শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৯ মে, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ মে, ২০১৭ ২২:৪০

বাজেট : ওই আসে ওই অতি গর্জনে

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বাজেট : ওই আসে ওই অতি গর্জনে

বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নভাবনা বা দর্শনে (যেমন পরনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জন, আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ম্ভরতাসহ রপ্তানিমুখী হওয়া, স্থানীয় শিল্প উদ্যোগকে সুরক্ষা দিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকসইকরণ, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান প্রভৃতি) পরিবর্তনের সূচনার আভাষ-ইঙ্গিত দিয়ে নতুন বাজেট আসছে। বাংলাদেশে এখন বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যালোচনা ক্রমবর্ধমান আমজনতার সচেতনতার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে এটি যেমন ইতিবাচক দিক আবার বাজেট প্রাক্কলন এবং বাস্তবায়ন সিদ্ধান্ত প্রদানের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ অতিমাত্রায় ওপর থেকেই আসতে হচ্ছে এটিও একটি ইতিবাচক হতে চেয়েও নেতিবাচক প্রবণতায় পর্যবসিত হচ্ছে। বাজেটে চাহিদা ও সরবরাহের ভাবনা বা প্রস্তাব পরীক্ষা পর্যালোচনার ভিত্তিতে নিচ থেকে ওঠা বা আসা উচিত, প্রথা তাই-ই আছে, কিন্তু ওপর থেকে এঁকে দেওয়া নকশায় প্রাক্কলন করা হলে নিচে ক্ষৈত্রিক পর্যায়ে তা বাস্তবায়নে জটিলতার উদ্ভব হয়, চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় এবং প্রাক্কলন ঘন ঘন পুনর্বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যা প্রকারন্তরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে ফেলে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। জাতীয় বাজেটের (যা মূলত ব্যয়ের) আকার প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় বেশ বেশি করে প্রস্তাব করা হয় এবং সে অনুযায়ী রাজস্ব আয় প্রাক্কলন ওরফে লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির প্রস্তাব কষা হয়, বাস্তবায়ন পরিস্থিতি যদি আমলে না নেওয়া হয় তাহলে মোটা বাজেট দিয়ে ফলাফল অর্জন সম্ভব হয় না। যদি এসব প্রাক্কলন বাস্তবায়ন যোগ্যতার নিরিখে নিরূপণ করা না হয়, চাহিদা বা কঠিন বাস্তবতা সঠিকভাবে ঠাহর না করা হয়, সঠিক হিসাব-নিকাশের নিরিখে ভিত্তিতে রাজস্ব আদায় এবং সেই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা না ধরা হয় তাহলে বাজেটের বড় ধরনের কাট বা পুনর্বিবেচনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। একটি উন্নয়নগামী অর্থনীতির জন্য তা শুভপ্রদ নয়। একটি বাজেটকে তখনই ‘উচ্চাভিলাষী’ পদবাচ্যে আখ্যায়িত করা চলে যখন দেখা যায় বাজেটের বাস্তবায়ন গতি বা সক্ষমতা কম। সমালোচকরা যথার্থই বলে থাকেন বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা এবং স্বচ্ছতা সচেতন থাকা উচিত। উদাহরণস্বরূপ একটি বড় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাক্কলন করে বাস্তবায়নকালে গিয়ে তার একটি বড় মাত্রায় কাটছাঁট হয়, এটি উভয় ক্ষেত্রে (রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়) হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে, কিংবা মাঝপথে প্রকল্প পরিত্যক্ত হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিচ্যুতি ঘটতে পারে। এইড সংস্থা বা এফডিআই থেকে বৈদেশিক সাহায্যের প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটলে বা বিদেশি সহায়তা সময়মতো ব্যবহার করতে না পারলে, এটা অনেক সময় বহুমুখী সমস্যার, অসম্মানের, ব্যর্থতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য  এহেন  সীমাবদ্ধতার প্রতি উচ্চতর মনোযোগ, সাবধানতা অবলম্বন এবং  বাস্তবায়নের জন্য দায়ীদের দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই, এটা পরিকাঠামো নির্মাণ বা রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাপনা যে কোনো ক্ষেত্রেই  হতে পারে। অধিকতর উন্নয়ন বাজেট ব্যয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে গুণগত মানসম্পন্ন সম্পদ ও সেবা উন্নয়ন ব্যতিরেকে টাকা ব্যয় করা হলে অর্থনীতিতে সংক্রামক ব্যাধির মতো বিশৃঙ্খলা বাড়তেই থাকবে, প্রচুর অপপ্রত্যয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটবে।  স্রেফ অর্থবিলের মাধ্যমে ঘটা করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়  পদ্ধতিগত পরিবর্তন হঠাৎ ঘটানো উচিত নয়, এটা শুরু করা উচিত যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে  এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত পাওয়া যাবে। যখন স্টেকহোল্ডারের দ্বারা প্রাথমিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে একটি নতুন ট্যাক্স প্রবর্তিত বা আরোপিত হবে তখন সেটি আহরণে বেগ পেতে হয় না। নতুন ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন প্রবর্তনের জন্য নেওয়া উদ্যোগের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ দেখে মনে হতে পারে যে, কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য সিদ্ধান্তসমূহ ছিল যা এখনো সমাধানের সুযোগ আছে। আবার এটাও পর্যালোচনাযোগ্য থেকে যাবে যে, ব্যবসায়ীদের দাবিসমূহ তাদের শ্রেণি বা গোত্রগত স্বার্থ রক্ষার মোড়কে উত্থাপিত হয়েছে কিনা। বাস্তবায়ন-ক্ষমতা বাড়ানো ব্যতিরেকে নতুন কোনো শুল্ক বা কর আইন প্রবর্তনের আগে চিন্তা করতে হবে। বাজেটের একটি খুব ছোট অংশ (শতকরা ১) পরিসংখ্যান, অটোমেশন, ডাটাবেস, নির্মাণ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করা যেতে পারে। সেখান থেকে পাওয়া  প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সঙ্গত হবে। বিভিন্ন শিল্প বণিক সমিতি, থিঙ্ক ট্যাংক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডাটাবেস নির্মাণ করতে পারেন, নীতিনির্ধারকেরা বিভিন্ন শরিকের দাবির প্রেক্ষাপটে তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত পুনর্বিচারের জন্য যথেষ্ট তথ্য পরিসংখ্যান থাকলে প্রায়ই সুনির্দিষ্ট এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

আসন্ন অর্থবছরেও রাজস্ব আহরণসহ বড় দাগে ব্যয়ের ব্যাপারে সতর্কতা, ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা জারিসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবীক্ষণতা নজরদারি বাড়ানোর অবকাশ থেকে যাবে। আসন্ন বাজেট বাস্তবায়ন দুই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে বলে প্রতীয়মান হয়। দুই চ্যালেঞ্জ (১) রাজস্ব ব্যয়ের বড় বাজেট (মেগা প্রকল্পে সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছতার সঙ্গে) বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া এবং (২) উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে থাকতে হলে আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, শৃঙ্খলা স্বচ্ছতা জবাবদিহি পরিস্থিতি পরিবেশের উন্নতির দিকে নজর দেওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের বাজেট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে লোকরঞ্জন কিংবা আবেগতাড়িত না হয়ে সেখানে উদীয়মান অর্থনীতির অগ্রগতির উপায় ও উপলক্ষ বিবেচনায় নেওয়ার অবকাশ অনস্বীকার্য। অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার মান উন্নত করতে, দোষারোপের দ্বারা আকীর্ণ না হয়ে সমন্বয় ও সহঅবস্থানের দৃষ্টিতে সুশাসন সুনীতি এবং মান নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা উন্নয়নে দৃষ্টি দিতে হবে। সবার জন্য সুযোগ নিশ্চিত ও প্রযোজ্য করলেই তা জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সাফল্য হিসেবে দেখা যাবে। সবার জন্য সৌভাগ্য ও সুযোগ বিতরণ (খাদ্য নিরাপত্তা, গুণগত শিক্ষা, সবার জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা ও বিপুল বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ, উন্নত অবকাঠামো, মানবাধিকারের বিষয়, রাষ্ট্র থেকে সামাজিক নিরাপত্তা বিধান) সব পরিস্থিতিতে প্রতিফলিত হলে সেটি হবে উন্নয়ন টেকসইকরণের অন্যতম উপায়।  

জাতীয় অর্থনীতিতে উৎপাদনে (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অবিসংবাদিত ভূমিকা রয়েছে। প্রত্যাশিত সঞ্চয়ের এবং শিল্প উন্নয়নে বিনিয়োগের গুণগতমান বৃদ্ধির বিকল্প নেই। কৃষি ও সামাজিক খাতে জনগণের মৌলিক অধিকার চিন্তা ও পরিকল্পনা জাতীয় অর্থনীতির বিকাশে সব উৎপাদনশীল খাতে দেশের সার্বিক সঞ্চয়ের সামগ্রিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। দারিদ্র্য হ্রাস কৌশলপত্র প্রোগ্রাম বন্ধ তথা স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সঞ্চয় অভ্যাস বিকাশ ব্যতীত সেখানে রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়নে উপযুক্ত প্রণোদনা, প্রেরণা ও প্রকরণ নিশ্চিত করা আবশ্যক। পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভর্তুকি ও অন্যান্য সুবিধা শিল্প উন্নয়ন উদ্যোগের একটি উপায় বিবেচনা হতে পারে, কিন্তু  উন্নয়ন প্রচেষ্টায় সব সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। শিক্ষা যেমন জাতির জন্য যেমন একটি প্রধান বিনিয়োগ। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড তবে শিক্ষা খাতে জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি বুমেরাং হতে পারে দেশ ও জাতির জন্য। সিংহভাগ বরাদ্দ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেওয়া হলেও উপযুক্ত প্রয়োগ ও দেখভালের অভাবে তা ব্যর্থ হতে পারে। ঔপনিবেশিক আমলে শিক্ষার জন্য অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ছিল, সেখানে ছিল বৈষম্যের অভিযোগ কিন্তু কড়া নজরদারি ছিল। তখন ‘ছাত্রনং  অধ্যনং তপঃ ব্রত...’ ছিল। এখন সরকারের ভর্তুকিনির্ভর শিক্ষা ব্যবসা ও বাণিজ্যিক হয়ে পড়ায় গণশিক্ষা জনশিক্ষায় পরিণত হতে পারছে না।

জবাবদিহিতার অভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সেবার আদর্শ এখন দুর্নীতিগ্রস্ত ও দায়-দায়িতহীন বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হচ্ছে। দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ যে কোনো উন্নতিতে দুর্বল শিক্ষার দুষ্ট প্রবণতা বিরূপ প্রভাব ও ফলাফল যাতে বাধার কারণ না হতে পারে সেটিতে দৃষ্টিক্ষেপ প্রত্যাশিত থেকে যাবে।

     লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক।


আপনার মন্তব্য