শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৫৫

গতিহীন কাস্টমসের সার্ভার জালিয়াতির তদন্ত

প্রায় ৪ হাজার বার ব্যবহার হয়েছে ওই আইডি

মাহবুব মমতাজী

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের আলোচিত সার্ভার জালিয়াতির তদন্ত দেড় বছর ধরে গতিহীন। এই জালিয়াতিতে দুই রাজস্ব কর্মকর্তার আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে পণ্য পাচারের ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের একটি সিন্ডিকেট চিহ্নিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিন্ডিকেটে ঊর্ধ্বতন কাস্টমস কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ঠিকাদারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীও রয়েছেন। মুন্সীগঞ্জের দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে কাস্টম কর্মকর্তাদের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সিন্ডিকেটটি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শত শত কোটি টাকার ১১৬টি চালান ছাড় করে নিয়ে গেছে। ফাঁকি দিয়েছে বিপুল রাজস্ব।  তবে ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা শেষে ২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি রাজধানীর রমনা থানায় প্রথম মামলা করেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। এরপর ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রমনা থানায় আরও ২০টি মামলা করেন আরেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ হোসেন। জালিয়াত সিন্ডিকেটটি ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ৪ হাজার বার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া কাগজপত্রও জাল করেছে।

 এতে চট্টগ্রাম কাস্টম, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, লোহা ও ইস্পাতের ঘোষণা দিয়ে কনটেইনারগুলোতে বিদেশি সিগারেট, দামি মদ ও পোশাক কারখানার কাপড় এনেছিল চক্রটি। বিপুল রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কাস্টমসের আইডি ব্যবহার করে অবৈধভাবে পণ্যগুলো খালাস করে নিয়ে গেছে তারা। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, তদন্ত করে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাদের প্রত্যেককেই মামলায় আসামি করা হয়েছে। আনোয়ার হোসেন তার মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, দুজন রাজস্ব কর্মকর্তার আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে পণ্য খালাসে জালিয়াতি হয়েছে। এর মধ্যে একজন রাজস্ব কর্মকর্তা ডিএএম মহিবুল ইসলাম। ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ছিলেন মহিবুল। এরপরও ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর তার ইউজার আইডিটি ইস্যু করা হয়। আরেক রাজস্ব কর্মকর্তা ফজলুল হকের ইউজার আইডি ব্যবহার করেও বিপুল পরিমাণ কনটেইনার খালাস করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে দেখা গেছে, পণ্য খালাসে ব্যবহৃত সফটওয়্যারটি অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের। এর সেন্ট্রাল সার্ভারটি সেগুনবাগিচায় এনবিআর কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত। আর ফজলুল হকের ইউজার আইডিটি সেগুনবাগিচা ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে অপব্যবহার করা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ওই ঘটনায় আমরা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছি। এর পরই তার তদন্তভার সিআইডিতে চলে যায়। আর যে দুজন কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে পণ্য পাচার হয়েছে, তারা অবসরে চলে গেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার পরই এমআর ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান চাকলাদারকে কাকরাইল থেকে গ্রেফতার করে রমনা থানা পুলিশে সোপর্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। পরে তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও শুল্ক গোয়েন্দার অনুসন্ধানে আরও ২৪ জনের নাম বেরিয়ে আসে। তারা হলেন- মাহবুবুর রহমান, মিজানুর রহমানের ভাই হাবিবুর রহমান অপু চাকলাদার, নাঈম মৃধা, শফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, শাকিব হাসান তুহিন, জহুরুল ইসলাম, আবদুল গোফরান, মফিজুল ইসলাম লিটন, আবদুল হান্নান দেওয়ান, সালাহ উদ্দিন টিটো, আবুল কামাল, বিথী রানী সাহা, দুলাল শিকদার, এনামুল হক, সজিব মিয়া, রাজ্জাক হাওলাদার, মোহাম্মদ সেলিম, রাশেদ খান, রুহুল আমিন, আরিফুর রহমান, তোফায়েল আহমেদ, নিজাম উদ্দিন মামুন ও আরিফুল ইসলাম। এরা সবাই ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রমনা থানায় করা মামলাগুলোর আসামি।

সিআইডির তদন্তে আরও ছয়জনের নাম বেরিয়ে আসে। তারা হলেন- মিজানুর রহমানের শ্যালক রকিব হাসান, সোহরাব হোসেন রিপন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের চিঠিপত্র বাহক সিরাজুল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, কাস্টমস হাউসের হেড ক্লার্ক আবদুল্লাহ আল মাসুম এবং জহুরুল ইসলাম। গ্রেফতারকৃত আসামিদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে দুজন ঊর্ধ্বতন কাস্টমস কর্মকর্তার নামও উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।  

ওই সূত্রটি আরও জানায়, মামলাটি সিআইডি তদন্ত শুরু করলেও রহস্যজনক কারণে মাঝপথে তা থেমে যায়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনার তদন্তভার দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠায় আদালত। কিন্তু বিধিমালা সংশোধিত হওয়ায় অন্য কোনো সংস্থার মামলা তদন্ত করতে পারে না দুদক। ফলে মামলাগুলোর তদন্ত ফের সিআইডিতে পাঠাতে আদালতে আবেদন করে দুদক। আর এভাবেই কে তদন্ত করবে- সে সিদ্ধান্তহীনতায় কেটে গেছে দেড় বছরেরও বেশি সময়।

জানতে চাইলে সিআইডির অর্গানাইজ ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত করার এখতিয়ার দেওয়া আছে দুদককে। আর এ ঘটনায় কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাই মামলাগুলো কারা তদন্ত করবে তা নিয়ে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। দুদক তাদের সংশোধিত বিধিমালা পাওয়ার পর আমাদেরকে তদন্ত করতে বলেছে। তবে এখনো তদন্ত থেমে আছে। আদালতের আদেশ সংশোধন হয়ে এলে দ্রুতই তদন্ত শেষ করা হবে। এর আগে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করে হ্যাকাররা। সে টাকার পুরোটা এখনো উদ্ধার হয়নি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর