শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৫৪

মোটরসাইকেলে বাড়ছে দুর্ঘটনা

অনবরত ঝরছে প্রাণ ► নেপথ্যে বেপরোয়া চালনাসহ আইন না মানার প্রবণতা

জিন্নাতুন নূর

মোটরসাইকেলে বাড়ছে দুর্ঘটনা

দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে চালকের বেপরোয়া গতি ও অসাবধানতার কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনায় ঝরছে একের পর এক প্রাণ। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, প্রতি বছরই মোটরসাইকেলের কারণে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এর পেছনে চালকের বেপরোয়া আচরণ, ড্রাইভিং লাইন্সেস না থাকা, অসাবধানতা, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে তারা পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও মোটরসাইকেলের লেন তৈরিসহ হেলমেটের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ল্যাবরেটরি স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন।  রোড শেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত হন। দুর্ঘটনার পেছনে তরুণদের বেপরোয়া চালনাকে দায়ী করা হয়। এতে আরও বলা হয়, মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান মতে, গত ২০২০ সালে সড়কে ৬ হাজার ৭৩৬টি যানবাহন দুর্ঘটনার মধ্যে ১ হাজার ৬৭১টি ছিল (২৪.৮%) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এর আগের বছর ৭ হাজার ৩৫৬টির মধ্যে ১ হাজার ৫৬৩টি (২১.৪%) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ শতকরা হিসেবে ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের তথ্য বলছে, প্রতি বছর গড়ে সাড়ে সাত থেকে আট হাজার জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল আরোহীরা দুর্ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। আর ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েও যারা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তাদের অনেকেরই বাকি জীবন দুর্বিষহ কাটে। সরেজমিন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বয়সে তরুণ বাইকাররা বেপরোয়া গতিতে যান চালান। তাদের অনেকেই উচ্চগতির বাইক নিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে মোটরসাইকেল চালান। তারা দলগতভাবে চলাচলের সময় বাইক রেসের প্রতিযোগিতা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাইক স্ট্যান্ডও করেন। এ সময় ট্রাফিক আইন একেবারেই মানেন না। অনেকেরই মাথায় এ সময় হেলমেট থাকে না। আবার রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করে চলাচলকারী অনেক মোটরসাইকেলেই চালকের মাথায় হেলমেট থাকলেও যাত্রীর মাথায় থাকে না। কারও কারও থাকলেও সেই হেলমেটের মান এতই খারাপ যে, এসব হেলমেট দিয়ে দুর্ঘটনায় যাত্রীকে সুরক্ষা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। মোটরসাইকেল চালক অনেকেই আবার গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইলে কথা বলেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, মোটরসাইকেল চালকদের ৫০ শতাংশেরই ড্রাইভিং লাইন্সেস নেই। আর লাইন্সেসবিহীন চালকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনার হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোটরসাইকেল চালানোয় জন্য সড়কে নেই কোনো অবকাঠামো। এছাড়া সড়কের মিশ্র যানজটও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। সিগন্যালগুলোতে মোটরসাইকেল চালকদের আইন ভাঙার প্রবণতা আছে। এতে মুখোমুখি দুর্ঘটনা ঘটছে। মুঠোফোনে কথা বলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত বিপরীত লেনে তারা চলে যাচ্ছেন। চালকদের প্রশিক্ষণ না থাকায় এবং ট্রাফিক আইন মানার অভ্যাস না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) জরিপ বলছে, এক মিনিটে ঢাকার একজন মোটরসাইকেল চালক ছয়বার পর্যন্ত লেন পরিবর্তন করেন। আর ১০ মিনিটে ৬০ বার  পর্যন্ত লেন পরিবর্তন করেন কিছু চালক। ২০২০ সালে পুরো দেশে মোট এক হাজার ৯৭ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে ৪২৩ জন আহত হন। ২০২০ সালে মোট ৩ হাজার ৫৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে মোটরসাইকেলের জন্য। দেখা যায়, এসব দুর্ঘটনার অর্ধেকই চালকের ট্রাফিক আইন না মানার জন্য ঘটছে। এই গবেষণায় আশঙ্কায় করা হয়, ঘন ঘন লেন পরিবর্তনে ভবিষ্যতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার আরও বৃদ্ধি পাবে। এআরআই জরিপ আরও বলছে, মোটরসাইকেল চালকরা মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করেন না। মাত্র ২ শতাংশ ভালো হেলমেট ব্যবহার করেন।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং এআরআই-এর পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্যারিফ কমিশন সাড়ে তিন শ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি-রপ্তানি এবং বাজারে ছাড়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৬৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল চালানোর জন্য কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দিলেও এসব মোটরসাইকেলেও দুর্ঘটনা ঘটছে সেখানে সাড়ে তিন শ সিসি মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া বিএসটিআই কর্তৃপক্ষকে হেলমেটের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য একটি হেলমেট টেস্টিং ল্যাব স্থাপন করতে হবে। ভালো হেলমেট দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমাতে পারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যে, দেশে ২০২০ সাল পর্যন্ত মোট নিবন্ধনকৃত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩১ লাখ ২৫ হাজার ৬৫৩টি। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় আছে ৭ লাখ ৯৫ হাজার ১৯৬টি। নিবন্ধনহীন আরও তিন থেকে ৪ লাখ মোটরসাইকেল সড়কে চলছে। এর বিপরীতে ১৮ লাখ মোটরসাইকেল চালকের ড্রাইভিং লাইন্সেস আছে। 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর