Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৪
ধৈর্যশীলদের জান্নাত দান করা হবে
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
ধৈর্যশীলদের জান্নাত দান করা হবে

দুনিয়ার এ জীবন আমাদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মাত্র। জীবনের বাঁকে বাঁকে পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া এবং পরীক্ষা দিয়ে যাওয়া জীবন সৃষ্টির উদ্দেশ্য।

  আল্লাহ বলেন, ‘তিনি বড়ই মহান ও শ্রেষ্ঠ যার হাতে রয়েছে (সৃষ্টিলোকের) রাজত্ব। আর তিনি প্রতিটি জিনিসের ওপর শক্তিমান।   তিনি জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন— যাতে তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন, তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে কে বেশি ভালো। তিনি মহাশক্তিশালী ও ক্ষমাশীল। (সূরা আল-মুলক : ১-২। ) মহান আল্লাহ বিভিন্নভাবে আমাদের পরীক্ষা করে থাকেন। কখনো সুখ দিয়ে কখনো দুঃখ দিয়ে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে, ধন-সম্পদ ও শস্যের অভাব দিয়ে, আর জীবনের দুঃসংবাদ দিয়ে। সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। ’ (সূরা বাকারা : ১৫৫)।

জীবনের প্রতিটি বাঁকে সুখে-দুঃখে স্মরণ রাখতে হবে দয়াময় প্রভুকে। সুখের সময় আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রভুকে ভুলে গেলে চলবে না। আবার দুঃখের সময়ও কষ্টে মুষড়ে পড়ে ধৈর্যহীন বান্দার পরিচয় দেওয়া যাবে না। সুখের সময় কৃতজ্ঞ আর দুঃখের সময় চরম ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া অনুগত বান্দার একান্ত কর্তব্য। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কখনো কোনো বিপদ এলে যারা বলে, আমরা আল্লাহর জন্য, আল্লাহর দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে— এদের ওপর তাদের প্রভুপ্রেম ও দয়া অঝোর ধারায় বর্ষিত হয়। আর জেনে রাখ! এরাই সঠিক সুপথগামী। ’ (সূরা বাকারা : ১৫৬-৫৭)।   সবরের আলোচনায় প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসির (র.) বলেন, ‘বিপদে-আপদে হতাশ না হয়ে ধৈর্য অবলম্বন করা ওয়াজিব। ’ দলিল হিসেবে তিনি এ আয়াত পেশ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘ওহে তোমরা যারা ইমান এনেছ! তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে রয়েছেন। ’ (সূরা বাকারা : ১৫৩)। হাদিস শরিফে এসেছে ‘রসুল (সা.) কোনো মুসিবতে পড়লে হা-হুতাশ করতেন না। তিনি (সা.) সঙ্গে সঙ্গে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। ’ (ইবনে কাসির। )

সবর তথা ধৈর্য অবলম্বনের মর্যাদা অনেক। ইমাম জায়নুল আবেদীন (র.) ধৈর্যশীলদের মর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে কাসির তার তাফসিরে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। ‘কেয়ামতের দিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে— ধৈর্যশীলরা কোথায়! আপনারা বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যান। ঘোষণা শুনে একদল লোক বেহেশতের পথে রওনা করবে। ফেরেশতারা বলবে, আপনারা কারা? কোথায় যাচ্ছেন? তারা বলবে, আমরা ধৈর্যশীল বান্দা; জান্নাতে যাচ্ছি। ফেরেশতারা বলবে, এখনো তো হিসাব-নিকাশ হয়নি। ধৈর্যশীল বান্দারা বলবে, আমাদের হিসাবের আগেই জান্নাতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবার ফেরেশতারা বলবে, তাহলে আপনারা তো খুবই মর্যাদান ও আমলদার বান্দা। আপনাদের সেই আমল সম্পর্কে বলুন যার বিনিময়ে এ গৌরবময় ফলাফল অর্জন করেছেন। তারা জানাবেন, দুনিয়ার জীবনে আমরা সবরের জীবনযাপন করেছি। আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে ও আল্লাহর বিধান মানতে গিয়ে অনেক ধরনের ত্যাগ ও বিপদের মুখোমুখি হয়েছি। এর বিনিময়ে আমরা কখনো অভাব-অভিযোগ করিনি। সব সময় ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি। এসব শুনে ফেরেশতারা বলবেন, মারহাবা! আপনাদের আমলের যথার্থ প্রতিদানই আপনারা পেয়েছেন। ’ এদের সম্পর্কেই আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান বিনা হিসাবে দেওয়া হবে। ’ (সূরা আজ-জুমার : ১০)। ধৈর্যের প্রতিদান সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি যখন মুমিন বান্দার কোনো আপনজনকে মৃত্যু দিই আর সে ধৈর্য অবলম্বন করে, তখন আমার কাছে তার একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত। ’ (সহি বুখারি)। ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতাময় মুমিনের জীবন। তাই তো রসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের জীবন কতই না আশ্চর্য এবং চমৎকার জীবন! যখন সে সুখে থাকে তখন আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে। আর যখন সে বিপদে পড়ে তখন ধৈর্য ধারণ করে। এ দুটিতেই তার দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ রয়েছে। ’ (মুসনাদে আহমাদ। ) আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে খুব আফসোস হয়। চারদিকে এত মুমিন-মুসলমান, অথচ ধৈর্যশীল বান্দা পাওয়া কঠিন। সব মুসলমান নিজেকে কোরআনের অনুসারী দাবি করছে; কিন্তু কোরআনে বর্ণিত গুণাবলির সমাহার নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। মুমিন জীবনের ধৈর্য পরীক্ষা অনেকভাবে হতে পারে। মিথ্যার বাজারে সত্যের পথে কোনোরকম টিকে থাকাও এক ধরনের ধৈর্য। হারামের সয়লাবে হালাল পথে জীবিকা অর্জন এবং এর ওপর খুশি থাকাও ধৈর্যের পরিচয়। মুসলমান ভাইদের থেকে কষ্ট পেয়েও সন্তুষ্ট থাকার নাম ধৈর্য। দাওয়াতের কাজে গিয়ে গালি খেয়ে হাসি দিয়ে বরণ করার যোগ্যতাও ধৈর্যের মাধ্যমেই অর্জন হয়।   কিন্তু আজকের দায়ীদের মধ্যে ধৈর্যের পরিচয় কোথায়?  মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে দীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং ধৈর্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow