শিরোনাম
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৩:৫৫
প্রিন্ট করুন printer

১৬তম পর্ব

বনবিহারী

আলম শাইন


বনবিহারী

  কালাবনে অবস্থানের তিনদিন পর পরিকল্পনা মোতাবেক মধ্যাহ্নভোজের পরে বিছানায় সামান্য গড়াগড়ি দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গল পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে। মহব্বত দয়াল দোনালা বন্দুকসহ দুই প্যাকেট বিস্কুট, টর্চ আর জলের বোতল ব্যাগে ভরে নিল। বনবাদাড়ে ঘুরতে গেলে এসব সঙ্গে নিতে হয়। বলা যায় না, কখন কী ঘটে। নিরাপত্তার জন্য বন্দুক আর দিক ভুল হলে জলখাবারের প্রয়োজন আছে। সেটি মাথায় নিয়েই জঙ্গল পরিদর্শনে বের হলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নেই। মেঘলার জঙ্গল এত পরিচিত সেখানেও মাঝেমধ্যে দিক ভুল হয়ে যায় আমাদের, আর কালাবন তো একটা অপরিচিত দুর্ভেদ্য জঙ্গল। এখানে দিকভুল হতে কতক্ষণ! শুধু আমরা নই জঙ্গলভ্রমণে প্রত্যেকেরই সতর্ক হয়ে চলতে হয়। আর সবাইকে দলবদ্ধ হয়ে থাকতে হয়। আমার স্টাফদের প্রতি এ ধরনের সতর্কতা নোটিশ আগেই দিয়ে রেখেছি। অবশ্য সাবেক পরিচালক সালেহ দেওয়ান এবং তৈমিজ ছৈয়ালের অপমৃত্যুর পরে নিজ থেকেই সবাই সতর্ক হয়েছে। সবার উদ্দেশ্যে একদিন বলেছিলাম, ‘কাজকর্মের ঘাটতি হলে একসময় পুষিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু জীবন খোয়ালে সেখানেই ইতি।’ তারপর থেকে কেউ আর তেমন একটা অনিয়ম করে না। এখন অবশ্য বুনো কুকুর আর শেয়ালের উপদ্রবও কমেছে; তবে খেপাটে মহিষের আতঙ্ক রয়ে গেছে ঠিকই। বিশেষ করে কালাবনের খেপাটে মহিষের দুর্নাম প্রচুর; তার প্রমাণও আমরা গেল বছর হাতেনাতে পেয়েছিলাম। তৈমিজ ছৈয়ালের মৃত্যুই প্রমাণ করেছিল কালাবনের মহিষ কতটা হিংস্র হতে পারে।

  আমরা দুজন জঙ্গল মাড়িয়ে হাঁটছিলাম, দুর্ভেদ্য লতাঝোঁপের জন্য হাঁটতে খানিকটা বেগ পেতে হচ্ছিল আমাদের। চারদিকে তীব্র নজর রেখেই হাঁটছিলাম। জানি এই জঙ্গলে মহিষ আর সাপ ছাড়া অন্য কোন ধরনের হিংস্র জন্তু জানোয়ার নেই, তার পরেও বিশ্বাস করা যায় না; থাকতেও পারে। কারণ নিবিড় অরণ্যে হিংস্রপ্রাণীদের বসবাস করা বৈচিত্র্যের কিছুই নয়।

   এই জঙ্গলে প্রচুর আষাঢ়ি লতার ঝোঁপ। যার জন্য আমাদের হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এই লতার নাম ‘আষাঢ়ি লতা’ হলেও আষাঢ় মাসের সঙ্গে এর ফুল ফোঁটা বা বেড়ে ওঠার কোন সম্পর্ক নেই। এই লতা লোকালয়ে খুব একটা দেখা যায় না। ভেষজ সমৃদ্ধ বিধায় প্ল্যান্টে এই লতা লাগানো হয়েছিল। আষাঢ়ি লতা আমি রোপণ করিনি, প্ল্যান্টের শুরুর দিকেই লাগানো হয়েছিল। লতাটা কাঁটাযুক্ত; ফুল লাল সাদা। অনেকটাই সেমাইর মতো; ঘ্রাণও চমৎকার। লতায় ফলও হয়, ফল অনেকেই তরকারি হিসেবে খায়। প্ল্যান্টের কেউ খায় না, অন্যান্য ভেষজ মালামালের সঙ্গে প্রক্রিয়া করে শিপমেন্ট করি আমরা আষাঢ়ি ফলও।
  হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম, চারপাশে তীব্র নজর রেখেও কোন বসতির সন্ধান পেলাম না। তবে বসতির সন্ধান না পেলেও সন্ধান পেয়েছিলাম বৃক্ষ নিধনের নমুনা। বড় বড় অনেক গাছ উজাড় করে দিয়েছে দুষ্কৃতিকারিরা। খুব কৌশলে কাজটি করেছে ওরা। গাছ কেটে নিয়ে গোড়ায় আগুন লাগিয়ে শেকড়বাকড়সুদ্ধ জ্বালিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। যাতে কেউ হঠাৎ করে দেখলে বুঝতে না পারে এখানে গাছপালা ছিল। এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে দেখেছি নিঝুম দ্বীপের বনভূমিতেও। এই নিয়ে খবরের কাগজ ও টেলিভিশনে সংবাদ প্রচার হয়েছিল একাধিকবার। একবার সদরে গেলে আমাকে একজন ভিডিওক্লিপ দেখিয়েছিল সেই সংবাদের। ওই একই কৌশল কালাবনেও অবলম্বন করছিল দুষ্কৃতিকারিরা। তা ছাড়াও দেখলাম কিছু কিছু স্থানে আগুন লাগিয়ে জঙ্গল পোড়ানো হয়েছে। জঙ্গল কেন পুড়িয়েছে সেটি বুঝতে পারলাম না এখনো।

  বৃক্ষ নিধনের এই অপকৌশলে আমি খুব চিন্তিত হলাম। তার মানে প্ল্যান্টের জন্য এটি একটি অশানি সংকেত। আমি হিসেব করে দেখলাম, এ কাজ মাস ছয়েক ধরে হচ্ছে। কারণ মাস ছয়েক আগেও এদিকে একবার এসেছিলাম আমি, তখন অনেক গাছ-গাছালির বিস্তার ছিল। তার মানে সম্প্রতি ঘটেছে বৃক্ষ নিধন এবং জঙ্গলে আগুন লাগানো মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড। মূলত শেয়াল কুকুরগুলো নিধনের পর থেকেই কোন না কোন অঘটন ঘটছে দ্বীপ বনে। দুষ্কৃতিকারিদের জন্য জঙ্গল এখন অনেকটাই নিরাপদ; অবাদে চলাফেরা করতে পারে। শুধু মহিষ আর সাপের দিকে নজর রাখলেই অথবা সাবধানে চলাফেরা করলেই ওরা নিরাপদে অপকর্ম চালাতে পারবে।

  কালাবনে একেতো লোকবলের অভাব, তার ওপর এখন হিংস্রপ্রাণীমুক্ত, কাজেই এ জঙ্গল উজাড় হতে খুব বেশি সময় লাগবে না, আমার অভিজ্ঞতা থেকেই তা অনুমান করছি। এ জঙ্গলটা উজাড় হলে কোম্পানি ভীষণ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাতে সমস্ত প্ল্যান্টের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। প্ল্যান্টের অধিকাংশ আয় হয় কালাবনের ভেষজ থেকেই। সুতরাং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কীভাবে নিবো সেটিই এখন ভাবনার বিষয়। প্রহরী নিযুক্ত করে বৃক্ষ নিধন রোধ করা কখনো সম্ভব নয়। তাছাড়া ক’জন প্রহরীই বা নিয়োগ দিতে পারব আমরা? আমাদেরও তো সীমাবদ্ধতা আছে, বেতনাদির বিষয়ও আছে। সবই যদি পাহাদারের পেছনে ব্যয় হয়, তাহলে প্ল্যান্ট লাভজনক হবে না। এই বিশাল জঙ্গল পাহারা দিয়ে রাখা আমাদের দ্বারা সম্ভবও নয়। দুই একজন দুষ্কৃতিকারি ধরা পড়লে অথবা শাস্তি দিলে আবার হিতে বিপরীতও হতে পারে। ওরা সুযোগে সুন্দরবন কিংবা আমাজন জঙ্গলের মতো আগুন লাগিয়ে কালাবন বিনাশ করে দিতে পারে। কাজেই যা করার এখন বুঝেশুনেই করতে হবে। আবার মাথায় রাখতে হবে দুষ্কৃতিকারিদের সঙ্গে আমাদের লোকজনের সম্পৃক্ততা আছে কীনা; যেমনটি হয়েছে কলা চুরির ক্ষেত্রে। যদি সেরকম কিছু হয়েই থাকে তাহলে জঙ্গলের আর রক্ষা নেই।
  আগেই বলেছি, আমার কাছে প্ল্যান্টের ভবিষ্যত ভালো ঠেকছে না। কী থেকে কী ঘটতে চলছে তা ভেবে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। মানুষের সামান্য ভুলের পরিণাম যে কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে সেই চিন্তাই করতে লাগলাম। এই সবুজ বনপ্রান্তর বিলিন হয়ে যাবে একসময়, ভাবতেই আমার কষ্ট হচ্ছিল। যেভাবে বৃক্ষ নিধন শুরু হয়েছে তাতে কয়েক বছর পর দ্বীপ বন তথা কালাবন খটখটে মরুভূমিতে পরিণত হবে। আর সে রকম কিছু হলে তা হবে আমার জন্য ভীষণ বেদনাদায়ক। দ্বীপ বনে আমি বেতনাদির মোহে থাকি না, আমি থাকি সবুজের মোহে, বনের টানে, মনের টানে।
  মহব্বত দয়ালের কথার সত্যতা পেতে যাচ্ছি আমি। সে দুপুরে জানিয়েছে শিশুকণ্ঠের হাসি শুনেছে, তার মানে লোকজনের যাতায়াত রয়েছে কালাবনে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে মহব্বত দয়ালকে বললাম, ‘এবার বাংলোমুখী হও, আর হাঁটতে পারছি না। তাছাড়া হাসির সমাধানও পেয়ে গেছি। তোমার ধারণাই ঠিক, লোকজনের যাতায়াত রয়েছে কালাবনে।’
  রাতে আমার কামরায় সবাইকে ডাকালাম। ওখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে তিনজন প্রহরী, তিনজন শ্রমিক; তারা সবাই এসেছে আমার সামনে। ওরা আসতেই বিভিন্ন আলাপ আলোচনার ফাঁকে জানতে চাইলাম, বৃক্ষ নিধন এবং জঙ্গলে আগুন লাগানোর বিষয়টি। কথাটা শুনেই চারজনই মনে হচ্ছে আকাশ থেকে পড়েছে। বনে এ ধরনের কিছু ঘটতে পারে তা তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না। আমি বললাম, ‘এ কেমন কথা, এতদিন কালাবনে আছ, অথচ এ ব্যাপারে কিছুই জান না, আর আমি তিনদিন অবস্থান করেই তা অবগত হলাম।’

  প্রহরীদের একজন হচ্ছে রইছ উদ্দিন, সে বলল, ‘বড়মিয়া, আমরা দরকার না পড়লে খুব একটা বের হই না। ভয় লাগে; দিনেও ভয় লাগে।’
  ‘কিসের ভয়! শেয়াল কুকুর তো এখন তেমন একটা নেই। ইচ্ছে করলে মহিষ থেকে সাবধানে থাকা যায়, তাহলে ভয়টা কিসের আমাকে একটু খুলে বল?’
  রইছ উদ্দিন বলল, ‘বড়মিয়া আপনি অনুমতি দিলে একটা কথা বলতাম।’
  বললাম, ‘খোলাখুলি বল, আমি সব শুনতে চাই, কোন কথাই গোপন রাখবে না আজ।’
  সে বলল, ‘বড়মিয়া, আমরা বাংলোতে ৬ জন এক কামরায় ঘুমাই, তার পরেও আমাদের ভয় কাটে না। তাছাড়া বাইরে তো খুব একটা বের হই-ই না। গোসল করতে গেলেও ৬ জন একত্রে যাই। এখানে আমাদের একরকম বন্দীজীবন কাটে বড়মিয়া।’
 ‘ভয়টা কিসের বলবে তো?’ আমি জানতে চাইলাম। 
  সে বলল, ‘আমরা পুকুরে নেমে গোসলও করি না। মাছ-টাছ ধরলে খালে গিয়ে মাছ ধরি। অথচ পুকুর ভরা মাছ আর মাছ। এতটাই ভয়পাই পুকুরে নামতে।’
  ‘পুকুরে গোসলাদি করনা তার মানেই বা কি, এসব কি শুনছি!’ আমি বিস্মিত হলাম।
  সে বলল, ‘সত্যি বড়মিয়া, যা শুনছেন তাই-ই সত্যি। ভয়ে এই পুকুরে নামি না আমরা।’
  ‘পুকুরে কেন নাম না তা আমি জানিনা, তবে আমার মন বলছে এটা তোমাদের মনের ভয়। আজ দুপুরেও তো মহব্বত দয়াল পুকুরে গোসল করেছে। তার তো কিছু হয়নি; ভয়ও পায়নি। বরং...।’
  আমার মুখের কথা শেষ না হতেই রইছ উদ্দিন বলল, ‘দয়াল ভাই, ঘটনাটা জানলে বা হাসির আওয়াজ শুনলে পুকুরে নামতেন না কোনদিনও।’
  আমি নড়েচড়ে বসলাম, মহব্বত দয়ালের মুখের দিকে তাকালাম, সেও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মানে ওরাও শুনেছে শিশুকণ্ঠের হাসির আওয়াজ। আমি লুকোচুরি না করে বললাম, ‘দয়াল হাসির আওয়াজ শুনেছে দুইদিন আগে, তাও আমাকে বলেছ সে, তাতে কী হয়েছে, ভয়েরই বা কি আছে এতে?’
  এবার আরেক প্রহরী হরিপদ বলল, ‘বড়মিয়া এ হাসি সেই হাসি না। এটা হচ্ছে মাছের হাসি।’
  ওর কথা শুনে আমি নিজেও হেসে দিলাম এবার। বললাম, ‘মাছের হাসি সেটা আবার কি!’ ছড়া-গল্পে মাছের হাসির কথা শুনেছি, তোমরা আবার বাস্তবেও শুনলে নাকি! আমাকে হাসালে তোমরা।’
  রইছ উদ্দিন বলল, ‘বড়মিয়া এই পুকুরে বহু বছরের পুরানো বড়সড়ো একটা গজার মাছ আছে। শ্যাওলা পড়ে এখন নীলচে কালো হয়ে গেছে মাছটার শরীর। পুকুরে গোসল করতে নামলে মাছটা পালিয়ে যায় না, হাসতে হাসতে কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে। পোলাপানের মতো হাসে; দাঁত বের করে হাসে।’
  বললাম, ‘কী বলছ যা তা। মাছ দাঁত বের করে হাসে, এটাও শুনতে হলো তোমাদের মুখে! তোমরা কালাবন থাকতে চাচ্ছ না এইতো? সোজা বললেই পার কথাটা, আমি তোমাদেরকে এখান থেকে অন্য মৌজায় নিয়ে যেতাম।’
  মহব্বত দয়াল তখন মুখ খুলল, ‘বড়মিয়া ঘটনাটা সত্যি। আমি হাসি শুনেছি তবে মাছ-টাছ খেয়াল করিনি। পুকুরে অনেক মাছ, লাফালাফি করতেও দেখেছি, গজার মাছও দেখেছি কয়েকটা।’ 
  মহব্বত দয়ালের কথা শুনে আমি থ’ মেরে রইলাম; হলাম হতবাকও। মনে মনে আমিও শঙ্কিত হলাম; সেটা ওদের বুঝতে দেইনি। শুধু বললাম, ‘আমাকে শুনাতে পারবে সেই মাছের হাসি!’
  এবার ওদের একজন বলল, ‘আগামীকাল দুপুরে শুনাতে পারব; তবে দুপুরের আগে শুনানো যাবে না। ঠিক যখন সূর্য মাথার ওপর ওঠবে তখন মাছটা দেখা যাবে।’
  জিজ্ঞেস করলাম, ‘কতদিন ধরে হাসি শুনছ?’
  রইছ উদ্দিন বলল, ‘দুই মাসের মতো হবে।’
  ‘তোমরা গোসল করছ কোথায়?’
  ‘জোয়ার এলে খালে নেমে গোসল করি। আমরা সবাই একত্রে খালে যাই।’ রইছ উদ্দিন বলল।
  ‘বাংলোয় কে থাকে তোমরা গোসলে গেলে?’
  ‘কেউ থাকে না। সবাই একত্রে গোসলে যাই।’ 
  ‘বাংলোয় চুরি হলে?’
  ‘আমাদের নেওয়ার মতো কিছু নেই বড়মিয়া। বন্দুক সঙ্গে নিয়ে যাই। আর তেমন কিছু নেইও বাংলোতে, চাল-ডাল, জামাকাপড় ছাড়া।’
  সত্যি এবার চিন্তিত হলাম বিষয়টি নিয়ে। ভাবনায় পড়লাম কালাবনের ভবিষ্যত নিয়ে। তবে কি কালাবন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে? বৃক্ষ নিধন, পিটি প্যারেড, মাছের হাসি এসবই বা কি! যেসব কারণে কেউ থাকতেও চাচ্ছে না কালাবনে। ক’দিনই বা আমি এদেরকে জোর করে বুঝিয়ে শুনিয়ে কালাবনে রাখতে পারব। এরকম হলে তো প্ল্যান্টের বারোটা বেজে যাবে। কালাবন উজাড় হওয়া মানে হচ্ছে প্ল্যান্ট ধ্বংস হয়ে যাওয়া। কোম্পানি যদি লাভবানই না হলো তাহলে প্ল্যান্ট রেখেই বা কি হবে? এমনি এমনিই বন্ধ হয়ে যাবে প্ল্যান্টের সকল কার্যক্রম।
  সেরাত থেকেই শুরু হলো তুুমুল বৃষ্টি। দিনভর অব্যাহত রইল সেই বৃষ্টির ধারা। বিকেলের দিকে বৃষ্টিপাত সামান্য কমে এলেও গজার মাছের দেখা পাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ ছিল না আর। কারণ ওরা আগেই জানিয়েছে, মাছের হাসাহাসি শুনতে হলে সূর্য মাথার ওপরে থাকতে হবে। মেঘাচ্ছন্ন দিনে গজার মাছ পুকুরে ভাসবে না। 
  কী আর করা আমাকে থেকে যেতে হলো কালাবনে সেই রাতেও। মেঘলায় প্রচুর কাজ জমে আছে, তার পরেও থাকতে হচ্ছে। মাছের হাসি না দেখে গেলে অথবা এর সমাধান বের না করতে পারলে আমার যেমন মনে শঙ্কা দূর হবে না, তেমনি আবার স্টাফদেরও ভীতি কাটবে না। কাজেই নিজ চোখে দেখতে হবে বিষয়টা। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আরেকটা দিন কালাবনে অবস্থান করার।
  রাতে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আগামীকালও মেঘাচ্ছন্ন থাকবে। আবহাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল মেঘলায় চলে গেলেই ভালো হতো। অন্যসময় একদিন এসে না হয় রহস্যময় হাসির খোঁজখবর নিয়ে যেতাম। 
  সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি বারান্দার চেয়ারে বসলাম। তখন আঁধার রাত, আশপাশের কিছুই নজরে পড়ছে না। একেতো কৃষ্ণপক্ষ তার ওপরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, দুয়ে মিলে নিকষকালো আঁধার বাইরে। বারান্দার হারিকেন নিভিয়ে দিয়েছি; আঁধারে বসেই আঁধার উপভোগ করব আমি। প্রকৃতিকে উপলব্ধি করতে হলে অথবা জঙ্গলের ভাষা হৃদয়ঙ্গম করতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলাতে হয়, তাহলেই কেবল শ্রবণে আসে প্রকৃতির সেই দুর্ভেদ্য ভাষা। সে বড়ই ধৈর্যের ব্যাপার; সাধনার বিষয়; সবার দ্বারা তা সম্ভবও হয় না।
  বাংলোর সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি একাই বসে আছি বারান্দায়। আমার চোখে ঘুম নেই। রোমহর্ষক কোন কথা শুনলেই আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। গত রাত থেকেই আমার ঘুম হারাম। মাঝেমধ্যে তন্দ্রা আসে ঠিকই, তবে মাছের হাসি, পিটি প্যারেডের কথা মনে এলেই চোখের পাতা আলগা হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। বারান্দায় বসে ছিলাম, তাতেও কেমন জানি ভয় ভয় লাগছে আমার। সত্যি বলতে আমি ততটা সাহসীও নই; ভূতপ্রেতে বিশ্বাস না থাকলেও শঙ্কিত হই অজানা আশঙ্কায়। সেসব কাউকে কখনো বুঝতে দেইনি অবশ্য। বিষয়টি জানতে পারলে তারা আরও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। তাই নিজে নিজেই চেষ্টা করছি ভয়ডর দূর করতে। আরেকটা বিষয় উপলব্ধি করলাম, কেন জানি কালাবন এলে আমার রাতে ঘুম হয় না; শঙ্কিত থাকি সবসময়, কেন এমন হয় ঠিক তা বুঝতে পারিনি।

  সেরাতে শঙ্কা বাড়তেই আমি কামরায় গিয়ে শোয়ে পড়লাম। ততক্ষণে তুমুল বৃষ্টি ঝরছে। টিনের চালে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তেই কেমন জানি এক সুমধুর ঝঙ্কারের সৃষ্টি হলো। মধুর সেই ঝঙ্কার শুনতে শুনতে বৃষ্টিমুখর সেরাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টের পাইনি আর। ঘুম ভেঙ্গেছে পরের দিন সাতটা নাগাদ। জেগে দেখলাম বৃষ্টি থামেনি; তবে ভারিবর্ষণ না হলেও থেমে থেমে ঝরছিল। তাতে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়ে গেল ঠিকই, যার ফলে মাছের হাসি দেখার সুযোগ সেই দিনেও আর হয়নি। বাধ্য হয়ে তাই ওই দিনেই বর্ষাতি পরে মেঘলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। বনকর্মীদের বলে গেলাম, ‘আবার কালাবন এলে গজার মাছের হাসি দেখব। ততদিনে তোমরা তোমাদের নিরাপত্তার দিকে নজর রেখেই চলাফেরা করবে; বিশেষ করে সবাই একত্রেই চলাফেরা করবে, তাতে ভয়-ডর কম পাবে।’
  সেদিন আমি মেঘলায় চলে এলেও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেই বিষয়টা। বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করলাম, কিন্তু বিজ্ঞানে অতটা পরিপক্ক না হওয়ায় সেই ঘটনাগুলোর রহস্যভেদ করতে পারলাম না আজও। 

চলবে...

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য