শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:৩০

যে পথে চলছে বাংলাদেশ

ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক

যে পথে চলছে বাংলাদেশ
Google News

বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। এ অপকৌশলের কারণেই দেশে ইয়াজউদ্দিন ফখরুদ্দীন মইনউদ্দিন মসিবত নেমে আসে।

যারা রাজনীতিক নেতৃত্বের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্ট করে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ২০০৮ সালে ডিসেম্বরে নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট বিপুল বিজয় লাভ করে। মহাজোট প্রায় ৫৫% ভোট পেয়ে বিজয় নিশ্চিত করে। অন্যদিকে বিএনপি প্রায় ৩৩% ভোট পেয়ে ৩৩টি আসন লাভ করে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি সেদিন যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ও নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা না করত তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতাসীন হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট শতাধিক আসন পেত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদার হতো। সে সময়ও দুর্নীতি ও গ্রেনেড হামলার এবং যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোত। বিএনপির ২০০৮ সালের বিপর্যয় থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীকালে এমনকি ২০০৯ সাল থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে প্রথমে দেশে যুদ্ধাপরাধী নেই বলে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বলতে থাকলেন। এরপর অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত কমিটির কার্যক্রম জোরদার হলে এবং জনমত সোচ্চার হলে বলতে শোনা যায় আওয়ামী লীগের মধ্যেও যুদ্ধাপরাধী রয়েছে। এ সম্পর্কে বিভিন্ন ফোরাম থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হয় বিএনপি যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ নিয়ে হাজির হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলবে। এরপর অনেকে ভেবেছিলেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে বোধদয় হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শামিল হয়ে এগিয়ে যাবে। খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং ২০১২ সালে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক মর্যাদায় ভারতে ছয় দিন অবস্থান করে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তখন ভাবা হয়েছিল বিএনপির নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়ে রাজনীতি করবেন, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় এবং নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার জন্য ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সন্ত্রাস, জঙ্গি তৎপরতা এবং অবরোধের মাধ্যমে দেশকে অচল করে দিয়ে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়। বিএনপির এ কর্মকাণ্ডে এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে, ভারতের রাষ্ট্রপতি, বাংলাদেশের সব মহলের কাছেও নন্দিত প্রণব মুখার্জির সঙ্গেও খালেদা জিয়া সৌজন্য সাক্ষাৎ করেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দৃঢ়তার সঙ্গে সরকার পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির মাধ্যমে এবং সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ও জনসমর্থনে তা মোকাবিলা করেন। আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে প্রায় পাঁচশ লোককে হত্যা এবং তিন হাজার লোককে পঙ্গু করা হয়। প্রায় তিন হাজার যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ভণ্ডুল করে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়।

শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে সেদিন এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হয়। ভারত সরকার ওই সময় প্রত্যক্ষভাবে বর্তমান সরকারকে সমর্থন করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও পরবর্তীকালে এগিয়ে আসে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়। সেদিন এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা না হলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে অর্জন হয়েছে তা আজ ব্যর্থ হয়ে যেত এবং পাকিস্তানের মতো জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। বিএনপি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থেকে ২০১৪ সালে নির্বাচন করলে অন্ততপক্ষে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে সংসদে এবং রাজপথে আত্মপ্রকাশ করতে পারত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকারে বিএনপিকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন, এমনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্ব মন্ত্রণালয় দিতেও রাজি ছিলেন। কোকোর মৃত্যুর পর তিনি দেখা করতে গেলে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়।

গত প্রায় ১০ বছরে ধ্বংসাত্মক ও অরাজকতা পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের এমডিজি অর্জন করেছে, এসডিজিও অর্জন করার পথে। ইতিমধ্যে যে পাঁচটি দেশ স্বল্প উন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ৭% এর ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিগত এক দশক ৬% এর ওপর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে। কৃষি, শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং বিনিয়োগও বেড়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। শিশুমৃত্যু হার এবং মাতৃমৃত্যু হার কমে যাওয়ার অগ্রগতি হয়েছে এবং জনগণের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গড় আয়ু বর্তমানে ৭১ বছর যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। মাথাপিছু আয় বর্তমানে ১৬০০ ডলারের মতো। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণ থেকেও তার স্বীকৃতি মিলেছে। বিশ্বব্যাংক রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ১৩৪টি দেশের উন্নয়নের যে বিশ্লেষণ দিয়েছে, তার মধ্যে ১৫টি দেশ ৬% বা তার ওপর প্রবৃদ্ধি নিয়ে অগ্রগতি অর্জন করছে, এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্বব্যাংক ঋণ দিতে রাজি না হলেও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। জাতীয় চার নেতার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ চার মূলনীতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিছু অসঙ্গতি আছে তা পর্যায়ক্রমে দূর হবে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহতি থাকলে ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪০ সালে উন্নত দেশে পরিণত হবে। ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর রেকর্ডভুক্তির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বিশ্বের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মহান নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। পাশাপাশি ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বাঙালি জাতি বিশ্বে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে পৌঁছেছে।

২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে উন্নয়নের চালিকাশক্তি বিদ্যুৎসহ অনেক ক্ষেত্রেই শোচনীয় অবস্থা ছিল। কিন্তু সরকারের পরিকল্পিত পদক্ষেপের ফলে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করেছে। এ প্রশংসিত বিরাট অগ্রগতিকে অস্বীকার করতে না পারায় কোনো কোনো মহল প্রশ্ন তুলছে— ব্যাংক, শেয়ারবাজারে ব্যাপক অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচার প্রসঙ্গে। উল্লেখ্য, প্রত্যাশানুযায়ী না হলেও এক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো মহল বলছে সহনশীলতার প্রদর্শন, গণতন্ত্র চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা দরকার এবং ব্যবধান দূর করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখতে পাই সামরিক শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি কোনো কোনো পর্যায়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শরিক হচ্ছে বা হবে বলে ধারণা করা গেলেও পরবর্তী কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে বিএনপি গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়নি। যারা আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে সহনশীলতা গণতান্ত্রিক চর্চা, ব্যবধান দূর করার পরামর্শ দিচ্ছেন ও দুই দলকে একপর্যায়ে ভাবছেন, তাদের উদ্দেশে বলা যায়, খেলার মাঠের নিয়ম মেনে খেলতে হয়। তা না হলে প্রথমে হলুদ কার্ড ও পরে লাল কার্ডের মাধ্যমে মাঠ থেকে উঠে যেতে হয়। রাজনৈতিক মাঠে গণতান্ত্রিক চর্চায়ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এবং গণতান্ত্রিক নীতিমালা অনুসরণ করেই চলতে হয়। পৃথিবীতে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে কয়েক শতাব্দীর গণতান্ত্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে তা দেখা যায়। সেখানে রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সম্ভব হয়েছে। ভারতের প্রায় সাত দশকের গণতান্ত্রিক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল, জোট এবং নেতৃবৃন্দ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং প্রজ্ঞাবান ছিলেন বিধায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করে ভারতকে বিশ্বে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে এ বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কাজেই রাজনীতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে সাংঘাতিক ভুল করলে দলের বিপর্যয় নেমে আসে। দেশের অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর যথাযথ মর্যাদা, ইতিহাস-ঐতিহ্য মেনে চলা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রণীত সংবিধানের প্রতি অবিচল আস্থা এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রাথমিক শর্ত। আমরা আশা করব বিএনপি ও জোটের নেতৃবৃন্দ এটা অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। রায়ের ব্যাপারে আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সবাই যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতো এবং গণতান্ত্রিক নীতিমালা মেনে চলার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করত তাহলে পরিস্থিতি এমন হতো না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ও মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।