Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০২
ধারাবাহিক উপন্যাস
অটোমান সূর্য সুলতান সুলেমান - র্পব ২১
রণক ইকরাম
অটোমান সূর্য  সুলতান সুলেমান - র্পব ২১

মুসলিম শাসকদের মধ্যে যেমন শীর্ষে, তেমনি পৃথিবীর ইতিহাসেও অন্যতম সেরা শাসক তিনি। সুলতান সুলেমান খান। অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান। এই শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল রাজ্যের সেরাগ্লি বা হেরেম। রাজ্যের ক্ষমতাশালী সব নারীর বসবাসই ছিল এখানে। আবার কখনো কখনো সাধারণ যৌনদাসী থেকে সুলতানা হয়ে বিশ্ব কাঁপিয়েছেন কেউ কেউ। সুলতান সুলেমানকে নিয়ে অনেক গল্প লেখা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে আলোচিত-সমালোচিত টিভি সিরিয়াল মুহতাশিম ইউজিয়েল। আমাদের এই উপন্যাসের ভিত্তি সেই টিভি সিরিজ বা উপন্যাস নয়। মূলত ইতিহাসের নানা বইপত্র ঘেঁটে সুলতান সুলেমানের আমলটি তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিহাস আশ্রয়ী এই উপন্যাসের মূল ভিত্তি অটোমানদের ইতিহাস। বাকিটুকু লেখকের কল্পনা। উপন্যাসের শুরুর দিকে যুবরাজ সুলেমানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন পাঠক। সুলেমানের বাবা সুলতান প্রথম সেলিমের সর্বশেষ বিজয়, অসুস্থতা ইত্যাদি পথপরিক্রমায় সুলতান হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন সুলেমান। এর মধ্যেই হেরেম সংস্কৃতি, প্রাসাদ, প্রশাসনসহ নানা দিক উঠে এসেছে। সুলেমান খানের ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন সূর্যোদয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করে অটোমান সাম্রাজ্য। সে যাত্রায় পীরে মেহমুদ পাশাকে স্বপদে বহাল রেখে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন সুলতান। সবার প্রত্যাশার বাইরে পারগালি ইব্রাহিমকে বানিয়েছেন নিজের খাসকামরা প্রধান। এর মধ্যেই সুলতানের জীবনে যৌনদাসী থেকে প্রিয়পাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন আলেকজান্দ্রা। হেরেমের অভ্যন্তরীণ নানা দিক ছাপিয়ে রোডস অভিমুখে অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন সুলেমান। গল্পের এই পর্যায়ে এসেও চলছে যুদ্ধ প্রস্তুতি। অনেক পাঠকই সব খণ্ড একত্রে পাওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আগামী একুশে বইমেলায় পুরো উপন্যাসটি বাজারে আসবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতি শনিবারের এ বিশেষ আয়োজনে আজ ছাপা হলো একবিংশ পর্ব।

 

কনস্টান্টিনোপলে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে তাজা বারুদের গন্ধ। অস্ত্রাগার নিয়ে উত্তেজিত সুলতান সুলেমান। আগেই বলে রেখেছেন নিজেই আসবেন অস্ত্রাগার পরিদর্শনে। সেই মতো সবাইকে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন সব অস্ত্রশস্ত্র। রাত অনেক হয়েছে। এরপরও এতটুকু কমেনি অস্ত্র নির্মাণের ব্যস্ততা। সুলতানের নির্দেশেই দিন-রাত কাজ চলছে। সুলেমানের এই পরিদর্শনসঙ্গী হিসেবে আছেন পীরে মেহমুদ পাশা, পারগালি ইব্রাহিম, আহমেদ পাশাসহ অন্য সবাই। ঘণ্টা দুয়েক ঘোরাঘুরির পর সবাইকে নিয়ে ছোট্ট একটা বৈঠক সেরে নিলেন। যার যার রণকৌশল প্রস্তাবনা সুলেমানের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। এরপর সুলতান নিজে চূড়ান্ত রণকৌশল নির্ধারণ করবেন। সভাসদরা বিদায় নিলেও সেখানেই রয়ে গেলেন সুলতান ও পারগালি ইব্রাহিম। অস্ত্র কারখানার শ্রমিক, রাতের পাহারার দায়িত্বরত সৈনিকরা ছাড়া এখন কেবল সুলতান সুলেমান খান এবং পারগালি ইব্রাহিম পাশা।

‘সুলতান... রাত তো অনেক হলো। ঘরে ফিরবেন না?’

‘ঘরে তো প্রতিদিনই ফিরি ইব্রাহিম। কিন্তু এখানে কী প্রতিদিন আসি? এই জায়গাটাকে আমি অসম্ভব রকম ভালোবাসি। মনে রেখো আমার বিজয়ের যাত্রা এখান থেকেই শুরু হবে। ঠিক দেখবে বিশ্বজয় করে ফেলেছি আমরা। আল্লাহ যদি সহায় থাকেন, তাহলে আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না।’

‘নিশ্চয়ই সুলতান। আপনার হাত ধরেই অটোমানদের পতাকা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে। আপনার নির্দেশে যে কামান তৈরি হচ্ছে সেই কামানের সামনে কোনো শত্রুবাহিনীই টিকতে পারবে না। সবার পতন নিশ্চিত।’

‘দেখ ইব্রাহিম এই কামান আমার অনেক দিনের স্বপ্ন।  আমাদের তৈরি কামান শক্তিশালী শত্রুর বুকেও কাঁপন ধরিয়ে দেবে। আমি চাই অটোমানদের ভয়ে শত্রুরা তটস্থ থাকুক। ন্যায়বিচার আর সুশাসনের যে ধারা অটোমানরা তৈরি করেছে সেটি ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়।’

অস্ত্র কারখানার ঠিক পাশেই কাঠের পাটাতনে বসে কথা বলছিলেন সুলেমান আর ইব্রাহিম। সুলতান হোন আর যেই হোন— এখানে এর চেয়ে ভালো বসার জায়গা করা সম্ভব না। এই সত্য সুলতানেরও জানা। এরপরও এখানে বসে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন তিনি। চারদিকে বার বার মুগ্ধতার দৃষ্টি। পরম মমতার চোখে দেখে নিচ্ছেন মানববিধ্বংসী সব অস্ত্র। ফাঁকে ফাঁকে চলছে ইব্রাহিমের সঙ্গে টুকটাক আলাপন। রাত গভীর হচ্ছে। অন্ধকারের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে চোখের দৃষ্টি। হঠাৎই  দুম করে লাফিয়ে উঠলেন পারগালি ইব্রাহিম। এক ঝটকায় সুলেমানকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলেন। ইব্রাহিম এত দ্রুত লাফিয়ে পড়লেন যে কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না সুলতান। পাশ ফিরে তাকাতেই নজরে এলো মুখোশধারী এক আততায়ী। ছিটকে পড়া সুলতান এমন অতর্কিত হামলায় থমকে গেলেন। শত্রুর সঙ্গে তুমুল ধস্তাধস্তি চলছে। সুলেমান যতক্ষণে এগিয়ে গেলেন ততক্ষণে কয়েকজন রক্ষী এসে আটকে ফেলল লোকটাকে। পারগালির হাত গড়িয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। শত্রুর ছোরা বিদ্ধ করেছে তাকে! সুলেমানের নজরে পড়তেই চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি।

‘হেকিমকে খবর দাও দ্রুত।’

নিজের রুমালে পারগালির হাত বেঁধে দিলেন সুলতান। তখনো হাত থেকে রক্ত ঝরছে। সুলতান বেশ বুঝতে পারছেন, হামলাটা তার ওপরই হয়েছিল। বরাবরের মতোই  তার জীবন রক্ষা করেছে পারগালি।

‘কে এই বেইমান? নিমকহারাম? তোমরা সবাই কোথায় ছিলে? ওর এত বড় সাহস যে আমাদের সুলতানকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে!’

পারগালির কণ্ঠে প্রবল দৃঢ়তা।

সুলতানের সামনে এমন উঁচু গলায় কখনোই কথা বলেনি সে। কিন্তু এই মুহূর্তের ব্যাপারটা একেবারে ভিন্ন। যেভাবে আক্রমণ হয়েছে তাতে সুলেমানের যে কোনো কিছু হয়ে যেতে পারত!

‘ইব্রাহিম, তুমি আহত হয়েছ। এখন তুমি আর উত্তেজিত হয়ো না। আমি সব সামলে নেব।’

হেকিম আসতেই দ্রুত ইব্রাহিমের ক্ষতস্থানে ওষুধ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন সুলেমান। ইব্রাহিমের ক্ষতটা খুব বেশি মারাত্মক না হলেও একেবারে অল্পও নয়। কম করে হলেও এক-দুই দিন বিশ্রাম লাগবে। বাম হাতের কনুইয়ের নিচ থেকে অনেকখানি কেটে গেছে। হেকিম পরিচর্যা শুরু করেছেন। এতক্ষণ ঠিক থাকলেও ক্ষতস্থানে মলম পড়তেই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন পারগালি ইব্রাহিম।

ওদিকে আক্রমণকারী লোকটাকে কেউ চিনছে না। রক্ষীদের দাবি এরা কেউই আগে কখনো দেখেনি একে। আবার লোকটাকে বার বার জিজ্ঞেস করার পরও কোনো কথা বলছে না। এখানে আর কথা না বাড়িয়ে বন্দীশালায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো তাকে। তার বিষয়ে বাকি সিদ্ধান্ত কাল হবে। আজ আর ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই।

নিজের খাসকামরায় ফিরে ফজরের নামাজ আদায় করলেন সুলতান। রাতের ঘটনাটা বেশ পোড়াচ্ছে। এমন তো হওয়ার কথা নয়। ইব্রাহিম না থাকলে যে কী হতো! মাহীদেভরানের কাছে ফেরা যেত। কিন্তু রাত এত বেশি হয়ে গেছে যে সেদিকে আর পা বাড়াতে ইচ্ছা করেনি। সুলতান সেদিকে যাননি তাতে কী? এমন খবর কি আর চাপা থাকে? মাহীদেভরানের কানে ঠিক খবর চলে গেছে। সুলতানের নামাজ শেষ হতে না হতেই সেখানে এসে উপস্থিত হলেন মাহীদেভরান। একাই ছুটে এসেছেন প্রিয়তম স্বামীর কাছে।

‘জাহাপনা... সুলতান... আপনি ঠিক আছেন তো? আপনার কোথাও লাগেনি তো?’

দৌড়ে এসে স্বামীর কাছে দুই হাত মেলে জানতে চাইলেন মাহীদেভরান।

‘না মাহীদেভরান। এতটা বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। আমি সুস্থ আছি। আমার কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু তুমি এই অসময়ে এখানে কেন ছুটে এলে?’

সুলেমানের চোখে-মুখে প্রশান্তির বদলে কিঞ্চিত বিরক্তি।

মাহীদেভরানের চোখে-মুখে সেই দিন পুরনো আকুতি।

‘আপনার ওপর হামলা হয়েছে, এমন খবর শোনার পরও কী আমি স্থির থাকতে পারি?’

‘আমার ওপর হামলা হয়নি মাহীদেভরান। হামলা করার চেষ্টা বলা যেতে পারে। সেই চেষ্টা আবার পুরোপুরি ভণ্ডুল করে দিয়েছে পারগালি। তার হাত অনেকখানি কেটে গেছে। নিজের জীবন বাজি রেখে আরও একবার আমার জীবন বাঁচাল পারগালি। তুমি বরং তাকে একবার দেখে আসতে পার।’

‘পারগালির কাছে সত্যি আমাদের ঋণ বেড়ে গেল। আল্লাহ তাকে দ্রুত সুস্থ করে দিন। কিন্তু কোথায় গেলে পাওয়া যাবে ওকে।’

‘এই তো পাশের ঘরেই। তবে এতক্ষণে ওর ঘুমিয়ে পড়ার কথা। তুমি বরং সকালেই ওকে একবার দেখে যেও।’

‘রাতের বাকিটা সময় কী আমি আমার সুলতানের সঙ্গে কাটাতে পারি না?’

মাহীদেভরানের চোখ দুটো ছলছল করে উঠছে। সুলেমান কয়েক দণ্ড ভাবলেন।

‘না আপাতত তুমি চলে যাও মাহীদেভরান। আমি কিছুটা সময় একলা থাকতে চাই। যে ঘটনাটা ঘটে গেল সেটি আমাকে অস্থির করে তুলেছে। এর সুরাহা দরকার।’

‘সে কারণেই আমি জাহাপনার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চাই।’

‘আবার মুখের ওপর কথা হচ্ছে? আমি বলেছি চলে যাওয়ার জন্য। এরপরও কিসের কথা?’

একটু যেন রেগেই গেলেন সুলেমান। আর কথা বাড়ালেন না মাহীদেভরান।

টুক করে বিদায় নিয়ে নিলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও কয়েকবার সুলতানের দিকে ফিরে তাকালেন তিনি। তার প্রবল আকুতিভরা সেই দৃষ্টি সুলতানকে ছোঁয়া তো দূরের কথা নজরও কাড়ল না।

সুলতান তখন এলোমেলো পায়চারি করছেন। এ ধরনের মুহূর্তে শুয়ে পড়লেও কোনো কাজ হবে না। শত চেষ্টার পরও ঘুমের দেখা মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই খামোখা শুয়ে না থেকে পায়চারি করে করে নিজের মনের দুর্ভাবনা কাটানোর চেষ্টা করছেন সুলতান।

কে এই আক্রমণকারী? কে পাঠিয়েছে তাকে?

নিশ্চয়ই কেউ না কেউ পাঠিয়েছে তাকে। কেউ তাকে চেনে না। কাজেই সে নিজে সুলতানকে শত্রুজ্ঞান করবে কেন? নিশ্চয়ই কারও নির্দেশে সুলেমানকে হত্যা করতে এসেছিল।

বিষয়টাকে একেবারে হাল্কাভাবে নিলে চলবে না। এর পেছনের গল্পটা সুলেমানের অবশ্যই জানা দরকার। এসব ছাইপাশ নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ কেটে গেল। তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। দূরে কোথাও পাখি ডাকছে। সুলেমান তখনো একা একা পায়চারি করে যাচ্ছেন।

সুলেমানের সব ভাবনাকে এক পাশে ঠেলে মনোযোগের পুরোটা দখল করে সেখানে আবির্ভূত হলেন হুররেম খাতুন। মাহীদেভরানের মতোই সুলতানের শরীর আর আঘাতের ঝুঁকি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন। সুলেমান তখনো অবিচল। কেবল ইব্রাহিমের তথ্যটুকু জানালেন হুররেমকে।

হুররেমও ইব্রাহিমের জন্য ব্যথিত হলেন।

এই ফাঁকে অদ্ভুত একটা বিষয় খেয়াল করলেন সুলেমান। মাহীদেভরান যখন এখানে এসেছিল তখন রীতিমতো বিরক্তই লাগছিল তার। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু এখন ক্লান্তি আগের চেয়ে বেড়েছে। সারারাত এতটুকু ঘুম হয়নি। এরপরও হুররেমকে দেখতে খারাপ লাগছে না। হুররেমের সঙ্গে কথা বলতেও বিরক্ত লাগছে না। সত্যি কী একটা সম্মোহনী ক্ষমতা রয়েছে এই মেয়েটার। হুররেমকে বসতে বললেন সুলেমান। কিন্তু বসতে রাজি হলেন না হুররেম।

‘মাফ করবেন সুলতান। আমি আপনার খোঁজ নিতে এসেছিলাম। এখন আর বসবো না। আমি বরং হেরেমে ফেরত যাই। এভাবে চলে আসাটা হেরেমের নিয়মবিরোধী। কিন্তু আপনার এই দুঃসংবাদ শুনে আর ঠিক থাকতে পারিনি। অন্য সময় আপনি ডাকলেই চলে আসব।’

চোখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে সুলতানের দিকে তাকিয়ে বললেন হুররেম। সুলতান কোনো প্রতিবাদ করলেন না। কেবল হুররেমের পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সত্যি কী বিচিত্র মানুষের জীবন!

মাহীদেভরান সুলতানের বিবাহিত স্ত্রী, সন্তানের মাতা। সেই রমণী সুলতানের পাশে থাকতে চাইলেন, সুলতান তাকে পাশে থাকার অনুমতি দিলেন না। রীতিমতো ঝেটিয়ে বিদায় করলেন। আবার হেরেমের সাধারণ দাসী আলেকজান্দ্রা। যার আদুরে নাম হুররেম। সেই দাসীকে স্বয়ং সুলতান পাশে রাখতে চাইলেন, দাসী চলে গেল। এটাই বোধ হয় বিধাতার বিচিত্র নিয়তির বিচিত্র খেল।

‘মনজিলা, তুমি নিজে দেখে এসেছো?’

আয়েশা হাফসা সুলতানের পুরনো অভ্যাস। সব বিষয়েই বার বার নিশ্চিত হতে চান তিনি। সব সময় চেষ্টা করেন নিজের জানার মধ্যে যেন কোনো সীমাবদ্ধতা কিংবা সংশয় না থাকে। সুলেমানের ওপর আক্রমণের ঘটনা শুনে ছুটে যেতে চেয়েছিলেন আয়েশা হাফসা সুলতান। কিন্তু মনজিলা খাতুন তাকে নিষেধ করলেন।

কারণ সকালবেলা সুলেমানই বলে দিয়েছেন, তিনি সুস্থ আছেন। তাকে ঘটা করে দেখতে আসার কিচ্ছু নেই। এই কথাটাই আয়েশা হাফসাকে বুঝিয়ে বললেন মনজিলা। কিন্তু মায়ের মন কী আর মানে? তাই বার বার একই প্রশ্ন।

‘জি সুলতানা আমি নিজে সুলতানের সঙ্গে দেখা করেছি। তার সঙ্গে কথাও বলেছি। তিনি আমাকে নিশ্চিত করেছেন তার এতটুকু ক্ষতি হয়নি। আঘাত যা পাওয়ার সেটা পেয়েছেন পারগালি। কারণ জাহাপনার ওপর আসা আঘাতটা তিনিই নিজের হাতে প্রতিহত করেছেন। তার হাত অনেকখানি কেটেও গেছে। সুলতান আমাকে বলেছেন আমি যেন আপনাকে জানিয়ে দিই যে তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন’।

‘ও আচ্ছা। তাহলে তো ভালোই। আর পারগালির একটু খোঁজ রেখো।’

‘অবশ্যই সুলতানা। আমি এর মধ্যেই ইসাবেলাকে পাঠিয়ে দিয়েছি পারগালিকে দেখাশোনা করার জন্য।’

‘হেকিম দেখেছে?’

‘জি। গতকাল রাতেই সুলতানের নির্দেশে চিকিৎসা করেছেন তিনি। বেশি ক্ষতি হয়েছে?’

‘এক-দুই দিনের মধ্যেই সেরে যাওয়ার কথা।’

‘আচ্ছা। হেকিমকেও বলে দিও খোঁজ রাখার জন্য। আমার সন্তানের জীবন বাঁচিয়েছে ইব্রাহিম। তার পরিচর্যার যেন এতটুকু কমতি না হয়।’

‘অবশ্যই সুলতানা।’

মনজিলা খাতুন মাথা নুইয়ে আয়েশা হাফসার কথায় সম্মতি দিলেন।

‘আসতে পারি?’

কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল ইসাবেলা। হুররেম? এই সময় এখানে।

হুররেমের গলা শুনে পাশ ফিরে তাকালেন পারগালি। ততক্ষণে কক্ষে ঢুকে পড়েছেন হুররেম।

‘এখন কেমন বোধ করছেন?’

‘আমি বরাবরই সুস্থ আছি খাতুন।’

‘ইসাবেলা ঠিকমতো দেখাশোনা করছে তো আপনার।’

‘আলবৎ।’

‘কোনো সমস্যা হলে আমায় বলুন। না হয় আমিই থেকে যাই!’

হুররেমের ঠোঁটে বাঁকা হাসি।

‘না। তার দরকার নেই।’

‘হুররেম তুমি এ সময়ে এখানে কী করছ?’

ইসাবেলার কণ্ঠে বিরক্তি।

‘কেন আসা যাবে না? ইসাবেলা তুমি কী বিরক্ত হয়েছ? হলেও কিছু করার নেই। সুলতানই আমাকে বলেছেন যেন পারগালির খোঁজ রাখি। হাজার হোক তিনি সুলতানের জীবন বাঁচিয়েছেন।’

‘ও!’

ইসাবেলার কণ্ঠে তীব্র শূন্যতা। পাশেই রাখা টেবিলটা গোছানোয় মনোযোগ দিল সে। হুররেম গিয়ে বসলেন পারগালির শিয়রের কাছে। ফিসফাঁস আলাপ হচ্ছে দুজনের। সে কথা টুকটাক পৌঁছে যাচ্ছে ইসাবেলার কানেও।

 

 

চলবে...পরবর্তী পর্ব আগামী শনিবার

এই পাতার আরো খবর
up-arrow