শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৪ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ অক্টোবর, ২০১৪ ০০:০০

প্রসঙ্গক্রমে

শ্রেষ্ঠ শব্দটি বহু সংকটের জনক

মোশাররফ হোসেন মুসা

শ্রেষ্ঠ শব্দটি বহু সংকটের জনক

বহু বিজ্ঞ ব্যক্তি নিজেকে, নিজ পরিবারকে, পছন্দের নেতাকে কিংবা নিজ মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠ দাবি করে অহংকার করে থাকেন। আবেগের বশবর্তী হয়ে কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার বলে তিনি এরকম দাবি করতেই পারেন। কিন্তু তার এই দাবিটি যেন আরেকজনের ক্ষতি কিংবা মনোবেদনার কারণ না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এটি শুধু সভ্যতার বিরুদ্ধে সংকট সৃষ্টিকারী শব্দই নয়, ফ্যাসিবাদী চেতনাপ্রসূত শব্দও বটে। সে জন্য গণতান্ত্রিক বিশ্বের নাগরিকরা বহু আগে থেকে এটিকে বর্জন করে আসছেন। এ দেশের সর্বত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা শব্দটি দিয়ে নানারকম বাক্য তৈরি করে প্রতিপক্ষকে জব্দ করে থাকেন। বিশেষ করে দুদলের নেতা-কর্মীরা তাদের প্রিয় নেতা ও দলকে উচ্চাসনে রাখার জন্য শব্দটিকে বহু প্রকারে ব্যবহার করছেন। মতবাদীরা তাদের মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠ মনে করে একপ্রকার উন্নাসিক মানসিকতায় আক্রান্ত। আবার কোনো কোনো ধর্মবাদী তাদের ধর্মকে শুধু শ্রেষ্ঠই মনে করছে না, অন্য ধর্মকে হেয় করারও চেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় সচেতন মহল মনে করছেন, শব্দটি এখনই বর্জন করা উচিত। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে মানবসভ্যতা ভয়ানক সংকটের মুখে পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষ যখন পরিবেশকে জয় করার সামর্থ্য অর্জন করল তখনই সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করল। এই শ্রেষ্ঠ ভাবা তার জন্য গর্বের হলেও অন্যান্য প্রাণীর বেলায় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াল। কারণ তাদের হত্যা করেই মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। একই কারণে মানুষ দলভুক্ত হয়; গোত্র, সমাজ, বংশ প্রভৃতি তৈরি করে। গোত্রপতিরা তাদের নেতৃত্বের প্রয়োজনে চালু করে নানাবিধ সামাজিক রীতি-নীতি। সেগুলোতেও সন্তুষ্ট থাকতে না পেরে তারা ধর্ম সৃষ্টি করে তার মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। ধর্মের অপব্যবহার লক্ষ্য করে মানুষ আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকরা নিজ নিজ জাতিকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করে। নতুন আপদ হিসেবে দেখা দেয় 'জাতীয়তাবাদ'। জার্মানদের জাত্যভিমান কিভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে এনেছিল মানুষ তা এখনো ভুলে যায়নি। তারা প্রকাশ্যে দাবি করতে থাকে, 'তারা জাতিতে আর্য এবং নীল রক্তের অধিকারী। ঈশ্বর তাদের পাঠিয়েছেন পৃথিবীকে শাসন করার জন্য।' এডলফ হিটলার তার মেইন ক্যাম্প রচনার এক জায়গায় লিখেছেন, 'সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টি কোনো মহান ব্যক্তির বিকল্প নয়। একশজন নির্বোধের সমষ্টি যেমন একজন জ্ঞানী ব্যক্তির সমান হতে পারে না, তেমনি কোনো বীরোচিত সিদ্ধান্তও আসতে পারে না একজন কাপুরুষের কাছ থেকে' (উদ্ধৃতিটি প্রফেসর এমাজউদ্দীনের এক লেখা থেকে সংগৃহীত হয়েছে)। অর্থাৎ হিটলার মনে করতেন তিনিই শ্রেষ্ঠ নেতা এবং জার্মানরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। অতঃপর জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিবাদের সংকট থেকে উদ্ভব ঘটে সমাজবাদের। সমাজবাদীরা ঘোষণা দেন, শ্রমিক শ্রেণিকে মুক্তি দিতে মার্কসীয় দর্শনই শ্রেষ্ঠ দর্শন। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর বহু দেশে শ্রমিক শ্রেণির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে বাস্তবায়ন ঘটে কর্তৃত্ববাদী শাসনের। সামন্তবাদ, ধর্মবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে এ দেশে বিলম্বিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির প্রিয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। আমাদের সৌভাগ্য যে, তিনি হিটলারের মতো নিজেকে শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে দাবি করেননি। বর্তমানে বড় দল দুটির স্বার্থান্বেষী নেতা-কর্মী ও তাদের পক্ষীয় বুদ্ধিজীবীরা দুই মরহুম নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য আগের মতো আবারও সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। তাদের বক্তব্য একটাই, তা হলো- 'দুই নেতার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে দুদলের বিরুদ্ধে যে কোনো সমালোচনা সহ্য করা হবে। কিন্তু তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কোনো বক্তব্য সহ্য করা হবে না'। সম্প্রতি এ কে খন্দকার ও মওদুদ আহমদ লিখিত দুটি বইয়ের বিরুদ্ধে তাদের তীব্র সমালোচনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ উদাহরণ হতে পারে। কয়েক বছর আগে বিবিসি রেডিও এক জনমত জরিপের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে ঘোষণা দেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ দলীয় কিছু বুদ্ধিজীবী মনে করেন, 'তিনি শুধু শ্রেষ্ঠই নন, হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।' এ বিষয়ে বিশিষ্ট আধ্যাত্মবাদী বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক আমাকে বলেছেন, 'মানুষের কীর্তিই মানুষকে শ্রেষ্ঠ জায়গায় নিয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি কখনো নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন না। বঙ্গবন্ধুর কারণে বাঙালিরা একটি জাতি-রাষ্ট্র পেয়েছে। কিন্তু তার আগে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিধায় একজনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে আরেকজনের অবদানকে খাটো করা সুস্থতার লক্ষণ নয়।' আবার কোনো কোনো কবি-সাহিত্যিক আবেগের আতিশয্যে এ দেশকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন : কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত 'ধনধান্য পুষ্প ভরা' কবিতার প্রথম অংশে উল্লেখ আছে, "ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা; তাহার মাঝে আছে দেশ এক-সকল দেশের সেরা...; এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি'' (শোনা যায়, স্বাধীনতার পর কবিতাটি জাতীয় সংগীত করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু কবিতাটিতে আমিত্বের ভাবধারা লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি)।

লেখক : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক।

ই-মেল[email protected]

 

 

 


আপনার মন্তব্য

Bangladesh Pratidin

Bangladesh Pratidin Works on any devices

সম্পাদক : নঈম নিজাম,

নির্বাহী সম্পাদক : পীর হাবিবুর রহমান । ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট নং-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট নং-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত। ফোন : পিএবিএক্স-০৯৬১২১২০০০০, ৮৪৩২৩৬১-৩, ফ্যাক্স : বার্তা-৮৪৩২৩৬৪, ফ্যাক্স : বিজ্ঞাপন-৮৪৩২৩৬৫। ই-মেইল : [email protected] , [email protected]

Copyright © 2015-2019 bd-pratidin.com