শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৯ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০২১ ২৩:০৩

সাক্ষাৎকার

‘রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশে গণতন্ত্র চর্চা হয় না’

‘রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশে গণতন্ত্র চর্চা হয় না’

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাবেক উপরাষ্ট্রপতি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে স্বাধীনতার আগেই রাজনীতি শুরু করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মুজিবনগর সরকারের পোস্ট মাস্টার জেনারেল ছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৬ মার্চ তিনি সিঙ্গাপুরে একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। করোনাকাল শুরুর আগে তিনি নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশনকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন সামিয়া রহমান। পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য

 

‘উনারা বলতে থাকলেন যে, এই লোক তো কোনো দিন আওয়ামী লীগ করেনি সে কেন বঙ্গবন্ধুর এত কাছে থাকবে। আমার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এমন সম্পর্ক ছিল যে, আমি গাড়ি চালাতাম আর বঙ্গবন্ধু পাশে বসতেন। পুরো বছর বঙ্গবন্ধু যেখানে যেখানে যেতেন আমি যেতাম উনাকে নিয়ে। এগুলো অনেকের সহ্য হয়নি। তাই আমি আস্তে আস্তে নিজে থেকেই নিজেকে সরিয়ে এনেছি। স্বাধীনতার পরে আমি নিজের পেশায় ফিরে গেছি...’
 

প্রশ্ন : আপনার জীবনটা যেমন কালারফুল তেমনি রহস্যময়, আবার অনেক গল্পও আছে। আপনি আপনার বইগুলোতে অনেক কথাই লিখেছেন। আজকে সবাইকে জানাতে চাইব আপনার জীবনের গল্পগুলো। আপনি খুব অল্প সময়ে বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন, আপনি তখন তরুণ ব্যারিস্টার। কিন্তু কীভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে আপনি বঙ্গবন্ধুর হৃদয় জয় করেছিলেন?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  আমি যখন লন্ডনে লেখাপড়া করতাম, আমরা তখন স্বাধীন পূর্ব পকিস্তান আন্দোলন বলে একটা আন্দোলন শুরু করেছিলাম। মূলত পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের যে বৈষম্যমূলক অবস্থান ছিল তারই প্রতিবাদে সে আন্দোলন। সে জন্য ইস্ট পাকিস্তান হাউস বলে একটা ভবনও আমরা সে সময় ক্রয় করেছিলাম। ‘পূর্ব বাংলা’ এবং  ‘ফ্রিডম অব ইস্ট বেঙ্গল’ নামে দুটি পত্রিকাও বের করতাম। ওই ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আমরা যখন ফিরে এলাম দেশে তখন সুলতান উদ্দিন এবং কামাল উদ্দিন নামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুই সদস্যকে পাকিস্তান সরকার গোয়েন্দা বিভাগ দিয়ে অ্যারেস্ট করে। আমরা ওদের জন্য একটা রিট পিটিশন ফাইল করেছিলাম। ওদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছিল। এর কিছুদিন পরেই পাকিস্তান সরকার একটা তালিকা দিল। বলা হলো- দুই পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য এরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তাই তারা রাষ্ট্রদ্রোহী বলে মামলা দিল। পরে আরও সাতজনের একটা নতুন তালিকা দেওয়া হলো যেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম ছিল প্রথম। এখান থেকেই শুরু হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এই মামলা প্রায় ১১ মাস চলে। আমরা কয়েকজন যারা আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে জড়িত ছিলাম না, আমরা চারজন ব্যারিস্টার বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমরা উনাকে বলি টমাস উইলিয়ামের কথা, যিনি একজন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মেম্বার। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে এসব মামলা করে থাকেন। উনি তো খুব অবাক হয়ে গেলেন। ওনার চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে পানি পড়ছে। বললেন, ‘যারা বঙ্গবন্ধুর কাছের লোক ছিল তারা ৩২ নম্বর রোড দিয়ে আর যায় না, ঘুরে যায়।’ মনে হয়েছিল উনি তখনও আমাদের বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, আমরা আসলেই বঙ্গবন্ধুর আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য আইনগতভাবে লড়তে চেয়েছি। পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিনা শর্তে প্রত্যাহার করা হলো দুর্বার আন্দোলনের মুখে। আইউব খান বৈঠকের জন্য আহ্বান জানালেন। বঙ্গবন্ধু বলেন যে, মামলা প্রত্যাহার না হলে আমরা সেই গোলটেবিল বৈঠকে যাব না। এই শর্ত তারা মেনে নিলেন। শেষ পর্যন্ত ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে আসলেন।

প্রশ্ন : মওদুদ ভাই আপনার জীবন এত বর্ণাঢ্য, অনেক গল্প শুনতে চাই। একটা প্রসঙ্গে আসতে চাই, আপনি বঙ্গবন্ধুর এত আস্থাভাজন ছিলেন। মুজিবনগর সরকারে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৪-এ আপনাকে আটক করা হয়েছিল, সে সময় আসলে কী হয়েছিল? কী ষড়যন্ত্র সেটা?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : ১৯৬৯ এ বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন যে, তুমি কিন্তু আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারবে না। তোমাকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কোনোদিন নষ্ট হয়নি। ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি জরুরি আইন ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় ওনাকে ভুল বোঝানো হয়েছিল।

প্রশ্ন : কারা ভুল বুঝিয়েছিলেন?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : তখন কমিউনিস্ট পার্টি ছিল, ন্যাপ ছিল। আমার ধারণা তাদের ইনফ্লুয়েন্স ছিল। যেদিন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো, ২৮ তারিখ। তারপর ২৯ তারিখ সকালে একেবারে ভোরবেলায়, আমি গুলশানে আমার বাসায় থাকতাম। জব্বার বলে একজন এসপি ছিলেন, তিনি আমাকে বন্দী করলেন। নিয়ে গেলেন আমাকে চেম্বারে। ওহিদুর রহমানের কেইস, টিপু বিশ্বাস ইত্যাদি, এই মামলাগুলো কেন আমি করছিলাম। কারা আমার কাছে এসেছিল। কারা এর পেছনে ছিল। এসব তারা জানতে চায় আমার কাছে। সেখান থেকে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো। সেটাও আরেক নাটকীয় বিষয়। ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনী বিলের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন চলে এলো। এর মধ্য দিয়ে তিনি সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হলেন। সংসদে কোনো আইন পাস হলে উনি ভেটো দিতে পারবেন। আমি এবং আমরা কয়েকজন এটা পছন্দ করিনি। উনার কাছে গিয়ে অনেকবার বলেছি যে, এটা সঠিক হচ্ছে না। যদিও অনেকে বলে যে, এটা ষড়যন্ত্র। আবার অনেকে বলে যে, আমি হয়তো কোনো তথ্য পাচার করছিলাম। আসলে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে কেউ আনেনি বা সে সময়ের সরকারও আনেনি। আমাকে সম্পূর্ণ বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছিল কোনো অভিযোগ ছাড়া। মার্চ মাসে ওনার জন্মদিন ছিল। জন্মদিনে আমার শ্বশুর কবি জসীমউদ্দীন ওনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন, আপনি কেন এসেছেন আমি জানি। আমি তাকে ছেড়ে দিব। তার দুই দিন পরেই আমি মুক্তিলাভ করি। বঙ্গবন্ধুর যে মানবতাবোধ ছিল তা অতুলনীয়।

প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর মানবতার প্রতি আপনার অগাধ আস্থা এখনো আছে। আপনার বইগুলোতেও আপনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করেননি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের সঙ্গে আমরা বলি সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল লোক বা বিদেশি ইন্ধনের কথা। তবে এখানকার কারা জড়িত ছিল বলে আপনার বিশ্বাস?

 

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : কারা সুনির্দিষ্টভাবে জড়িত ছিল এটা তো বলা মুশকিল।

প্রশ্ন : আপনি আপনার বইগুলোতে প্রত্যেকটা ঘটনার একটা না একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই ক্ষেত্রে কী আসলে?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : তৃতীয় বিশ্বে জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ যারা এ রকম অনেকেই আছেন যাদের বাঁচতে দেওয়া হয়নি বিভিন্ন রকম আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে।

প্রশ্ন : অনেকেই বলেন যে, কোনো না কোনোভাবে এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত। এটাতে কী বলবেন?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : এগুলো রাজনৈতিক কারণে বলে। আসলে এটা সঠিক নয়।

প্রশ্ন : আপনি বঙ্গবন্ধুর এত আস্থাভাজন ছিলেন অথচ পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিলেন...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদবঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার আরেকটা কারণ হলো, যদি সত্যি বলি, আসলে সে সময় আওয়ামী লীগের যারা নেতা ছিলেন নাম বলতে চাই না। তারা একটু ঈর্ষান্বিত হয়ে গেলেন। ওনারা বলতে থাকলেন যে, এই লোক তো কোনো দিন আওয়ামী লীগ করে নাই। সে কেন বঙ্গবন্ধুর এত কাছে থাকবে। আমার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এমন সম্পর্ক ছিল যে, আমি গাড়ি চালাতাম আর বঙ্গবন্ধু পাশে বসতেন। পুরো বছর বঙ্গবন্ধু যেখানে যেখানে যেতেন আমি যেতাম ওনাকে নিয়ে। এগুলো অনেকের সহ্য হয়নি। তাই আমি আস্তে আস্তে নিজে থেকেই নিজেকে সরিয়ে এনেছি। স্বাধীনতার পরে আমি নিজের পেশায় ফিরে গেছি।

প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যখন বিএনপিতে যোগদান করলেন...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদবিএনপি তো অনেক পরের গল্প। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু, ৭৫ সালের ১৫ আগস্টকে আমি বলব জাতীয় ট্র্যাজেডি। কোনো বিবেকমান মানুষের এটা সহ্য করতে পারার কথা নয়। এরপরে একটা বিরাট শূন্যতা দেখা দিল রাজনীতিতে। আর সংবিধান ছিল একদলীয় সংবিধান। একদিন জিয়াউর রহমান আমাকে খবর দিলেন। আমি গেলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। উনি বললেন, ‘আমি দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে চাই। সংবিধান সংশোধন করতে চাই। জনগণের সঙ্গে থাকতে চাই।’ আমি বলেছিলাম যে, আপনি যদি সেটা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেন এবং সেটা যদি আপনি ঘোষণা দেন তাহলে আমি আপনাকে সাহায্য করব। ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি নিউইয়র্কে ছিলাম। আমাকে খবর দেওয়া হলো তাড়াতাড়ি দেশে আসতে। উনি ১৬ ডিসেম্বরের আগে জাতির উদ্দেশে একটা ভাষণে রাজনৈতিক রূপরেখা দিয়েছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের অত্যন্ত করুণ অবস্থা ছিল। তখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা, সংবিধানকে ফিরিয়ে আনা। অনেকে সমালোচনা করেন এই জন্য, কিন্তু এতে আমি কোনো লজ্জাবোধ করি না।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনামলে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : একদলীয় শাসনব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছিল।

প্রশ্ন : আপনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের হয়ে কাজ করেছেন। আপনি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিএনপিতে যোগদান করেছেন অথচ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা যখন জামায়াতকে পুনর্বাসন করল একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে এবং সে সময় তো আপনি প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদনা, না। আমি উপ-প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলাম।

প্রশ্ন : অর্থাৎ ক্ষমতা আপনার কাছেও ছিল। এই সম্পৃক্ততাকে আপনি আসলে কীভাবে দেখেছেন? আপনার বইতে আপনি লিখেছেন যে, পরের বার যখন ১/১১ এর সময় বিএনপি থেকে মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনে জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ব্যাপারটিও রয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমল থেকেই তো জামায়াতকে সম্পৃক্ত করা শুরু হলো?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  জিয়াউর রহমানের ধারণা ছিল, আগে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। উনি চেয়েছিলেন পূর্ণ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবেন যেখানে সবার অধিকার থাকবে। দেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে যে, তারা কাকে চায় আর কাকে চায় না।

প্রশ্ন : এখন যদি জানতে চাই যে, সে সময় জিয়াউর রহমানের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল নাকি সঠিক ছিল?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  সে সময়ের প্রেক্ষাপটে শহীদ জিয়ার কোনো বিকল্প ছিল না। উনি জামায়াতকে পুনর্বাসন করেন নাই। উনি অ্যালাউ করেছেন।

প্রশ্ন :  আপনার কি মনে হয় না যে, আমাদের দেশে জঙ্গিবাদের সূচনা বা গোড়াপত্তন সে সময়ই করা হয়েছিল?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  সেটা কি তখন জানা ছিল কারও? কেউই জানত না। দেশের মানুষ তখন প্রতিবাদও করে নাই।

প্রশ্ন : এখন যদি তাহলে জিজ্ঞেস করি যে, সিদ্ধান্তটি কি ভুল ছিল নাকি সঠিক ছিল?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  সেই প্রেক্ষাপটে সেই সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।

প্রশ্ন : রাজনৈতিক দলগুলোর তো আলাদা আলাদা একটা আদর্শ আছে। আপনি যখন কোনো দলে যান তখন কি আপনি দলগুলোর আদর্শ বহন করেন, নাকি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আদর্শ বদলে ফেলে?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  না, না। এটা নতুন কিছু নয়। দেশ স্বাধীন হয়ে যাবার পরে আমাদের কি কাজ ছিল? আমরা দেশে একটা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা রাখব এবং দেশের উন্নয়ন করব।

প্রশ্ন : আপনি বলেন যে, আপনি কম্প্রমাইজ করেননি। আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাহলে আপনি বলছেন যে, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে জামায়াতকে রাজনীতি করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : তখন শুধু জামায়াত নয়, সব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে অ্যালাউ করা হয়েছিল। তখন জামায়াতও আসে। জামায়াত ইজ ওয়ান অব দেম।

প্রশ্ন : আমি যদি এরশাদ সরকারের সময় যাই। আপনি বলেছিলেন যে, কম্প্রমাইজের যে বিষয়টা...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  দেশ স¦াধীন হবার পর আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষের জন্য কিছু কাজ করা দরকার। আপনি যদি আমার নির্বাচনী এলাকায় যান। আমার এলাকায় সকলে এক বাক্যে বলেছে যে, আপনি সরকারে গেলে আমাদের উপকার হবে।

প্রশ্ন : তাহলে কি বিষযটা এমন যে, রাজনৈতিক দল যেটাই থাকুক না কেন এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য আপনি চেয়েছেন সরকারে থাকতে?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  আমার ব্যর্থতা রয়েছে, অবশ্যই আবার সফলতাও রয়েছে। আমি কাজ করেছি। আজকে দেখেন ননস্টপ ট্রেন চলছে। এটা কে চালু করেছে? আমি করেছি। সে সময় কেউ বিশ্বাস করেনি বাংলাদেশে এটা সম্ভব হবে। আমাকে ইঞ্জিনিয়াররা বুঝিয়েছে, স্যার এটা ইম্পসিবল। সেই তারাই এক মাসের মধ্যে আবার বলেছে, এটা পসিবল।

প্রশ্ন : আপনি বলছেন যে, আপনার কাছে মূল ব্যাপারটা হচ্ছে মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন, গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের জন্য জিয়াউর রহমানের সঙ্গে রাজনীতিতে গিয়েছিলেন। আপনি খ্যাতিমান সংসদ সদস্য ছিলেন, আপনি খ্যাতিমান আইনমন্ত্রী ছিলেন। আপনার সময়ে আপনি বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কিন্তু যে গণতন্ত্রের জন্য আপনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, এরশাদ সাহেবের সময় তো সেই গণতন্ত্রটাই ছিল না...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : এরশাদ সাহেব তো প্রথমে আমাকে কারাগারে পাঠালেন। আমাকে শাস্তি দিলেন। তখন রিভিও করা হলো। অভিযোগ, আমি কেন দুটি গাড়ি একসঙ্গে ব্যবহার করেছি। পরবর্তীতে আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি শহীদ জিয়াকে সাহায্য করেছিলেন আমাকেও করেন।’

প্রশ্ন : আচ্ছা ব্যাপারটা কি এমন ছিল যে, আপনি ওই হেনস্থা থেকে মুক্তি পেতে তাঁর রাজনীতিতে যোগ দেন? নাকি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ আপনি পছন্দ করেছিলেন?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ :  আমার আদর্শ ছিল, এখনো আছে। আমি এখনো বিএনপিতে আছি এজন্য যে, আমি মনে করি আমি মেইনস্ট্রিম পার্টিতে থাকলে কন্ট্রিবিউট করতে পারব, তাই । মূল বিষয়টা হলো দেশের মানুষ।

প্রশ্ন : রাজনীতিবিদদের কাছে আমার কি চাইব যে, আদর্শ থাকবে, দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকবে। মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। কিন্তু বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দল পরিবর্তন...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  আমি তো একবারই পরিবর্তন করেছি। মূলত আমি যখন বিএনপিতে ফিরে আসি তখন তো বিএনপি ক্ষমতায় ছিল না। এই কথা তো আপনি বলতে পারবেন না যে, আমি এরশাদ সাহেবকে ছেড়ে বিএনপিতে এসেছিলাম ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য! আমার পুরো রাজনৈতিক জীবনের চার ভাগের একভাগ আমি বিরোধী দলে কাটিয়েছি। অথচ অনেকে মনে করেন আমি বহু বছর, সারা জীবনই সরকারে ছিলাম।

প্রশ্ন : আপনি এত খ্যাতিমান আইনবিদ, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ। আপনি যখন  মুখে বলেন, সে কথাটি আমরা অনেক সময় সত্য বলে মানতে পারি না। কিন্তু যে কথা আপনার লেখায় থাকে, তা অবিকৃত সত্য ইতিহাস তুলে ধরে...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : লেখার সময় হয় কি যখন আপনি লিখতে যান, সুপ্ত কথা তখন বেরিয়ে আসবে। এটা আটকানোর কোনো উপায় নেই। আমার প্রতিটা বইতে আমি চেষ্টা করেছি উদ্দেশ্যমূলকভাবে (অবজেক্টিভলি) লেখার।

প্রশ্ন : আপনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করেননি, আমরা যেটা অনেকের বইতে দেখেছি। আবার হাওয়া ভবনের সমালোচনা করেছেন। আপনি তারেক রহমানের সমালোচনা করেছেন। আপনি বলেছেন সে সময় খালেদা জিয়ার কাছে দুই সন্তানই ছিল মুখ্য। তাদের জীবন বাঁচানোটাই ছিল মুখ্য।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  মা হিসেবে পুরো বইটাই যদি পড়েন, আর এখানে একটা পাতায় কতগুলো কথা লেখা আছে যে, কেন আমরা নির্বাচনে হেরে গেলাম? হেরে যাওয়ার কারণগুলো হিসেবে কিছু কথা যেটা সকলের জানা, এটা তো নতুন কিছু বলিনি আমি! যেটা সকলের জানা, সেটাই আমি ওখানে বলেছি।

প্রশ্ন : হয়তো আপনি দলে ছিলেন বলে দলের অন্য নেতারা মানতে রাজি হননি, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছিলেন, কাক- সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হলেও কাক থাকে। দলছুট নেতাদের কথায় বিএনপির কিছু যায় আসে না।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : হ্যাঁ, একজন ব্যক্তির জন্য বিএনপির কিছু যায় আসে না। আমি আবার বলতে চাই, আমি যখন বিএনপিতে ফিরে আসলাম, তখন বিএনপি বিরোধী দলে ছিল। এটা মনে রাখতে হবে। যদি আপনি বলতেন বিরোধী সরকারে ছিল...

প্রশ্ন : আওয়ামী লীগের আমলে আপনি বিএনপিতে এসেছিলেন?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  হ্যাঁ, আমি ইচ্ছা করলে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে কী না সুবিধা নিতে পারতাম! সব সুবিধা নিতে পারতাম। কিন্তু নেইনি। তখন তরুণ ছিলাম। তখন অভিমান ছিল, মনের মধ্যে সাংঘাতিক রকমের একটা সাহস ছিল।

প্রশ্ন : দলে থেকে দলের সমালোচনা করতে পারে না কেউ। আপনি পেরেছেন, সেখানে আপনি হাওয়া ভবনের দর্নীতির কথা লিখেছেন...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া মনে মনে কী ভেবেছেন জানি না, কিন্তু তিনি আমাকে কিছু বলেননি।

প্রশ্ন : আপনাকে কিছু বলেননি, কিন্তু আমরা গণমাধ্যমে পড়লাম, খালেদা জিয়া সিনিয়র নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন, দল থেকে বহিষ্কারের কথা বলা হয়েছে।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : ওগুলো সব অনুমান করা (স্পেকুলেটি) নিউজ। আর আমি রিজভীর ব্যাপারে কী বলেছি! আমি উত্তরে কী বলেছি! আমি বলেছি, ও তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো। ও আমার বইটি মনে হয় পুরোপুরি পড়েনি। পড়লে ও নিশ্চয়ই এ ধরনের কথা বলত না।

প্রশ্ন : এক এগারো কি মঈন উদ্দিন আহমেদের উচ্চাভিলাষ ছিল?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  অবশ্যই, মঈন উদ্দিন আহমেদের ওপর আমার বই আছে। ‘বাংলাদেশ ইমারজেন্সি অ্যান্ড দ্য আফটার মান্থ’। খুব কম মানুষ লিখেছেন এই সময়ের ওপরে। মঈন উদ্দিন আহমেদ এবং ফখরুদ্দিন আহমেদ ওই শাসন আমলে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তারা ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন।

প্রশ্ন :  কিন্তু এক এগারো আসতো না যদি আমাদের রাজনীতিবিদরা এত অনিয়ম এবং দুর্নীতির ভিতর ঢুকে না যেত!

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  তাদের মূল দায়িত্ব ছিল নব্বই দিনের মধ্যে একটা নির্বাচন সম্পন্ন করা। তারা যদি শুধু নির্বাচন দিয়ে দিত তিন মাসের মধ্যে, তাহলে দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যেত। কেন ইমারজেন্সিটা দেওয়া হলো? কারণ, তখন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, তখন দেশে একটা বিরাট উত্তেজনা, সকলের দাবি একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। সব দল এতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আওয়ামী লীগ তো নমিনেশন পেপার স্বাক্ষর করেছিল এবং ৩০০ আসনে করেছিল, ২৬ ডিসেম্বর। কিন্তু হঠাৎ করে জানুয়ারির ৩ তারিখ আওয়ামী লীগ সব মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিল। তারপর এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল! তখন মঈন উদ্দিন আহমেদকে অনেকেই অনুপ্রাণিত করেছেন। অনুপ্রাণিত করেছেন যে, এককভাবে নির্বাচন করতে দেওয়াটা উচিত হবে না। বিএনপির এককভাবে নির্বাচন দেশে ফলপ্রসূ হবে না। এসব কথা বলে তারা যখন মঈন উদ্দিন আহমেদকে উৎসাহিত করেছে ইমারজেন্সি সময়ে এসে ইয়াজউদ্দিন সাহেবকে বললেন যে, আপনি ‘ইমারজেন্সি’ ঘোষণা করুন। ওনার (ইয়াজউদ্দিন) তখন কোনো উপায় ছিল না। কারণ, হি ওয়াজ সারাউন্ডেড বাই দ্য আর্মি জেনারেলস। তখন এই যে তারা করলেন, প্রথমেই তারা আমাকে চোখ বেঁধে চার দিন রিমান্ডে নিয়েছেন। মূল কথা যেটা তারা বলতে চাইলেন রাজনীতিবিদরাই হলো- নষ্টের মূল। এরা দেশের জন্য কিছুই করেনি। আমি চোখ বন্ধ অবস্থায় বলেছি, রাজনীতিবিদদের কারণেই রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। এই রাষ্ট্র মানেই হলো রাজনীতি। সেই আমলে তারা প্রথমে গেল মাইনাস টু থিওরিতে। আমাকে তারা বলেছে! আমার চোখ বন্ধ অবস্থায় আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের পরিকল্পনা কী? সিনিয়র টিম ছিল, সারাদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছে জুনিয়র অফিসাররা। একেবারে আমার পিতা-মাতা থেকে শুরু করে সব। আমাকে ক্রিটিসাইজ করেছে, রাজনীতিবিদদের ক্রিটিসাইজ করেছে। পলিটিসিয়ানস আর নাথিং ফর দ্য কান্ট্রি। তারা প্রথমে বলল, আমরা ‘মাইনাস টু’ করব, পাকিস্তানের কায়দায়। পাকিস্তানে যেভাবে বেনজীর ভুট্টো এবং  প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে যে বাইরে পাঠিয়ে দিল। এখানে শেখ হাসিনাকে বাইরে পাঠিয়ে দিল। বেগম জিয়াকেও বাইরে পাঠানোর জন্য তারা তৎপর হয়ে উঠল। বেগম জিয়া রাজি হলেন না। এর মধ্যে আবার পটপরিবর্তন হয়ে গেল। তখন তারা দেখল যে মাইনাস টু থিওরি কাজে লাগবে না। কারণ, এরা এতটাই জনপ্রিয় যে, দুজন নেত্রী যেখানেই থাকুক বা এদের বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশে রাজনীতি তখনকার প্রেক্ষাপটে করা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন :  আপনি হাওয়া ভবনের দুর্নীতির কথা বলেছেন, এই দলগুলোর সঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছেন বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেছেন, যাতে করে জনগণের উন্নয়ন হয়। আপনি তখন ক্ষমতায় ছিলেন। হাওয়া ভবনে যখন এত দুর্নীতি হচ্ছিল।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : শুনুন, হাওয়া ভবনের দুর্নীতি যতটা প্রচার পেয়েছে, সে তুলনায় কিছুই হয়নি। আপনি চিন্তা করে দেখেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো কী? এই যে এত বড় বড় কথা বলেছেন, মঈন উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ১৪ হাজার কোটি টাকা বিএনপির মন্ত্রীরা পাচার করে নিয়েছে।

প্রশ্ন :  তাহলে আপনি বলতে চাইছেন যে, যতটা দুর্নীতি প্রকাশিত হয়েছে, সে পরিমাণ দুর্নীতি হয়নি?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : হ্যাঁ, হয়নি।

প্রশ্ন :  আপনার বইতে আপনি লিখেছেন!

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  নিশ্চয়ই, আমার বইতে আমি লিখেছি। আমার বইতে আমি এটাও লিখেছি যে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কি? ম্যাক্সিমাম ৪ কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছেন। দ্যাট ইজ অনলি ইলিগেশন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা আছে দুই তিনটি। পুরোটাই ৫ কোটি টাকার উপরে নয়। তখন যে প্রোপাগান্ডা হয়েছে, হি ওয়াজ দ্য ভিকটিম অব অ্যাট ফার্স্ট প্রোপাগান্ডা।

প্রশ্ন : বইতে আপনি আরও লিখেছিলেন, বেগম জিয়ার জন্মদিন প্রসঙ্গে, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী, এটা জাতীয় শোক দিবস, এই দিনে জন্মদিন পালন করাটা একটা রুচির ব্যাপার।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  আপনি একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন। এটা আমার মনের কথা বলেছি। বেগম জিয়া একজন উদার মনের মানুষ। তিনি যদি ওই দিনটায় জন্মদিন না করে অন্যদিন করতেন, আমি লিখেছি সে কথা। উনার সম্মান মর্যাদা অনেক বেড়ে যেত।

প্রশ্ন :  বেগম জিয়াকে পরামর্শ দেওয়ার চারপাশের মানুষ তো ছিলেন আপনারাই! তারাই যদি তাকে এ পরামর্শটা দিতেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ :  এই বিষয়ে আমার মনে হয় আলোচনা না করাই ভালো।

প্রশ্ন :  আপনি যেহেতু রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, সবগুলো রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতন আপনার চোখের সামনেই ঘটেছে। এই রাজনৈতিক দলগুলোকে যদি খুব সংক্ষেপে একটু মূল্যায়ন করতে বলি...

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : আমি মনে করি প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের সময় গণতন্ত্র যদি দেশে থাকে, রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশে গণতন্ত্র চর্চা হয় না, গণতন্ত্র টিকতেও পারবে না। যেমন- আওয়ামী লীগ এখন বলছে, গণতন্ত্রের চাইতে উন্নয়ন হলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটাতে আমরা সম্পূর্ণভাবে দ্বিমত পোষণ করেছি। ১০ বছর যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকল তারা কী রেখে গেল! ধরুন এই ১০ বছর পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো না। নির্বাচনে হেরে গেল- তখন এই সময়টাকে ঐতিহাসিকরা, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আমরা দেখব, এই সময়ে দেশে কোনো গণতন্ত্র ছিল না। এই সময়ে সংসদ কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। আইনের শাসন বলতে যেটা মৌলিকভাবে বোঝায়, সেটা ছিল না। তারা এখন ক্ষমতায় আছেন বলে তারা বলছেন এগুলো সবই আছে। আওয়ামী লীগের উচিত হবে, আগামী নির্বাচনটা যেন সুষ্ঠু এবং অবাধ হয়। এটা নির্ভর করবে সরকারের ওপর। নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করবে।

প্রশ্ন :  গণতন্ত্র যেমন গুরুত্বপূর্ণ, উন্নয়নও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি দেশের অস্তিত্ব রক্ষা করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। আপনি বলছিলেন, কালের বিচারে এই সরকার বা আওয়ামী লীগের থেকে জনগণের প্রাপ্তি কী! তেমনি জনগণ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এটাও বিচার করবে যে, জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে জামায়াতের একটা পুনর্বাসন ঘটেছে। সেই আমলে যতই উন্নয়ন ঘটুক না কেন। আবার আপনার শাসন আমলে জঙ্গিবাদের উত্থান। অর্থাৎ শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইয়ের উত্থানটা কোন সময়ে ঘটেছিল?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : আবদুর রহমান এবং বাংলা ভাই ৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল তখনই তারা তাদের কর্মকান্ড শুরু করেছিল। আওয়ামী লীগের আমলে সেটা ঘটেছিল। আমাদের সময়ে আমরা দুজনকেই গ্রেফতার করেছিলাম। খেয়াল করবেন, আমাদের সময়ে তাদের বিচার হয়েছিল। তাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ হয়েছিল।

প্রশ্ন : আপনার বইতে আপনি লিখেছিলেন যে, হাওয়া ভবনের জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : হাওয়া ভবনে নয়, আমি বলেছি যে ওখানে বিল্পবী কমিউনিস্ট পার্টির নামে বা বিভিন্ন সংগঠনের নামে সাংঘাতিক রকমের আক্রমণ চলেছিল। সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চলেছিল। তারা লুটতরাজ করেছিল। আমাদের দু-একজন নেতৃবৃন্দ, তখন যেটা তারা সঠিক মনে করেছেন, তাদের ব্যবহার করেছেন ওদের দমন করার জন্য।

প্রশ্ন : আমি শুধু রাজনৈতিক গল্পই করে গেছি, আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু জানতে চাইনি। আপনি কবি জসীমউদ্দীনের কন্যাকে বিয়ে করেছেন। বিয়ের আগের একটা জীবন ছিল, বিয়ের পরের একটা জীবন। জানি না আপনি কতটুকু শেয়ার করবেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা কিছু অবিবাহিত তরুণ প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যত দিন দেশ স্বাধীন না হবে তত দিন আমরা দাড়িও কাটব না, বিয়েও করব না। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝিতে আমি শেভ করে ফেললাম এলিজেবল ব্যাচেলর হওয়ার জন্য। তখন হাসনার (স্ত্রী) সঙ্গে দেখা হলো। সেটাও আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। জানলাম সে ইউনাইটেড নেশনে ইউএনডিপিতে কাজ করছে। নিউইয়র্কে বসবাস করছে। এখানে সে বেড়াতে এসেছে। আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন কামরুল হুদার বাসায় ওই দিনের পার্টিতে আমরা একজন আরেকজনকে পছন্দ করে ফেললাম। ওই বাড়িতে পরিচয়, পরিচয় থেকে সাক্ষাৎ, সাক্ষাতের পর আরও বেশি সাক্ষাৎ, একদিন আমরা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গেলাম। সি ওয়াজ অ্যা ভেরি গুড পারসোনালিটি। আমি সৌন্দর্য্য দেখে বিয়ে করিনি। মানুষ দেখে বিয়ে করেছি। গুণ দেখে বিয়ে করেছি।

প্রশ্ন : আপনার জীবনে বড় একটা শোকও আছে। সন্তান হারানোর শোক। আমরা সেটা জানতে চাই।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : আমাদের প্রথম সন্তান মারা গেল ১৯৮০ সালে। দুর্দান্ত ছিল সে, খুব অ্যালাইভ একটা বাচ্চা ছিল সে। ওর মারা যাওয়ার কারণ ছিল জেনেটিক্যাল। ডাক্তার এমনটা জানিয়েছিল। এরপর তিন বছর পর আমাদের আমানের জন্ম হলো- ছোটকালে পেরামবুরেটার আছে না! আয়া ওকে সেখানে বসিয়ে চালাতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় ছোট্ট আমানের দুই হাত ভেঙে যায়। তখন বারোর কম হবে তার বয়স। উই নেভার নেগলেটেড হিম। আমরা তাকে সব জায়গায় নিয়ে যেতাম। আমাদের চেয়ে বেশি করে ওকে আদর যত্ন করা হতো। ২০১৫-এর সেপ্টেম্বর মাসে ও চলে যাবে। তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। যাওয়ার দুই তিন দিন আগে, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলো- আমরা জেনেছি আজকাল ডেঙ্গু জ্বরে কেউ মারা যাওয়ার কথা নয়, ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। সেখানে একজন ডাক্তার তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। আমরা বলেছিলাম, আমরা উদ্বিগ্ন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তরা এই আন্টিবায়োটিকের রিঅ্যাকশন সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু আমরা তো নিরুপায়। ডাক্তার যখন বলেছেন, আমরা যদি তখন না বলতাম, তারপর যদি তার কিছু হতো! সে জন্য পেরেন্টস বিকাম ডিপেন্ডেন্ট অন ডক্টরস। অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশনটা দিল। যাতে তার মধ্যে ভীষণ প্রতিক্রিয়া হলো। তাকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হলো। লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হলো। যখন লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হলো- তখন আমরা বুঝেছি, দেয়ার মাস্ট সামথিং রং। আমরা ওকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন সিঙ্গাপুরে কোনো বিমান নামতে পারবে না। তারা পাশের দূরে ছোট্ট একটা বিমানবন্দরে অবতরণ করল। তখন দুজন সহকারীসহ অনভিজ্ঞ একজন ডাক্তার ছিল ওদের সঙ্গে। সে ডাক্তার আমাদের বলছে,  রোগীর তো ব্লাড প্রেসার ফল করে গেছে, কিন্তু আমাদের তো সেসব সুবিধা নেই। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স মানে তো সব সুবিধাই থাকা উচিত। সো ইট ওয়াজ জাস্ট আনফরচুনেন্টলি। কল্পনাই করতে পারিনি। হি পাসড এ্যায়োয়ে.. সেখানে আমরা নামলাম সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। কমপক্ষে চার ঘণ্টা। আমরা যে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাব, সে ব্যবস্থাও ছিল না। যারা লোকাল এজেন্ট ছিল তারা কেউ ওখানে ছিল না। সো ইট ওয়াজ টোটাল কেয়ারলেস মোমেন্ট। হি ডাইড, হি পাসড এ্যায়োয়ে.. এটা তো আমরা ভাবতেও পারিনি, এখনো মনে হয় আমাদের আমান জীবন্ত। এখনো মনে হয় সে আমাদের আশপাশে আছে। এত লাইভলি একটা ছেলে ছিল। এই কষ্ট, দুঃখ শেয়ার করা যায় না। আনন্দ কিছুটা করা যায়।

প্রশ্ন :  আপনার জীবনে ভয়াবহ কষ্ট আছে, জীবনে প্রাপ্তিও আছে, কিছু হতাশা আছে। আপনার রাজনৈতিক জীবন বেশ বর্ণাঢ্যময়, জীবনের এই পর্যায়ে এসে হিসাব নিকাশ কি মিলেছে?

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : ১৯৫৫ সালে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি ঢাকা কলেজে, তখন আমি ভাষা আন্দোলনে কারাবন্দী। তখন আমার বয়স কত হবে, ষোল! তারপর কর্নেল নাসের যখন সুয়েজ ক্যানেল ন্যাশনালাইজ করলেন, ১৯৫৬ সালে। তখন ব্রিটিশ এবং ফ্রান্স ইজিপটে (মিসরে) বোমা মারা শুরু করল। আমরা এশিয়ান, ল্যাতিন আমেরিকান, নির্যাতিত জনগণের পক্ষ থেকে তখন বিশাল একটা মিছিল করলাম। ঢাকা ইউনিভর্সিটি থেকে। সেই মিছিলে দেওয়াল টপকানোর সময় পুলিশ চার্জড করল। আমি আর দেওয়াল টপকাতে পারিনি। আমার পুরো ডান দিকের অংশ প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে তিন দিন আমি অজ্ঞান ছিলাম। যখন জ্ঞান ফিরল দেখলাম শত শত ফুল। তখনকার সময় একটা আকর্ষণ ছিল। আতাউর রহমান খান সাহেব, আবু হোসেন সরকার সাহেব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন। কেন? একজন ছাত্র আহত হয়েছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, মুক্তিযুদ্ধ, দেশের জন্য এত কিছু করলাম। এক কথায় অনেক ব্যর্থতা আছে, তার মাঝেও কিছু সফলতা আছে। যেসব জেলায় বিদ্যুৎ, গ্যাস যায়নি, সেসব স্থানে এসব সুবিধা পৌঁছে দিয়েছি। নাম বলব না, একজন বিচারক ওপেন কোর্টে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, মওদুদ সাহেব আপনি কি এখনো ‘এগরি’ করেন যে আপনি ব্যারিস্টারি পাস করার পর দেশে ফিরে এসেছেন! আমি উত্তর দিতে পারিনি। মনে মনে বলছিলাম, ফিরে আসাটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। যা কিছু হোক দেশের মাটিতেই হচ্ছে। দুঃখ, কষ্ট, ব্যর্থতা, হতাশা সবই তো দেশেই! আবার যা সফলতা, অর্জন, আনন্দ সবই দেশেই, দেশকে নিয়েই। সুতরাং, আমি মনে করি এটাই আমাদের জীবন। জীবনে হয়তো এটাই লেখা ছিল। আশা করি একদিন দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। রাজনৈতিক চর্চা ফিরে আসবে।