষণ পূর্বে যারা সুজানার মৃত্যুদণ্ড দ্রুত কার্যকর করার জন্য চিৎকার-চেঁচামচি করছিল সেই তারাই এখন দুই বিচারকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য হৈচৈ আরম্ভ করে দিল। ফলে দুই চরিত্রহীন এবং লম্পট বৃদ্ধের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সাক্ষ্যগ্রহণের পদ্ধতি। অন্যদিকে আইন আদালতের ইতিহাসে প্রথম আইনজীবী বা উকিল হিসেবে দানিয়েলের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হতে থাকল।

দানিয়েলকে কোনো কোনো ঐতিহাসিক একজন সাহসী যুবক হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তাকে আল্লাহ প্রেরিত বিশেষ মানব এবং মুসলমানরা নবী বলে স্বীকার করেন। অন্যদিকে আইন বিজ্ঞানের শিক্ষক, আইন পেশার লোকজন এবং বিচারাঙ্গনের বিচারকগণ তাকে মানব জাতির প্রথম উকিল হিসেবে সম্মানের আসনে বসিয়ে তার জীবন থেকে নিজেদের জন্য শিক্ষণীয় উপকরণ গ্রহণ করেন। তাদের মতে— দানিয়েল ছিলেন নির্ভীক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানবিক সাহসসমৃদ্ধ একজন স্পষ্টভাষী বাকপটু মানুষ। তিনি যখন সুজানার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন তখন একটিবারের জন্যও নিজের লোভ, লালসা কিংবা স্বার্থের কথা চিন্তা করেননি। পরবর্তীতে নিজের কর্মের জন্য সুজানার পরিবারের কাছে অর্থ বা অন্য কোনো স্বার্থ আশা করেননি। একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ, একজন মজলুমকে সাহায্য এবং একটি মিথ্যাকে কবর দিয়ে সেখানে সত্য ও সুন্দরের ফুলবাগান রচনা করাই ছিল দানিয়েলের উদ্দেশ্য।

দানিয়েল ক্ষমতাধর দুই বৃদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে জনসভায় প্রতিবাদ করার মাধ্যমে যুগ যুগান্তরের আইনজীবীদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বৃদ্ধদের প্রতি তার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ, ঈর্ষা অথবা রাগ বিরাগ ছিল না। অন্যদিকে বৃদ্ধদের ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তিকে অতিক্রম করে দানিয়েলের সাহসী উচ্চারণের মধ্যে যে নৈতিক মনোবল আদর্শ এবং সৎ সাহসের পরিচয় পাওয়া যায় সেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের উকিলদের সফলতা ও স্বার্থকতার মূলমন্ত্র হিসেবে সর্বকালে গুরুত্ব বহন করে আসছে। তিনি ক্ষমতার দালালি করেননি, শাসকদের রক্তচক্ষুর পরোয়া করেননি এবং একটিবারের জন্যও নিজের স্বার্থের কথা ভাবেননি। ওকালতি পেশা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করে প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স নগরীতে। গ্রিক সভ্যতার পুরোটা সময় কোনো উকিল তার মক্কেলদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক নিতে পারত না। এমনকি সামান্য উপহার গ্রহণও সেই সময়কালে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। পেশাটিকে অত্যন্ত মহৎ আভিজাত্যপূর্ণ এবং সেবামূলক কর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অভিজাত পরিবারের শিক্ষিত ও সচ্ছল লোকদের মানবকল্যাণের একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ৪০৫ খ্রিস্টাব্দে এথেন্স সুপ্রিমকোর্ট এই মর্মে রায় প্রদান করে যে, কোনো উকিল যদি তার মক্কেলের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন তবে তা ঘুষ বলে বিবেচিত হবে। গ্রিসের পর বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু যখন রোমে চলে এলো তখন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের ব্যাপ্তি আরও বৃদ্ধি পেল। উকিলদের কাজের পরিধিও বেড়ে গেল বহুগুণ। তারপরও কোনো আইনজীবী হাত পেতে বা দরদাম করে তাদের মক্কেলদের কাছ থেকে কিছু নিতে পারতেন না।

সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সময়কালে উকিলরা লম্বা এবং কালো রঙের বিশেষ গাউন পরিধান আরম্ভ করেন। তারা গাউনের পেছনে ঘাড়ের দিকটায় ছোট্ট একটি পকেট স্থাপন করেছিলেন। কোনো মামলা শেষে কোনো ক্লায়েন্ট যদি খুশি হয়ে ২/১টি স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা দিতে চাইত তবে সে উকিলের অজান্তে তার কালো গাউনের পকেটে তা ফেলত। উকিল বাড়িতে ফেরার পর কোনো কোনো দিন ২/১টি মুদ্রা পেতেন আবার কখনো কিছুই পেতেন না। এভাবেই ওকালতি পেশাটি ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করতে থাকে। আইনের ভাষায় ওকালতি একটি সম্মানিত পেশা— কোনো অবস্থাতেই এটিকে ব্যবসা বলা যাবে না। ফলে কোনো উকিল তার পেশার ব্যাপ্তি ও প্রসারতার জন্য আইনত কোনো বিজ্ঞাপন দিতে পারেন না— এমনকি নিজ অফিসের বাইরে বড় সাইনবোর্ড টানানোও নিষিদ্ধ। উকিলরা তাদের মক্কেলদের সঙ্গে নিজেদের পারিশ্রমিকের ব্যাপারে কোনো চুক্তি যেমন স্বাক্ষর করতে পারেন না তেমনি নিজেদের পারিশ্রমিক আদায়ের জন্য ক্লায়েন্টের বিরুদ্ধে মামলাও করতে পারেন না।

১২১৫ সালে বিখ্যাত ম্যাগনাকার্টা স্বাক্ষরের পর বিচারক এবং আইনজীবীরা একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হতে থাকেন। ‘জাস্টিস ডিলে— জাস্টিস ডিনাইড’ এই শব্দমালার সঙ্গে ‘উই উইল নট সেল জাস্টিস’ বাক্যটিও যে ম্যাগনাকার্টা দলিলে অন্তর্ভুক্ত ছিল তা হয়তো অনেকেই জানেন না। সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে এবং স্বাধীনতার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে বিচারপতি মার্শালের আমলে বিচারালয় হয়ে ওঠে অনেক মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার আশ্রয়স্থল। সভ্যতার ক্রমবিকাশে, দেশ, জাতি ও সমাজ গঠনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়েও বিচার বিভাগকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিতর্ক শুরু হয়েছে। তারা রাষ্ট্র এবং জাতিসত্তাকে একত্র করে দেখতে নারাজ। তাদের মতে জর্জ ওয়াশিংটন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক রাষ্ট্রটির জনক হতে পারেন। তবে তারা কোনো অবস্থাতেই জর্জ ওয়াশিংটনকে মার্কিনিদের জাতির পিতা বলতে নারাজ। তারা মার্কিন জাতির পিতা হিসেবে বিচারপতি মার্শালকে স্বীকৃতি দিতে চান। কারণ বিচারপতি মার্শাল না হলে মার্কিন জাতিসত্তা গঠন হওয়া তো দূরের কথা— রাষ্ট্রটি আদৌ টিকত কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।

আধুনিক আইন-বিজ্ঞানের ধারণা মতে, আইন পেশায় নিয়োজিত সম্মানিত নাগরিকবৃন্দ যদি রাজনীতির প্রভাবমুক্ত না হতে পারেন তবে পেশাটির সম্মান ও মর্যাদা কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতে পারে না। তাদের শিক্ষাদীক্ষা, রুচিবোধ এবং আভিজাত্যের ওপর একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, রাজনীতি এবং সুশাসন নির্ভর করে। তারা যেমন মামলাবাজ লোকজন পয়দা করবে না তেমনি নিজেরা মামলাবাজ লোকদের হাতিয়ার হবে না। তারা মামলা গ্রহণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবে এবং ভিত্তিহীন ভুয়া মামলা থেকে বিচারাঙ্গনকে পূতপবিত্র রাখার জন্য দায়িত্ব পালন করবে। ভারতবর্ষের ভুয়া মামলার ব্যাপারে ব্রিটিশ জমানার প্রিভি কাউন্সিলের একটি বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ আজও আইন অঙ্গনকে লজ্জায় ফেলে দেয়। সম্মানিত পাঠকের জ্ঞাতার্থে মামলার বিষয়বস্তু সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো— ব্রিটিশ আমলে ভারতের একটি মুন্সেফ কোর্টে জনৈক ব্যক্তি অভিযোগ দায়ের করল যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির গরু তার জমির ফসল নষ্ট করে ফেলেছে। মামলা মুন্সেফ কোর্ট থেকে জেলা কোর্টে গেল। তারপর জেলা থেকে গেল হাইকোর্টে। হাইকোর্টের রায়ে বিক্ষুব্ধ পক্ষ মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন করল। প্রিভি কাউন্সিল মামলার সব কাগজপত্র দেখে রায় প্রদান করল যে, ‘অভিযোগকারীর কোনো জমি ছিল না এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিরও কোনো গরু ছিল না। ’ (The Plantiff had no land and the defandent had no cow!)

যুগ-যুগান্তর এবং কাল-কালান্তরের সুমহান আইন পেশাটি বর্তমানকালে কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তা নিচের কৌতুক থেকেই আন্দাজ করা যায়।

‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ওষুধ কোম্পানির গবেষণা বিভাগ নিজেদের গবেষণাগারে ইঁদুরের পরিবর্তে উকিলদেরকে ব্যবহার করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে পত্র-পত্রিকা এবং অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে প্রেস রিলিজ দিল। সাংবাদিকরা ওষুধ কোম্পানির গবেষণাগারে ভিড় জমাল এবং হঠাৎ এমনতরো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ জানতে চাইল। উত্তরে ওষুধ কোম্পানি তাদের গবেষণাগারে ইুঁদরের পরিবর্তে উকিল ব্যবহারের জন্য তিনটি কারণ পেশ করল। প্রথমত. উকিলের সংখ্যা ইঁদুরের সংখ্যার চেয়েও ভয়াবহ রকমভাবে বেড়ে গেছে।   দ্বিতীয়ত. মানুষ যদি ইঁদুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়, বিশ্বাস স্থাপন করতে চায় এবং ইঁদুরের কাছে কিছু আমানত রাখতে চায় তবে তা যতটা না কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ তার চেয়েও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হলো একই কর্ম উকিলদের সঙ্গে করা।   তৃতীয়ত. ইদানীং উকিলরা সচরাচর এমন সব কর্ম করে বেড়ায় যা সাধারণত ইঁদুরেরা করে না।

     লেখক : কলামিস্ট।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow