শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

সমস্যা জর্জরিত ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল

রিয়াজুল ইসলাম, দিনাজপুর

সমস্যা জর্জরিত ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল

হাসপাতালে ভবন আছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম আছে। বেড আছে কিন্তু চিকিৎসকসহ জনবল সংকট। চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও চিকিৎসক অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে চালু হয়েছে বাড়তি করোনা ইউনিট। করোনা ইউনিট চালুর পর করোনা আতঙ্কে অন্যান্য রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও চিকিৎসকসহ জনবল, টেকনিক্যাল পার্সন, কোনো বিশেষজ্ঞ নেই, আধুনিক সরঞ্জাম সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং ১২ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। আবার করোনা রোগী বাড়ার কারণে বিভিন্ন উপজেলার কিছু চিকিৎসক নিয়ে দেওয়া হয়েছে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দিনাজপুর সদর হাসপাতালে। ফলে পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছে না উপজেলা পর্যায়ের রোগীরাও। জেলার হাসপাতালগুলোর মধ্যে একমাত্র করোনা রোগীদের জন্য ১৬টি আইসিইউ এবং এসডিআর ১১টি বেড সুবিধা রয়েছে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার শহরের দুটি হাসপাতালে ১২৮৫টিসহ জেলায় ১৫২৪টি, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ১৯টি, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ২৮ সহ জেলায় ৬৩টি রয়েছে। অনেক রোগী অভিযোগ করেন, হাসপাতালে এলে সময়মতো চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এ সুযোগে অনেক সময় দালালরা পাবলিক অন্য হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যায়। অনেক চিকিৎসক রোগীদের সময় দেওয়ার চেয়ে বেশি খুশি বিভিন্ন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের সময় দিতে এমন অভিযোগ রোগীদের। করোনার কারণে বড় দুই হাসপাতালে তেমনভাবে দেখা না গেলেও চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্রাকটিসের জায়গায় তাদের ভিড় লক্ষণীয়। জনৈক এক মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ জানান, ওষুধ কোম্পানিরাই অনেক চিকিৎসকের সঙ্গে আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকে। তাদের স্যাম্পল ওষুধসহ আর্থিক সুবিধা নেয় অনেক চিকিৎসকও। জেলার প্রতি উপজেলা শহরের অলিগলিতে বেসরকারি হাসপাতাল আর ক্লিনিকে ছেয়ে যাওয়ায় দালাল চক্রের কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারি রোগী আসা আগের চেয়ে কমে গেছে। দালালরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে যায় প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালে।

এই কাজে একাধিক দালাল চক্রের সঙ্গে কিছু হাসপাতালের লোকজন কমিশন ভিত্তিতে জড়িত আছে বলে জানা যায়। বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর এম. আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় দুই বছর থেকে অকেজো হয়ে রয়েছে সিটিস্ক্যান মেশিনটি। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য এই সিটিস্ক্যান পরীক্ষা করাতে যেতে হচ্ছে প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে রোগীর অধিক অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি রোগী আসা-যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ে তারা। রোগী বিবেচনায় বর্তমানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই।

অপরদিকে, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালের ৫৯ জনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক, আবাসিক চিকিৎসক, কর্মকর্তাসহ আছেন ১৮ জন। করোনা বাদে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি থাকে প্রায় ১০০ জন। অন্যদিকে, প্রতিদিন জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন দেড় শতাধিক। কার্ডিওলজি, চোখ, নাক-কান গলা, চর্ম-নিউরোলজি, শিশু বিভাগে কোনো কনসালটেন্ট, চর্ম-যৌন বিভাগে চিকিৎসক নেই। জরুরি বিভাগে একজনও নেই। মেডিসিনে দুজনের স্থলে একজন। করোনা ইউনিট চালুর পর হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১৪ জন চিকিৎসক দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিনজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। এ ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে ৫০ শয্যার হাসপাতাল। কনসালটেন্ট ও এনেসথেসিয়া চিকিৎসকের অভাবে অপারেশন হয় না অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। নবাবগঞ্জ হাসপাতালে আলট্রাসনো মেশিন, কনসালটেন্ট, ফার্মাসিস্ট নেই, নার্স থাকলেও ওয়ার্ড বয়, আয়া, পরিচ্ছন্ন কর্মী, নিরাপত্তা কর্মী সংকট। চতুর্থ শ্রেণি ও স্বাস্থ্যসহকারীর পদেও সংকট। বীরগঞ্জ হাসপাতালে পালস অক্সিমিটার, সেন্টাল অক্সিজেন সিস্টেম না থাকায় এবং আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন অকেজো থাকায় করোনা রোগীসহ সাধারণ রোগীদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে চলেছে সেবা। বোচাগঞ্জ হাসপাতালে এক্সরে মেশিন নষ্ট। অ্যাম্বুলেন্স দুটির মধ্যে একটি বিকল। জেনারেটর মেশিন নষ্টের কারণে অস্ত্রোপচার রুম বন্ধ থাকে। নার্স সংকট রয়েছে। হাকিমপুরে অত্যাধুনিক ওটি (অপারেশন থিয়েটার) থাকলেও অপারেশন হয় না। এক্সরে মেশিন ও ডেন্টাল চেয়ার নষ্ট, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন নেই, ওয়ার্ড বয় সংকট। ফুলবাড়ী হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন নেই, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট নেই, চতুর্থ শ্রেণি ও স্বাস্থ্যসহকারী পদে সংকট।  জেলা সিভিল সার্জন আবদুল কুদ্দুছ জানান, বীরগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান অনেক ভালো। তবে অনেক হাসপাতালে কাক্সিক্ষত জনবল ছাড়াও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি সংকট এবং অনেক স্থানে টেকনিক্যাল পার্সন নেই, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ ফিল্ড পর্যায়ের পদ শূন্য রয়েছে। করোনার কারণে কিছুদিন আগে বিভিন্ন উপজেলা থেকে ৫০ জন চিকিৎসক এনে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেহেতু করোনা রোগী বাড়ছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি জানানো আছে।